দিনের খবর প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

আমানতের সঙ্গে কমে আসছে বিনিয়োগের পরিমাণ

ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান

শেখ আবু তালেব: একদিকে বাড়ছে হিসাবের সংখ্যা, অপরদিকে কমে আসছে মেয়াদি ও এককালীন আমানতের পরিমাণ। এতে বিনিয়োগের পরিমাণ ও প্রবৃদ্ধি কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে বেসরকারি খাতের উচ্চ সুদের ঋণের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। বাড়ছে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নেওয়া ঋণের পরিমাণ। অপরদিকে খেলাপির পরিমাণও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে দেশের ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর (এনবিএফআই)। ২০১৯ সাল শেষে এমন চিত্র পাওয়া গেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদন থেকে।

তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের শুরুতে এনবিএফআইগুলোয় মোট আমানতের পরিমাণ ছিল তিন হাজার ১২২ কোটি টাকা, আলোচিত সময়ে যা দেশের মোট আমানতের ছয় দশমিক ৭৩ শতাংশ। বছর শেষে আমানতের পরিমাণ সামান্য কমে দাঁড়ায় তিন হাজার ১০৯ কোটি টাকা।

বিশ্লেষকরা জানান, দেশে বর্তমানে ৩৬টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে পিপলস লিজিং অবসায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বাকিগুলোর মধ্যে প্রায় ১০টির অবস্থা খুবই দুর্বল। চারটি ভুগছে তারল্য সংকটে। এসব প্রতিষ্ঠানেও সরকারি আমানত রয়েছে, কিন্তু তারা ফেরত দিতে পারছে না। সরকারি আমানত তুলে নিলে এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনাই দুষ্কর হয়ে পড়বে।

সার্বিকভাবে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে আমানত তুলে নিতে শুরু করেছে অনেক মন্ত্রণালয় ও ব্যাংক। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে এমন অবস্থা তুলে ধরেছে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাহী প্রধানদের সংগঠন। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আমানত ধীরে ধীরে তুলে নেওয়ার পরামর্শ দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, কিন্তু বাস্তবে তার ফল দেখা যায়নি।

শুধু সরকারি নয়, বেসরকারি খাত থেকেও এনবিএফআইগুলোর আমানতের পরিমাণ কমেছে। গত বছরের শুরুতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় বেরসকারি খাতের আমানতের পরিমাণ ছিল ৪৩ হাজার ২৯৯ কোটি ৬২ লাখ টাকা। বছর শেষে তা বেশ কিছুটা কমে দাঁড়ায় ৪০ হাজার ১১ কোটি টাকায়। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আমানত কমেছে তিন হাজার ২৮৮ কোটি টাকা।

এদিকে গত বছরের শুরুতে এনবিএফআইগুলোর মোট আমানতের পরিমাণ ছিল ৪৬ হাজার ৪২২ কোটি ৫৯ লাখ টাকার। গত ডিসেম্বরে তা নেমে দাঁড়ায় ৪৩ হাজার ১২১ কোটি টাকায়। এক বছরের ব্যবধানে আমানত কমেছে তিন হাজার ৩০৩ কোটি টাকা।

বছর শুরুতে ফিক্সড ডিপোজিট তথা এককালীন আমানতের পরিামণ ছিল ৪৪ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা। বছর শেষে তা দাঁড়ায় ৪২ হাজার ২২ কোটি টাকায়। কম সুদের সরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলেও কমেছে উচ্চ সুদের বেসরকারি খাতের ঋণের পরিমাণ। আর আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় গত ডিসেম্বর শেষে খেলাপির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে সাত হাজার ৩৭৪ কোটি ৫২ লাখ টাকা।

দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মতৎপরতা নিয়ে প্রতি প্রান্তিকে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সর্বশেষ (অক্টোবর-ডিসেম্বর, ২০১৯) প্রান্তিকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, হিসাব সংখ্যার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ছয় লাখ ৪৪ হাজার ৯২৫টি। অপরদিকে ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৯ হাজার ৩১০ কোটি ২৮ লাখ টাকার, তিন মাস আগে সেপ্টেম্বর শেষে যা ছিল ৬৮ হাজার ৫৭৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকা।

গত বছরের প্রথম প্রান্তিক অর্থাৎ জানুয়ারি-মার্চ শেষে শিল্প খাতে বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ২৪ হাজার ৪১৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা। এ সময়ে মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৩২ শতাংশ ছিল এ খাতটিতে, যা একক খাত হিসেবে ছিল সর্বোচ্চ। বছর শেষে তা দাঁড়ায় ২৫ হাজার ৩৫০ কোটি টাকায়। মোট ঋণের ৩৬ দশমিক ৫৮ শতাংশই শিল্প খাতের উদ্যোক্তাদের কাছে।

এছাড়া বিতরণকৃত ঋণের মধ্যে কৃষি খাতে এক হাজার ৯১৩ কোটি, নির্মাণ শিল্পে ৯ হাজার ৪৫৯ কোটি, পরিবহন খাতে এক হাজার ৪৩৪ কোটি, ট্রেড ও বাণিজ্যে ১৬ হাজার ৪৬৮ কোটি টাকা ও কনজ্যুমার ফাইন্যান্সিংয়ে খেলাপির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা।

আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্যোক্তাদের দাবিতে সরকারি আমানতের একটি অংশ পাচ্ছেন তারা। তারপরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালন দুর্বলতায় সরকারি আমানত তুলে নেওয়া হয়। ফলে বছরের শুরুর চেয়ে বছর শেষে দেশের এনবিএফআইগুলোয় সরকারি আমানতের অংশ ও পরিমাণ কিছুটা কমে এসেছে। এর প্রভাবে বেসরকারি খাত থেকেও আমানতের পরিমাণ কমে আসছে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..