প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

‘আমার কারখানায় কেউ আজীবন কাজ করুক তা চাই না’

মাগুরা সদরের বড়খড়ি গ্রামের ৫০টি পরিবারের প্রায় সবাই এখন মাশরুম চাষি। কৃষি এসব পরিবারের মূল পেশা। অন্য চাষাবাদের পাশাপাশি চলছে মাশরুম চাষ, যার পরিচালনায় মুখ্য ভূমিকা রাখছেন নারীরা। দু-তিন বেলা রান্নাবান্না ও গৃহস্থালির প্রচলিত কাজ ব্যতিরেকে সারা দিনের দীর্ঘ সময় যাদের কাটত অলসতায়, সেই সময়টাকে তারা এখন ব্যয় করছেন মাশরুম চাষে। প্রতি পরিবারে প্রতি মাসে যা ১০ থেকে ১২ হাজার টাকার বাড়তি উপার্জনের সংস্থান করছে। অসচ্ছল ও দুঃস্থ সংসারে এনে দিচ্ছে সচ্ছলতার স্বস্তি।

বড়খড়ি গ্রামে এই সফলতা এক দিনে কিংবা হঠাৎ আসেনি। এর নেপথ্যে কাজ করেছে বাবুল আখতার নামে এক প্রতিবন্ধী যুবকের দীর্ঘদিনের নিরলস শ্রম ও আত্মপ্রত্যয়। ২০০৭ সালে পরিবারের কাছে একেবারেই নিগৃহীত এই যুবক নিজেদের একটি ভাঙা ঘরে শুরু করেন মাশরুম চাষ। তারপর দীর্ঘ পথচলায় জাতীয় মাশরুম উন্নয়ন কেন্দ্রসহ একাধিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান দিয়ে বাবুল ক্রমেই বাড়িয়েছেন তার পরিধি। নিজে যেমন স্বাবলম্বী হয়েছেন পাশাপাশি নিজ গ্রাম বড়খড়িতে দুস্থ ওই ৫০ নারী নিয়ে গড়ে তুলেছেন বিস্তৃত মাশরুম নেটওয়ার্ক।

বাবুল আখতার জানান, নিজ বাড়িতে তার একাধিক মাশরুম উৎপাদন কেন্দ্রে ৬০ কর্মী কাজ করে। গ্রামের যে ৫০ নারী এখন বাড়িতে বাড়িতে মাশরুম চাষ করছেন, মাসিক চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা বেতনে তারা মাশরুম কেন্দ্রে কাজ করতেন। পরে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করে নিজেরাই নিজ বাড়িতে মাশরুম চাষ করছেন। বাবুল আরও জানান, তিনি কখনোই চান না তার কারখানায় কেউ আজীবন কাজ করুক। তার লক্ষ্য কর্মীদের দক্ষ করে গড়ে তুলে সফল মাশরুম চাষি হিসেবে দাঁড় করানো, যাতে তারা স্বাবলম্বী হতে পারে। আর এভাবে সারা দেশে মাশরুম চাষ ছড়িয়ে পড়তে পারে, যেহেতু মাশরুম একটি অনন্য অর্থকরী ফসল, পাশাপাশি এর ঔষধি নানা গুণসহ সুষম খাদ্য উপাদান হিসেবে রয়েছে ব্যাপক গ্র্রহণযোগ্যতা।

ড্রিম মাশরুম সেন্টার নামে বাবুলের মাশরুম কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, গোটা বাড়ির প্রায় সব কক্ষে মাশরুমের চাষাবাদ করা হয়েছে। রয়েছে মাশরুম বীজ উৎপাদনের জন্য বড় আকারের একটি গবেষণাগার। পাশাপাশি রয়েছে মাশরুম প্রক্রিয়াজাত করে সুষম খাদ্যে রূপান্তর করার জন্য একটি কারখানা। তার কারখানায় উৎপাদিত মাশরুম পাউডার ও মাশরুম শুঁটকি সারা দেশে সরবরাহ করা হচ্ছে। এছাড়া কয়েকটি ওষুধ কোম্পানিও তার ক্রেতা। প্রতি মাসে মোটা অঙ্কের অর্থ তিনি উপার্জন করছেন এর মধ্য দিয়ে।

বাবুলের দেওয়া তথ্যমতে, তার অধীনে বর্তমানে ৬০ কর্মী আছেন, যাদের তিনি প্রতি মাসে চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা বেতন দেন। প্রতি কেজি কাঁচা মাশরুম তিনি ১৫০ থেকে ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেন। শুকনো মাশরুম এক হাজার ৫০০ টাকা কেজি ও পাউডার মাশরুম দুই হাজার টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হয়। এছাড়া গ্যানোডর্মা নামের একটি বাদামি মাশরুম আছে যেটি ওষুধ কোম্পানিতে পাঁচ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। প্রতিমাসে তিনি নিজ কেন্দ্রসহ তার নেটওয়ার্ক সদস্যদের মাধ্যমে ৫০০ কেজি মাশরুম রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করেন, যা থেকে একটি বড় অঙ্কের মুনাফা অর্জিত হয়।

বাবুলের মাশরুম কেন্দ্রে কর্মরত লতা পরভীন নামে এক বিপণন কর্মকর্তা জানান, কৃষিতে ডিপ্লোমা ডিগ্রি নিয়ে বর্তমানে বাবুলের সঙ্গে বিপণনের কাজ করছেন তিনি। তার সঙ্গে স্নাতকসহ উচ্চশিক্ষিত আরও ২০ নারী উন্নয়ন কর্মী কাজ করেন। তাদের সবার কাজ হচ্ছে বিভিন্ন বাজার এলাকায় গিয়ে সেমিনারের মাধ্যমে মাশরুমের ঔষধি গুণাগুণ ও অন্য উপকারিতা তুলে ধরা। বিশেষ করে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের মাঝে তারা মাশরুমের বার্তা পৌঁছে দেন। স্থানীয় একজন পল্লি চিকিৎসক এ কাজে মধ্যস্থতা করেন। যারা মাশরুম খেতে আগ্রহী হন তারা ওই পল্লি চিকিৎসকের কাছ থেকে বাবুলের ড্রিম মাশরুম সেন্টারে উৎপাদিত মাশরুম কিংবা পাউডার কেনেন। লতা আরও জানান, আমাদের দেশের অনেক মানুষ মাশরুম সম্পর্কে জ্ঞাত নয়। এটি একটি সুষম খাদ্য ও ডায়বেটিস, উচ্চ রক্তচাপসহ নানা ধরনের অসুখে প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা রাখে। এ কারণে এটির ব্যাপক চাষাবাদ ও প্রচার প্রয়োজন, যে কাজটি বাবুল আখতার করেছেন ও সফল হয়েছেন। বাবুল আখতার তার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সারা দেশে কমপক্ষে ৩০ হাজার পল্লি চিকিৎসককে এ বিষয়ে প্রশিক্ষিত করেছেন, যা তাকে ব্যাপক আর্থিক সাফল্য ও সুখ্যাতি এনে দিয়েছে।

বড়খড়ি গ্রামের সুচিত্রা বিশ্বাস জানান, তিনি একসময় চার হাজার টাকা বেতনে বাবুলের মাশরুম কেন্দ্রে কাজ করতেন। পরে দক্ষতা অর্জন করায় বাবুল নিজে বীজ ও অন্য সহযোগিতা করে সুচিত্রার বাড়িতে এই মাশরুম চাষ করেন। এখন প্রতি মাসে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা অতিরিক্ত আয় হয় তার।

কথা প্রসঙ্গে বাবুল জানান, জš§গতভাবে বাঁ পায়ের পঙ্গুত্ব নিয়ে জীবনযাপন করছেন তিন। অর্থাভাবে লেখাপড়া করা সম্ভব হয়নি। দশম শ্রেণি পাসের পর চায়ের দোকান দেওয়াসহ মানুষের বাড়িতে গৃহকর্ম করেছেন তিনি। পরে এক বন্ধুর পরামর্শে মাশরুম চাষে হাত দেন। প্রতিবন্ধিত্বের কারণে পরিবার ও সমাজের নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন তিনি, যা তাকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে ও আত্মপ্রত্যয়ী করেছে।

বাবুলের মাশরুম চাষ বিষয়ে মাগুরা জেলা প্রশাসক আতিকুর রহমান বলেন, আমার প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের নিয়ে সম্প্রতি বাবুলের মাশরুম কেন্দ্র পরিদর্শন করেছি। তার উন্নয়নে আমরা অভিভূত। মাগুরার জন্য সে উন্নয়নের মডেল হতে পারে। সে শুধু নিজে উন্নত হয়নি তার গ্রামকে সে জাগ্রত করেছে। এটি তার সবচেয়ে বড় সাফল্য। আমরা তাকে সব ধরেনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছি।

 

হ মো. ইমাম জাফর, মাগুরা