প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

আমার গ্রাম আমার শহর

ইমদাদ ইসলাম: জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন দেশে নগর ও গ্রামের বৈষম্য ক্রমাগতভাবে দূর করার উদ্দেশ্যে কৃষিবিপ্লব, গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎতায়ন, কুটিরশিল্প ও অন্যান্য শিল্পের বিকাশ এবং শিক্ষা, যোগাযোগব্যবস্থা ও জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলের আমূল পরিবর্তন সাধনের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে শুধু অঙ্গীকারই করেননি, বাংলাদেশের সংবিধানের ১৬ অনুচ্ছেদে তা অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে তিনি স্থায়ী ও দৃঢ় প্রত্যয়ে অঙ্গীকার করেছিলেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উপলব্ধি করেছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান, অর্থাৎ আমাদের এই দেশ অপার সম্ভাবনাময় একটি দেশ। তিনি তাঁর মেধা ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করেছিলেন। তিনি দেখলেন সব সুযোগ-সুবিধা শহরকেন্দ্রিক। তিনি বাংলাদেশের গ্রামগুলোকে আধুনিক ও পরিকল্পিত গ্রাম হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখলেন। কাউকে পেছনে ফেলে রাখা যাবে নাÑএই নীতি ও আদর্শকে সামনে রেখে প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা গ্রহণ করলেন।

জাতির দুর্ভাগ্য তিনি তাঁর কাজ শেষ করতে পারেননি। বঙ্গবন্ধুর রক্তের উত্তরাধিকারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালের নির্বাচনের ইশতেহারে ৩.১০ অনুচ্ছেদে ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ বাস্তবায়নের ঘোষণা দেন।

প্রতিটি গ্রামে উন্নত রাস্তাঘাট, যোগাযোগ সুবিধা, সুপেয় পানির ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা ও উন্নত চিকিৎসা সুবিধা, মানসম্পন্ন শিক্ষা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, উন্নত পয়োনিষ্কাশন ও বর্জ্যব্যবস্থাপনা, কম্পিউটার ও দ্রুতগতির ইন্টারনেট সুবিধা, বৈদ্যুতিক সরঞ্জামসহ মানসম্মত ভোগ্যপণ্যের বাজার, ব্যাংকিং সুবিধা, গ্রামীণ কর্মসংস্থান, কমিউনিটি স্পেস ও বিনোদনের ব্যবস্থা সম্প্রসারণের মাধ্যমে শহরের সুবিধা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। এছাড়া গ্রামে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানো ও নির্ভরযোগ্য করার লক্ষ্যে গ্রুপ ভিত্তিতে বায়োগ্যাস প্লান্ট ও সৌরশক্তি প্যানেল বসানোয় উৎসাহ ও সহায়তা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। অর্থমন্ত্রী তার ২০২১-২২ সালের বাজেট বক্তৃতায় গ্রামপর্যায়ে কৃষিযন্ত্র সেবা সম্প্রসারণ এবং এর মাধ্যমে গ্রামীণ যুবক ও কৃষি উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান করার কথা উল্লেখ করেছেন।

বিবিএসের ২০১৭ সালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের শতকরা ৬৪ দশমিক ৯৬ ভাগ মানুষ গ্রামে বসবাস করে। এর মধ্যে থেকে প্রতিবছর শতকরা সাত দশমিক ছয় ভাগ মানুষ গ্রাম থেকে শহরে চলে আাসে। এতে করে প্রতিবছরই শহরের ওপর বাড়তি জনসংখ্যার চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। নাগরিক সুবিধা দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে। নগরবাসীরা তাদের প্রাপ্য ন্যূনতম নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ২০৪১ সালে দেশের জনসংখ্যা হবে কম-বেশি ২২ কোটি। দেশে বর্তমানে ০.৫-১ শতাংশ হারে কৃষিজমি কমছে। এর বড় একটি অংশ বসতভিটায় রূপান্তরিত হচ্ছে। কৃষিজমি কমার কারণে ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তা বিঘিœত হবে। এছাড়া গ্রামের জীববৈচিত্র্য নষ্ট হবে। তাই জনবহুল গ্রামগুলোয় শহরের সেবা নিশ্চিত করা গেলে মানুষের শহরে আসা কমে যাবে। গ্রামীণ কৃষির উদ্বৃত্ত শ্রমিকরা পরবর্তী বছরগুলোয় আরও আধুনিক সেবা খাতে নিয়োজিত হওয়ার মাধ্যমে তাদের পেশা পরিবর্তন করছে। এ সকল উদ্বৃত্ত শ্রমিকরা প্রাথমিকভাবে গ্রামীণ ও নগরের বাণিজ্য, পরিবহন ও ব্যক্তিগত সেবামূলক কার্যক্রমে জড়িত হয়। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় গ্রামীণ কৃষি খাতের অনেক শ্রমিক চাকরি নিয়ে চলে যাচ্ছে। ফলে গ্রামীণ কৃষি শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে গ্রামীণ মানুষের জীবনমান আগের থেকে অনেক বৃদ্ধি পাচ্ছে।

গ্রামীণ দারিদ্র্য হ্রাসে মজুরি বৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অর্থনৈতিক উন্নতির পাশাপাশি গ্রামীণ জনপদের মানুষের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই বর্তমান সরকার গ্রামে শহরের সুযোগ-সুবিধা সম্প্রসারণের মাধ্যমে গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসন কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। ২০১৮ সালের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্যমতে, দেশের মোট শ্রমশক্তির শতকরা ৪০ দশমিক ছয় ভাগ জোগান দেয় কৃষি। জিডিপি’তে কৃষির অবদান শতকরা ১৩ দশমিক ছয় ভাগ। বিশ্বের ১৭৪টি দেশে এক কোটি ২০ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি অভিবাসন কর্মী কর্মরত আছে, যাদের অধিকাংশই গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর। এছাড়া প্রায় ৫০ লাখ গার্মেন্ট কর্মী শহরে কাজ করছে। তাদের অধিকাংশই নারী। তাদের প্রায় সবাই গ্রাম থেকে এসেছে। তারা প্রতিমাসেই মোবাইলের ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে গ্রামে পরিবারের কাছে টাকা পাঠাচ্ছে।

অভিবাসী ও তৈরি পোশাকশিল্পে কর্মরত কর্মীদের প্রেরিত অর্থ গ্রামীণ অর্থনীতিকে দিন দিন শক্তিশালী করছে। ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ অনুযায়ী গ্রামাঞ্চলে শহরের আধুনিক নাগরিক সেবাসমূহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে ১৫টি গ্রামকে পাইলট মডেল গ্রাম হিসেবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ১৫টি মডেল গ্রামের আটটি হবে দেশের আটটি বিভাগে এবং বাকি সাতটি হবে হাওর, উপকূলীয় এলাকা, পাহাড়ি এলাকা, চর এলাকা, বরেন্দ্র অঞ্চল, বিল এলাকা এবং অর্থনৈতিক এলাকার পাশে। সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ মডেল গ্রাম বাস্তবায়নে কাজ করছে, তবে মডেল গ্রাম স্থাপনে নেতৃত্বে আছে স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনস্থ স্থানীয় প্রকৌশল অধিদপ্তর। এ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতিটি গ্রামে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবমুক্ত সড়কব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ, উপজেলা মাস্টার প্ল্যান তৈরি করা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে নাগরিক সুবিধা সম্প্রসারণ, প্রতিটি গ্রামে পর্যায়ক্রমে পাইপের মাধ্যমে সুপেয় পানি সরবরাহের ব্যবস্থা, গ্রামীণ বাজার উন্নয়ন এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃজনের লক্ষ্যে বিনিয়োগ পরিকল্পনা তৈরি করা হবে।

আমাদের দেশে অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি কৃষি। কৃষিই আমাদের আবহমান গ্রামবাংলার কৃষ্টি, মনন ও সংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ। ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ গড়তে মৌলিক নাগরিক সুবিধাসমূহ গ্রামাঞ্চলে পৌঁছে দেয়ার মাধ্যমে অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রার বাংলাদেশের উন্নয়নের ভিত্তিকে স্থায়ী রূপ দিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লালিত স্বপ্নের বহিঃপ্রকাশ  ‘আমার গ্রাম আমার শহর’। আর এ স্বপ্ন বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

পিআইডি নিবন্ধ