মত-বিশ্লেষণ

‘আমার বাড়ি আমার খামার’ নারীর ভাগ্য বদলের অঙ্গীকার

নিশাত মাহজাবীন: বাংলাদেশ গ্রামপ্রধান দেশ। প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ গ্রামে বাস করে। তবে দ্রুত নগরায়ণের ফলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কমছে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর প্রধান পেশা কৃষি। দেশের জাতীয় ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন কৃষি উন্নয়নের ওপর নির্ভরশীল। বর্তমান সরকার দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচির আওতায় গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ক্ষুধা, অপুষ্টি ও কৃষির সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে টেকসই প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। এর মাধ্যমে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন সম্ভব হয়েছে। সুস্থ জাতি মানেই উন্নত দেশ। দেশের সার্বিক উন্নয়নে সুস্থ, সবল ও সুশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ক্ষুধা, অপুষ্টি ও দারিদ্র্য বিমোচন তথা সুস্থ জাতি গঠন ও পরিবেশ উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রতিটি বাড়িকে একটি খামারে রূপদানের ঘোষণা দিয়েছিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় সরকার দিন বদলের সনদ বাস্তবায়ন করছে। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) অর্জনের লক্ষ্যে সারাদেশে ‘আমার বাড়ি আমার খামার’ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এ কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে, দেশের আপামর জনসাধারণের ভাগ্যোন্নয়ন এবং অংশীদারত্বের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন। বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জে যেসব বসতবাড়ি রয়েছে, সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রায় সব বাড়িকে কেন্দ্র করেই একটি খামার গড়ে তোলা সম্ভব। এসব খামারে থাকবে হাঁস-মুরগি ও গরু-ছাগল পালনের ব্যবস্থা। থাকবে পারিবারিক পুষ্টি চাহিদা পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় শাকসবজি ও ফলমূলের বাগান এবং মাছ চাষের জন্য ক্ষুদ্র জলাশয় বা ছোট পুকুর। এ ধরনের একটি বহুমুখী খামার গঠনের মাধ্যমে একটি পরিবার খুব সহজেই খাদ্য ও পুষ্টিচাহিদা পূরণের সঙ্গে সঙ্গে আর্থিক সচ্ছলতা আনতে পারে।

আমার বাড়ি আমার খামার প্রকল্প সফল করতে গ্রামীণ নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। প্রাচীনকাল থেকেই এদেশের গ্রামীণ নারীরা প্রায় প্রত্যেক বাড়ির উঠানে হাঁস-মুরগি ও কবুতর পালনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। এগুলোর জন্য খাদ্য সংগ্রহ ও সরবরাহ এবং সেবাযতœ নারীরাই করে থাকে। গবাদিপশু পালন এবং দুধ ও ডিম উৎপাদনে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। মাংস ও ডিম আমাদের প্রাণিজ প্রোটিনের জোগান দেয়। বর্তমানে বাংলাদেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর প্রোটিনের অভাব দূরীকরণে গ্রামীণ নারীরা বসতবাড়িতে আধুনিক পদ্ধতিতে উন্নত জাতের হাঁস-মুরগি পালন করছে। দেশের অর্থনীতিতে যোগ করেছে নতুন মাত্রা। সরকার গ্রামীণ নারীদের ছোট ও মাঝারি আকারের হাঁস-মুরগির খামার, ছাগল ও গাভী পালন এবং দুগ্ধ খামার স্থাপনে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিয়ে আসছে। এছাড়া গ্রামীণ ক্ষুদ্র ও মাঝারি নারী উদ্যোক্তাদের সরকার বিনা জামানতে স্বল্পসুদে ঋণ দিচ্ছে। বাড়ির পাশে ডোবা বা ক্ষুদ্র জলাশয়ে মাছচাষের পাশাপাশি জলাশয়ের ওপরে ঘর তৈরি করে হাঁস ও মুরগির চাষ করছে। এতে অল্প জায়গায় মাছ চাষ ও হাঁস-মুরগি পালন দুটোই সম্ভব হচ্ছে। ফলে একদিকে দেশে প্রাণিজ প্রোটিনের ঘাটতি পূরণ হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়তি অংশ বিক্রি করে পরিবারের আয়ের সংস্থান হচ্ছে।

গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়েদের জন্য ভিটামিন ও খনিজ লবণের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। শাকসবজি, ফলমূল ইত্যাদি ভিটামিন ও খনিজ লবণের উৎকৃষ্ট উৎস। গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পক্ষে ফল, মাছ ও মাংস কিনে খাওয়া সব সময় সম্ভব হয় না। তাই আমাদের দেশীয় শাকসবজি ও ফলমূল খেয়ে প্রয়োজনীয় পুষ্টিচাহিদা পূরণ করা যায়। কারণ আমাদের দেশে অনেক শাকসবজি ও ফলমূল রয়েছে, যেগুলো দামে সস্তা কিন্তু প্রচুর ভিটামিন ও পুষ্টিসমৃদ্ধ। দেহের পুষ্টিচাহিদা শাকসবজি ও ফলমূল থেকে পূরণ করা যায়। বর্তমানে মাচায় সবজি চাষ বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এ পদ্ধতিতে অল্প পুঁজিতে বেশি উপার্জন করা যায়।

কৃষিবান্ধব খামারবাড়ি পুষ্টির উন্নয়নে অন্যতম অবদান রাখছে। একটি বাড়ি যখন খামারে পরিণত হয়, তখন তা বহুমুখী সম্ভাবনাকে কার্যকর করার ক্ষেত্র হিসেবে ভূমিকা রাখে। বাড়ির আঙিনার এক চিলতে জমি পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনায় হয়ে উঠতে পারে পরিবারের সারাবছরের পুষ্টির নিয়মিত উৎস। তাছাড়া করোনার প্রভাব মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী দেশের প্রতিটি ইঞ্চি জমিকে চাষাবাদের আওতায় আনার নির্দেশনা দিয়েছেন। এমনিতেও ঘরের সামনের উঠানে নারীরা পালংশাক, পুঁইশাক, লালশাক, মরিচ, বেগুন ও টমেটোর চারা রোপণ করে পারিবারিক নিয়মিত সবজির চাহিদা পূরণ করে থাকে। ঘরের চাল ও মাচায় লাউ, উচ্ছে ও কুমড়া গাছ লাগিয়ে পরিবারের চাহিদা মেটানোর পরও কিছু বিক্রি করে তারা বাড়তি আয় করে। এসব বিষয়ে ‘আমার বাড়ি আমার খামার’ প্রকল্পের আওতায় প্রশিক্ষণ ও ঋণ নিয়ে একজন নারী আত্মকর্মসংস্থান করে নিতে পারছে।

গৃহস্থালির কাজের অবসরে একজন নারী সহজেই শাকসবজি ও ফলচাষের সঙ্গে সম্পৃক্ত কাজসমূহ, যেমনÑজমি প্রস্তুতকরণ, শাকসবজি ও ফলমূলের বীজ রোপণ, সার প্রয়োগ, আগাছা বাছাই, পানি দেয়া, ফসল তোলা ও সংরক্ষণ এসব ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারে। এছাড়া বসতবাড়ির বাগানে সবজি ও ফলচাষের আরেকটি দিকও রয়েছে। এ ধরনের বাগানে বাড়ির ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরাও অংশ নিতে পারে। ফলে তাদের মধ্যে ছোটবেলা থেকেই খামার করার আগ্রহ সৃষ্টি হওার পাশাপাশি নিয়মিত শাকসবজি আর ফল খাওয়ার অভ্যাস গড়ে উঠবে। এসব খামারে উৎপাদিত শাকসবজি ও ফলমূল সম্পূর্ণ বিষমুক্ত থাকে। পুষ্টিচাহিদা পূরণের জন্য আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রতিটি বসতবাড়িতে শাকসবজি ও ফলচাষের প্রতি নারী ও শিশুদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এতে তারা সুস্থ-সবলভাবে বেড়ে উঠবে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) অর্জনের লক্ষ্যে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ১০টি বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। এর মধ্যে ‘আমার বাড়ি আমার খামার’ প্রকল্প অন্যতম। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এই প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ করছে। সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অধীনে এ প্রকল্পের কাজ এগিয়ে দ্রুত এগিয়ে চলেছে। তৃণমূল পর্যায়ে নারীর ক্ষমতায়ন, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গঠন এ প্রকল্পের লক্ষ্য।

‘আমার বাড়ি আমার খামার’ প্রকল্প দেশের সব উপজেলায় সম্প্রসারিত হয়েছে। একটি গ্রামে ৪০ নারী ও ২০ পুরুষ মিলে ৬০ জনের সমন্বয়ে একটি গ্রাম উন্নয়ন সমিতি গঠন করা হয়েছে। সমিতির একজন সদস্য যে টাকা চাঁদা দেবে, সরকার আরও সেই পরিমাণ টাকা বোনাস হিসেবে দেবে। সারা দেশে এক লাখ ২০ হাজার ‘গ্রাম উন্নয়ন সমিতি’ গঠন করে ৫৪ লাখ ৬০ হাজার পরিবারকে এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং মাসে সর্বোচ্চ ২০০ টাকা হারে দুই বছর সঞ্চয় সমিতির নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা করা হয়। এসব উপকারভোগীর মধ্যে ছয় হাজার ১৭৩ কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৪৯ হাজার জনকে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ঋণ হিসেবে দেয়া হয়েছে ২৪৫ কোটি টাকা। আর দুই লাখ ৪১ হাজার ৩৮৬ জন তিন থেকে পাঁচ দিনের কৃষিভিত্তিক প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। এভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গ্রামীণ নারীদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।

এ প্রকল্পে গ্রাম উন্নয়ন তহবিল থেকে সমিতিভুক্ত ৬০ শতাংশ পরিবারকে ঋণ দিয়ে পারিবারিক ক্ষুদ্র কৃষি খামার স্থাপন করার লক্ষ্য রয়েছে। একইভাবে ঋণ প্রদানের মাধ্যমে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরি করে প্রতি উপজেলা ও জেলায় একটি করে অফিস কাম অনলাইন বিক্রয় কেন্দ্র স্থাপনেরও প্রয়াস থাকবে।

গ্রাম উন্নয়ন তহবিল গঠনের পর এখন তহবিলসহ সমিতি পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের অধীনে স্থানান্তর করে ওই ব্যাংকের মাধ্যমে আর্থিক সেবা অব্যাহত রেখে সমিতির কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হচ্ছে। এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে দেশের ৬৪ জেলার ৪৯২টি উপজেলার চার হাজার ৫৫০টি ইউনিয়নে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে দেশে হতদরিদ্র মানুষের হার ২১ দশমিক আট শতাংশ থেকে কমে ২০২১ সালের মধ্যে ১০ শতাংশে নেমে আসবে বলে আশা করা হয়েছিল। কিন্তু করোনার কারণে এ উদ্যোগ কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

কভিডের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সরকার বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষার উদ্যোগ নিয়েছে। প্রান্তিক পর্যায়ে চাষি বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের প্রণোদনার আওতায় আনা হয়েছে। ফলে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নত হচ্ছে। তৃণমূল পর্যায়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতিশীল হচ্ছে। সরকারের সামনে এখন চ্যালেঞ্জ হলো ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠন। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে সরকার ‘আমার বাড়ি আমার খামার’ প্রকল্প গ্রহণ করেছে। সরকার মুজিববর্ষে আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে দুই শতাংশ জমিসহ গৃহনির্মাণ করে দিচ্ছে। এছাড়া সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় গ্রামীণ দরিদ্র, বয়স্ক, প্রতিবন্ধী, বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্ত নারীদের ভাতা দেয়া হচ্ছে।

‘আমার বাড়ি আমার খামার’ প্রকল্প গ্রামীণ নারীদের ক্ষমতায়নের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। প্রধানমন্ত্রীর কল্পনাপ্রসূত ১০টি বিশেষ উদ্যোগের একটি ‘আমার বাড়ি আমার খামার’ প্রকল্প। এ প্রকল্পে নারীদের পাশাপাশি পুরুষরাও অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। এ উদ্যোগ সফল ও সার্থক করে তুলতে আমাদের সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে; হাতে হাত রেখে এগিয়ে আসতে হবে।

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..