মত-বিশ্লেষণ

আমার বাড়ি আমার খামার

ড. শিল্পী ভদ্র: ‘শেখ হাসিনার উপহার, একটি বাড়ি একটি খামার, বদলাবে দিন তোমার-আমার।’ এই সেøাগান সামনে রেখে দারিদ্র্য নির্মূলে সরকারের কর্মসূচিটির বিস্তার আজ সারা দেশে। ফলে উপকারভোগীদের আয় বৃদ্ধি পেয়ে দারিদ্র্যমুক্তি ঘটছে। একটি বাড়ি একটি খামার, পারিবারিক খামার বা কৃষিকাজের মাধ্যমে দারিদ্র্য দূর করা বাংলাদেশ সরকারের একটি অন্যতম প্রকল্প। এর মূল লক্ষ্য তহবিল সংগ্রহ এবং পারিবারিক খামারের মাধ্যমে দারিদ্র্য নির্মূল ও টেকসই উন্নয়ন। বহুমাত্রিক এই কর্মসূচির মাধ্যমে সরকার একদিকে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে সুসংগঠিত করছে, অন্যদিকে সঞ্চয়ের উৎসাহ প্রদান ও সদস্যদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ উদ্যোগ ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্পের নাম বদলে ‘আমার বাড়ি আমার খামার’ প্রকল্প করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায় ও অনুশাসন বিবেচনা করে নতুন নামকরণের প্রস্তাবে চলতি বছরের ২৫ মার্চ পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় প্রশাসনিকভাবে অনুমোদন দিয়েছে। তাই এখন থেকে নতুন নামে পরিচিতি পাবে প্রধানমন্ত্রীর ১০ বিশেষ উদ্যোগের শীর্ষে থাকা এ উদ্যোগ।
বাংলার কৃষি ও কৃষক একই সুতোয় গাঁথা। কারণ যে কৃষক ধান ফলান, তিনি বাড়ির আঙিনায় শাকসবজির আবাদ করেন; আবার সুযোগ পেলে পুকুরে মাছের চাষও করেন। তিনিই আবার ছাগল, গরু, কবুতর ইত্যাদি পালন করেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মধ্যে এগুলো অত্যাবশ্যকীয়। তবে এমন পারিবারিক খামার গড়ার স্বপ্ন সবার থাকলেও পুঁজির অভাবে অনেকেই তা পেরে ওঠেন না। এসব প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়াতেই সরকারের এই প্রকল্প ‘আমার বাড়ি আমার খামার’। প্রত্যেকে নিজের জমি ব্যবহার করে নিজেরাই স্বাবলম্বী হতে পারে এবং আর্থিকভাবে যাতে সচ্ছলতা আসে সেজন্য প্রতিটি মানুষের জন্য বাড়িঘর নির্মাণ এবং কোনো জমি যেন পতিত না থাকে, সেদিকে লক্ষ রেখে এই প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার।
এই প্রকল্পের অধীনে প্রতিটি গ্রামে ৬০ দরিদ্র মানুষকে নিয়ে একটি সমিতি গঠন করা হয়, তাদের মধ্যে ৪০ নারী সদস্য ও ২০ পুরুষ সদস্য। প্রত্যেক সমিতির নামে একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা হিসাব খোলা হয়। প্রত্যেক সদস্য মাসে ২০০ টাকা করে ওই অ্যাকাউন্টে জমা দেন। এভাবে দু’বছরে প্রতিটি সমিতির অ্যাকাউন্টে সদস্যরা জমা দেন দুই লাখ ৮৮ হাজার টাকা। সরকারও সমপরিমাণ টাকা জমা দেয়। এছাড়া প্রত্যেক সমিতি সরকারের কাছ থেকে তিন লাখ টাকা ঋণ নিতে পারে। অর্থাৎ দু’বছর পর ঋণসহ প্রত্যেক সমিতির তহবিল দাঁড়ায় আট লাখ ৭৬ হাজার টাকা।
উল্লেখ্য, প্রত্যেক সমিতি ছয় মাস পরপর উঠানবৈঠক করে তাদের জমানো তহবিল আয়বর্ধক কোনো কাজে ব্যবহার করবে কি না, সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে। সমিতির সিদ্ধান্ত অনুমোদনের জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে পাঠাতে হয়। প্রস্তাব অনুমোদিত হলে সমিতি ঋণ গ্রহণ করতে পারে। ঋণের প্রক্রিয়াও অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে হয়। অর্থাৎ সমিতির মনোনীত কোনো সদস্যের মোবাইলে ঋণের গোপন পিন কোডটি পাঠানো হয়, যা দেখিয়ে তিনি প্রকল্প-নির্ধারিত ব্যাংক এজেন্টের কাছ থেকে ঋণের টাকা গ্রহণ করতে পারেন। এর ফলে পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়।
এই প্রকল্পে সাত বিভাগ, ৬৪ জেলা, ৪৮৫ উপজেলা, চার হাজার ৫০৩ ইউনিয়ন ও ৪০ হাজার ৫২৭ গ্রাম এবং তৃতীয় সংশোধনীর পর আরও ৬০ হাজার গ্রামকে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয় (সূত্র: বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট)। ২০১৬ সালের ২৫ অক্টোবর এ কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে এ প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধনী আনা হয়; সেইসঙ্গে গঠন করা হয় ‘পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক’।
‘আমার বাড়ি আমার খামার’ প্রকল্পের লক্ষ্য দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ ও মানবসম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার করে কৃষিভিত্তিক আয়বর্ধক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র খামার গড়ে তুলে কৃষি উৎপাদন ও পারিবারিক আয় বৃদ্ধিসহ নারীর ক্ষমতায়ন ও দারিদ্র্যমোচন নিশ্চিত করা।
প্রতিটি বাড়িকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে এবং ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ গড়তে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে বহুমাত্রিক কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন, তার অন্যতম ‘আমার বাড়ি আমার খামার’ প্রকল্প। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা শত্রুকে মোকাবিলা করে যুদ্ধ করে বিজয় অর্জন করেছি। এখন আমাদের যে যুদ্ধ, সেটা হচ্ছে দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে, বাংলাদেশকে আমরা দারিদ্র্যমুক্ত করতে চাই, কাজেই আমাদের এখন প্রধান শত্রু হচ্ছে দারিদ্র্য। এই দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই করতে হবে, অর্থাৎ আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য মনপ্রাণ দিয়ে কাজ করতে হবে।’ (সূত্র: ‘আমার বাড়ি আমার খামার প্রকল্প’, ভিডিও ডকুমেন্টেশন ২০১৪)।
প্রকল্প শুরুর প্রাক্কালে বিদ্যমান দারিদ্র্যের হার ২৪ দশমিক আট শতাংশ থেকে ১৮ দশমিক ছয় শতাংশে নামিয়ে আনা এবং অতি দারিদ্র্যের হার ২০২০ সালের মধ্যে আট শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে এই প্রকল্প কাজ করছে। দারিদ্র্যসীমার নিচের এক কোটি পরিবারকে প্রকল্পভুক্ত করে ২০২১ সালের মধ্যে দারিদ্র্যকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এসডিজি বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার প্রধান লক্ষ্য দারিদ্র্যমোচন। অন্যান্য কর্মসূচির পাশাপাশি ‘আমার বাড়ি আমার খামার’ প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার সেই লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করছে।
যেহেতু এই প্রকল্পের অধীনে গঠিত সমিতির ৬৭ ভাগ সদস্যই নারী, তাই প্রকল্পটি নারীর ক্ষমতায়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আয় বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রান্তিক পরিবারগুলোর অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষাসহ উন্নয়নের সব সূচকেই ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে।
প্রকল্পের সব আর্থিক লেনদেন অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে হচ্ছে বলে একদিকে প্রান্তিক মানুষকে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি সেবার আওতায় আনা যাচ্ছে, অন্যদিকে প্রকল্পের আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও সম্ভব হচ্ছে। আবার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ডিজিটালাইজেশনের আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে।
দরিদ্র মানুষের জন্য তহবিল গঠনের এমন উদ্যোগ বিশ্বে এটাই প্রথম। তাই অনেক দেশ ও আন্তর্জাতিক এনজিও এখন বাংলাদেশ সরকারের দারিদ্র্য নির্মূলের এই মডেল গ্রহণে আগ্রহ দেখাচ্ছে।
সব উপকারভোগী প্রকল্পের মাধ্যমে তহবিল গঠন ও ঋণ নিয়ে আয়বর্ধক কাজে বিনিয়োগের সুফল সম্পর্কে আগ্রহী হলে দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির চিত্র বদলে দিতে অবদান রাখবে বলে আশা করা যায়।

পিআইডি প্রবন্ধ

সর্বশেষ..