দিনের খবর সারা বাংলা

আমের মুকুলে ছেয়ে গেছে ঠাকুরগাঁও

শামসুল আলম, ঠাকুরগাঁও: বসন্ত এসেছে ধরায়। চারদিকে বইছে বসন্তের ফাল্গ–নি হাওয়া। সেইসঙ্গে যোগ হয়েছে আমের মুকুলের স্বর্ণালি শোভা। এর সৌন্দর্য ও ঘ্রাণে মাতোয়ার ঠাকুরগাঁওয়ের প্রায় সব এলাকা। কৃষিনির্ভর জেলাটির সব উপজেলার বর্তমান চিত্র এমনই। শিলাবৃষ্টি বা অন্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে আমের ভালো ফলন আশা করছেন কৃষকরা।

ঠাকুরগাঁও ধান, গম, আখ ও পাটের জেলা হিসেবে পরিচিত হলেও বারবার ধান ও গমে লোকসানের মুখে পড়ে। এখানকার অনেক জমিতে এখন আমসহ বিভিন্ন ফলের বাগান গড়ে তোলা হয়েছে।

ঠাকুরগাঁও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মতে, এবার আমবাগানের জন্য জমি রয়েছে ১০ হাজার ৪০ হেক্টর। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সদর উপজেলার বসতবাড়িসহ অনেকের নানা ফলবাগান রয়েছে। এর মধ্যে আমের বাগান তুলনামূলকভাবে বেশি। গাছে গাছে মুকুল শোভা পাচ্ছে। তবে ঝড়ো হাওয়া, পরিচর্যার অভাব ও পোকার আক্রমণে মুকুল নষ্ট হতে পারে বলে মনে করছেন কৃষকরা।

সদর  উপজেলার ভেলাজান নয়াপাড়া গ্রামের আমবাগানের মালিক মো. রুস্তম আলী মাস্টার জানান, ধান ও গম চাষ করে তেমন লাভ নেই। তাই দুই একরের বেশি জমিতে এবার বারি-৪ জাতের আমের বাগান করেছেন। তার বাগানে প্রায় ৬০০ আমগাছ রয়েছে। এ জাতের গাছ একটানা ২০ থেকে ৩০ বছর ফল দিয়ে থাকে। বাগান করতে তার প্রায় পাঁচ লাখ টাকা খরচ হয়েছে।

জানা গেছে, বারি-৪ জাতের আম সাধারণত আশ্বিনের শেষ দিকে পাকে। তখন এ আম কেজিপ্রতি বিক্রি হয় ২০০ থেকে ২৫০ টাকায়। সময়মতো কীটনাশক ছিটিয়ে ও পরিচর্যা করে ভালো ফলন ও দাম পাওয়ার আশা করছেন তিনি।

একই উপজেলার আলাদি বাজার এলাকার আম বাগানের মালিক মো. ফেরদৌস ও  ফরহাদ হোসেন জানান, আমার বাগানে আম ও লিচু মিলে তিনশ’র বেশি গাছ রয়েছে। বেশিরভাগ গাছ সূর্যপুরি ও আম্র্রপালির। গাছে প্রচুর মুকুল এসেছে। ধান ও অন্য ফসলের তুলনায় আম ও লিচুবাগানে লাভ বেশি। পরিশ্রমও কম। আম ও লিচু একটু বড় হলে বিক্রি করে দিই। গত বছর আমি এ বাগান থেকে প্রায় পাঁচ লাখর মুনাফা করেছেন তারা।

দেশে-বিদেশে আমের চাহিদা রয়েছে। তাই ব্যবসায়ীদের দুশ্চিন্তার কিছু নেই বলে জানিয়েছেন একাধিক আমচাষি। তাছাড়া আমবাগানের পাশাপাশি সাথি ফসল হিসেবে শাকসবজি আবাদ করা যায়। ঠাকুরগাঁওয়ে নানা জাতের আম, যেমন বারি-৪, আম্রপালি, সূর্যপুরী, ল্যাংড়া, গোপালভোগ, আসিনিয়া, মোহনা, ফজলি, মিশ্রিভোগ প্রভৃতির ফলন বেশ ভালো। প্রতি মৌসুমে আম বিক্রি করে লাভের মুখ দেখেন অনেক চাষি ও আম ব্যবসায়ী।

পীরগঞ্জ উপজেলার কৃষক সাইফুর রহমান বাদশাও একই কথা বলেন, শুধু ধান-পাট চাষাবাদ করে তেমন লাভ পাই না। তাই তিনিও আমের বাগান করেছেন। তার বাগানে কম-বেশি তিনশ’র বেশি গাছ রয়েছে। অধিকাংশ গাছ আম্রপালি, সূর্যপুরী ও ল্যাংড়া জাতের। আমগাছে এবার ভালো মুকুল এসেছে। গত বছর সময়মতো কীটনাশক ছিটিয়ে ও পরিচর্যা করে লাভের মুখ দেখেছেন তিনি।

তিনি আরও জানান, প্রতি বছরই তার বাগান থেকে সারাদেশে আম সরবরাহ করা হয়। এখানকার অনেক বেকার যুবক এখন বাণিজ্যিকভাবে আম্রপালি চাষাবাদে ঝুঁকেছেন। এ জাতের গাছ লাগাতার ফল দেয় ১০ থেকে ১২ বছর। ফলনও হয় ব্যাপক।

অনেক বাগান মালিক জানান, বিগত বছরের চেয়ে এবার আমের মুকুল ভালো। আবহাওয়া ভালো থাকলে আমের বাম্পার ফলন হবে বলে তারা আশা করছেন।

তাই অনেকে আমের ভালো ফলন ও রং ভালো রাখার জন্য গাছের গোড়ায় পানি দিচ্ছেন। মুকুল থেকে গুটি বের হলে নিয়মমাফিক ভিটমিন ও কীটনাশক স্প্রে করা হবে।

অনেক ব্যবসায়ী দুই-তিন বছরের চুক্তিতে আমবাগান কেনেন। তারাই তখন বাগান দেখভাল ও পরিচর্যা করেন। বড় আমবাগান দুই থেকে তিন বছর কিংবা তার অধিক সময়ের জন্য অগ্রিম বিক্রি হয়ে যায়। কিছু বাগান বিক্রি হয় মুকুল দেখে। আবার কিছু বাগান বিক্রি হয় ফল মাঝারি আকারের হলে। প্রতি বছর স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানসহ বিদেশে আম রপ্তানি করা হয়।

বাগান ব্যবসায়ী তোতা মিয়া আলী জানান, গত বছরের মতো এ বছর আবহাওয়া ভালো থাকায় এবার ব্যাপক মুকুল দেখা যাচ্ছে। ব্যবসায়ী ও বাগান মালিকরা বলছেন, মুকুল দেখে আশা করা যায় এবার আমের ব্যাপক ফলন হবে। শিলাবৃষ্টি বা ঝড় না হলে ব্যাপক আমের ফলন পাওয়া যাবে বলে জানান তারা।

জেলা কৃষি বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. মনজু আলম সরকার জানান, ছত্রাকে যাতে মুকুল নষ্ট না হয়, সেজন্য কীটনাশক হিসেবে ইমিডাক্লোপ্রিড গ্রুপের দানাদার প্রতি লিটার পানিতে দুই গ্রাম ও সাইপারম্যাক্সিন গ্রুপের কীটনাশক প্রতি লিটার পানিতে এক মিলিলিটার মিশিয়ে স্প্রে করার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। মুকুল গুটিতে পরিণত হওয়ার সময় একই মাত্রায় দ্বিতীয়বার স্প্রে করতে হবে।

ঠাকুরগাঁও জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আফতাব হোসেন জানান, এখানের সূর্যপূরী আম সারাদেশে সুনাম কুড়িয়েছে। এখানকার আমে পোকা থাকে না, এটাই বিশেষ বৈশিষ্ট্য। আমের আকার দেখতে ছোট হলেও স্বাদে-গন্ধে অতুলনীয়।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..