মত-বিশ্লেষণ

আয়কর মেলা ও আমাদের প্রত্যাশা

কাজী সালমা সুলতানা: আয়কর মেলার শেষ দিন আজ। এবারও এই মেলা বেশ সাড়া জাগিয়েছে করদাতাদের মধ্যে। বিশেষ করে যারা মেলায় গিয়ে কর দিয়েছেন তারা সবাই খুশি। কর বিভাগের কর্মকর্তাদের সেবায় কোনো ধরনের ঝামেলা ছাড়াই খুব কম সময়ে কর দিতে পেরেছেন তারা। সরকারি সেবা নিয়ে এমন তুষ্ট জনগণকে সাধারণত হতে দেখা যায় না। এ জন্য আয়কর বিভাগকে অবশ্যই অভিনন্দন জানানো যায়। এবারও মেলা প্রাঙ্গণেই করসংক্রান্ত সবকিছু ছিল। ই-টিআইএন নিবন্ধন, আয়কর বিবরণী গ্রহণ ও কর পরিশোধের সুযোগের পাশাপাশি মিলেছে আয়কর বিবরণী পূরণে রাজস্ব কর্মকর্তাদের সহায়তা। সেইসঙ্গে কর শিক্ষা প্রদানের যাবতীয় ব্যবস্থা। তবে মেলার সময়সীমা বাড়ানোর দাবিও করেন কেউ কেউ। এবার নতুন করদাতার সংখ্যা বেড়েছে। সেইসঙ্গে নারী করদাতাদের সংখ্যা গতবারের রেকর্ড ছাড়াবে বলে আশা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের।

‘সবাই মিলে দেব কর, দেশ হবে স্বনির্ভর’ এ সেøাগানকে ধারণ করে রাজধানীর পাশাপাশি দেশের প্রতিটি বিভাগেই সপ্তাহব্যাপী চলছে আয়কর মেলা। আয়কর মেলার প্রথম দিনেই আয়কর রিটার্ন দাখিল করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এদিন সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন চলতি অর্থবছরের জন্য ২৫ কোটি টাকা আয়কর দিয়েছেন। এছাড়া গ্রামীণফোন আয়করের অংশ হিসেবে ১৫০ কোটি টাকা এবং ইসলামী ব্যাংক আয়কর হিসেবে ১০০ কোটি টাকা জমা দিয়েছে। আয়কর মেলার প্রথম দিন রাজস্ব আদায় হয়েছে ৩২৩ কোটি টাকা। এবার আয়কর মেলার পরিধি গত বছরের চেয়ে কয়েকগুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। সারা দেশে শুরু হওয়া মেলার প্রথম দিনে সারা দেশে রাজস্ব আহরণ হয়েছে ৩২৩ কোটি ১৮ লাখ ৯৩ হাজার ৮৮৫ টাকা। মেলার দ্বিতীয় দিন শুক্রবার মোট দুই লাখ ৬৮ হাজার ৬৮৪ জন আয়করবিষয়ক সেবা নিয়েছেন। এর মধ্যে ৭৩ হাজার ৮৪৩ জন রিটার্ন দাখিল করেছেন।

এ বছর দেশের আটটি বিভাগ, ৫৬টি জেলা, ৫৬টি উপজেলাসহ মোট ১২০টি স্পটে আয়কর মেলা হচ্ছে। আজ মেলার ষষ্ঠ দিনে চট্টগ্রাম মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ চলতি অর্থবছরে ২৯ কোটি ১৮ লাখ ৮৩ হাজার টাকার আয়কর দিয়েছে। ১৯৫০ সালে দেশের দ্বিতীয় এ সমুদ্রবন্দরটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এটি বন্দর কর্তৃপক্ষের সর্বোচ্চ আয়কর প্রদান। চলতি অর্থবছরে সরকারের খরচ মেটাতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে কর হিসেবে তিন লাখ ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা আদায় করার লক্ষ্য ধরা হয়েছে বাজেটে। এর মধ্যে আয়কর ও মুনাফার ওপর কর থেকে এক লাখ ১৩ হাজার ৯১২ কোটি টাকা রাজস্ব পাওয়ার আশা করা হচ্ছে।

শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় মেলায় করদাতা ও সেবাগ্রহীতাদের উপচেপড়া ভিড় ছিল। সকাল থেকেই মেলায় নেমেছিল উৎসবের আমেজ। মেলা প্রাঙ্গণ করদাতাদের মিলনমেলায় পরিণত হয়। তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না মেলা প্রাঙ্গণে। ছুটির দিন হওয়ায় সরকারি ও বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাড়াও অন্য পেশাজীবীরাও মেলায় এসেছেন। মেলার বিভিন্ন কর অঞ্চলের রিটার্ন গ্রহণ বুথ, হেল্প ডেস্ক, ব্যাংকের বুথ, ই-পেমেন্ট বুথ, ই-টিআইএন বুথসহ সব বুথে করদাতাদের ছিল প্রচণ্ড ভিড়।

আগের বছরগুলোতে আয়কর মেলায় যারা কর পরিশোধ করেছেন তাদের মতে, এ বছরে মেলায় সেবার মান আগের তুলনায় আরও ভালো হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে উৎসাহব্যঞ্জক। নতুন করদাতারাও মেলায় কর পরিশোধ করতে পেরে খুশি। আবার বয়স্ক ব্যক্তি, যারা সিনিয়র সিটিজেন হিসেবে পরিচিত, তাদের জন্য পৃথক বুথ রাখায় তারাও খুশি। আগের বছরগুলোয় কর সার্কেল, কর বিবরণী ও টাকা জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা থাকলেও এবার তা নেই। অনেক করদাতা দ্রুতই কর দিয়ে মেলা প্রাঙ্গণে ছবি তোলায় মেতে উঠছেন। আবার সে ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে দিচ্ছেন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড আয়কর মেলার আয়োজন করে কর প্রদানকে উৎসবে পরিণত করেছে। এটি জাতীয় সমৃদ্ধি অর্জনের পথে একটি দৃষ্টান্ত। কর প্রদানকে আগে মানুষ একটি ঝামেলাপূর্ণ ও জটিল কাজ হিসেবে মনে করতেন। মেলা আয়োজনের মাধ্যমে দ্রুত কর আদায় এবং কর ব্যবস্থাকে দিন দিন জনপ্রিয় করা হচ্ছে। একই সঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে আরও কিছু নতুন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

আমাদের দেশে বিপুলসংখ্যক মানুষ করযোগ্য আয় করলেও করের আওতায় আসেনি। দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হয়েছে। ১৬ কোটি জনসংখ্যার দেশে ই-টিআইএন আছে মাত্র ৩৫ লাখ ৩৯ হাজার ৭৪৩ জনের। এর মধ্যে গতবছর রিটার্ন দাখিল করেন মাত্র ১৫ লাখ ৯৭ হাজার জন। অর্থাৎ মাত্র এক শতাংশ মানুষ কর প্রদান করছেন। যখন আমরা উন্নয়নশীল দেশের শর্ত পূরণ করেছি, তখন করদাতার এ হার কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ব্যবসা-বাণিজ্য এখন গ্রামাঞ্চলেও সম্প্রসারিত হয়েছে। এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অধিকাংশই করযোগ্য আয় করে থাকে। কিন্তু সেগুলো এখনও করের আওতায় আসেনি। এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে করের আওতায় আনা প্রয়োজন। করবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলে আয়কর হিসেবে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা নিয়ে এগুলোকে করের আওতায় আনা যেতে পারে। একইভাবে করযোগ্য আয় করেন এমন ব্যক্তিকেও করের আওতায় আনতে হবে। এ পদ্ধতিতে করের আওতা সম্প্রসারণ করা হলে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় হবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এদিকে বিশেষ দৃষ্টি দেবে বলেই প্রত্যাশা। 

গণমাধ্যমকর্মী

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ »

সর্বশেষ..