মত-বিশ্লেষণ

আয়কর রিটার্নের জটিলতা দূর করা হোক

মো. জিল্লুর রহমান: জনগণের দেওয়া করই হচ্ছে রাষ্ট্রের আয়ের প্রধান উৎস। কর দুই ধরনের প্রত্যক্ষ কর যা আয়কর নামে পরিচিত এবং পরোক্ষ কর যা ভ্যাট, আবগারি শুল্ক প্রভৃতি নামে পরিচিত। আয়কর প্রত্যক্ষ কর এবং এটা রাজস্ব আহরণে বড় ধরনের ভূমিকা রাখে। আয়কর সরাসরি আয়কর দাতাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। কর আদায়ে সরকারের নানামুখী পদক্ষেপের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় রাজস্ব আহরণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। প্রতিবছর বাড়ছে সেবা গ্রহণকারী, রিটার্ন দাখিলকারী ও আয়কর আদায়ের পরিমাণ। বেড়েছে নতুন ই-টিআইএনের সংখ্যাও। আয়কর প্রদানে উৎসাহ বৃদ্ধি ও আদায়ে অগ্রগতির এ চিত্র নিঃসন্দেহে একটি আশা জাগানিয়া সুসংবাদ এবং প্রশংসার দাবিদার।

নিয়ম অনুযায়ী প্রতি বছর একজন করদাতাকে নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন জমা দিতে হয়। এই লক্ষ্যে কয়েক বছর ধরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নভেম্বর মাসে সারা দেশে আয়কর মেলা আয়োজন করে আসছে। এবার এনবিআর করোনার কারণে এই আয়োজন থেকে বিরত রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রতি বছর ৩০ নভেম্বরের মধ্যে রিটার্ন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এবারও এর ব্যতিক্রম করা হয়নি।

২০০৮ সালে দেশে প্রথম আয়কর দিবস পালন শুরু হওয়ার পর বহু করদাতা কর বিষয়ে সচেতন ও উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। আয়করের প্রতি দেশের মানুষের আগ্রহ যেমন বেড়েছে, পাশাপাশি বেড়েছে আয়করদাতাদের সংখ্যাও। আয়কর মেলায় কোনো ধরনের হয়রানি ছাড়াই যে কোনো নতুন করদাতা তার করনথি খুলতে পারছেন। চাহিদা অনুযায়ী সব কাগজপত্র ঠিক থাকলে আয়কর মেলায় গিয়ে একজন নতুন করদাতা মাত্র ২০ মিনিটেই ইলেকট্রিক ট্যাক্স পেয়ার্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (ই-টিআইএন) সার্টিফিকেট পাচ্ছেন। পুরোনো করদাতারাও পাচ্ছেন কর বিবরণীর প্রাপ্তিস্বীকারপত্র। কাউকে এজন্য দীর্ঘসূত্রতায়ও পড়তে হচ্ছে না। আর এক ঘণ্টায় মিলছে করদাতার কর বিবরণীর প্রাপ্তিস্বীকারপত্র। আয়কর মেলার এই চিত্র খুবই সুখকর।

কভিডের কারণে সারা বিশ্বে অনলাইনকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। সেই জায়গায় এনবিআরের অনলাইন কার্যক্রম চালু থাকা উচিত ছিল। অথচ এ করোনা মহামারির মধ্যে অনলাইন কার্যক্রম বন্ধ আছে। এক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে অনলাইনে রিটার্ন জমা দিতে যে প্রণোদনা ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ করদাতারা। এ বছর সময় না বাড়ানোর ক্ষেত্রে এনবিআর যে ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা রাজস্ব আহরণের স্বার্থে সহায়ক ও ইতিবাচক নয়। তাছাড়া এনবিআরের করসংক্রান্ত ফর্মের জটিলতা বেশ পুরোনো। দুঃখের বিষয় এনবিআর এতদিন করদাতাবান্ধব একটি সর্বজনীন ফর্ম তৈরি করতে সক্ষম হয়নি, যার কারণে করদাতাদের নানা জটিলতায় পড়তে হচ্ছে। সরকার একদিকে অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়াকে উৎসাহিত করছে, অন্যদিকে বন্ধ রয়েছে অনলাইনে জমা দেওয়া কার্যক্রম। এটা এনবিআরের এক ধরনের স্ববিরোধিতা ছাড়া আর কিছুই নয়। এছাড়া করোনাকালে ভিড় এড়াতে বেশি প্রয়োজন ছিল অনলাইন কার্যক্রম, যা এখনও সচল করতে পারেনি এনবিআর।

গত বছর আয়কর মেলার এনবিআরের রাজস্ব আদায় প্রথম তিন দিনে হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছিল। এক দিনেই প্রায় দুই লাখ ৭১ হাজার ৯৪০ জন আয়কর সেবা গ্রহণ করেছিল। আর রিটার্ন জমা দিয়েছিল প্রায় ৮৪ হাজার ৫৩৫ করদাতা। এর বিপরীতে আয়কর আদায় হয়েছিল ২৬২ কোটি টাকা। নতুন করে এক দিনে চার হাজার ১১ জন ই-টিআইএন নিয়েছিল।

সুতরাং প্রতিবছর আয়কর মেলায় অংশ নেওয়া মানুষের ভিড় দেখেই বোঝা যায়, মানুষ আয়কর দিতে কতটা আগ্রহী। লক্ষ করার বিষয় হলো, আয়কর মেলায় প্রতি বছর ভিড় বেড়েই চলেছে। কিন্তু এ বছর করোনার কারণে আয়কর মেলা হচ্ছে না। তবে আয়কর প্রদানে আগ্রহীদের একটি বড় অভিযোগ হলো, আয়কর প্রদানের প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল। এ জটিলতা দূর করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। এতে সাধারণ মানুষের করভীতি দূর হবে। সাধারণ মানুষের করভীতি দূর করতে না পারলে কাক্সিক্ষত মাত্রায় আয়কর আদায় সম্ভব নয়।

তবে এবারের আয়কর রিটার্নের পরিস্থিতি পুরোটাই ভিন্ন। প্রতিটি কর অঞ্চলে অল্প পরিসরে মিনি করমেলার মতো আয়োজন করা হয়েছে। কিন্তু এতে সাধারণ করদাতাদের আগ্রহ নেই বললেই চলে। কর অঞ্চলগুলো স্বাস্থ্যবিধি মেনে স্বল্প পরিসরে করসেবা দিয়ে আসছে। অনলাইন সেবা এবং ব্যাপক আকারে আয়কর মেলা না থাকায় চরম বিপাকে করদাতারা। অনেক ভুক্তভোগী বলছেন, এনবিআর সবকিছু নিজেদের মতো করে চিন্তা করে, করদাতাদের সমস্যাগুলোকে গুরুত্ব দিতে চায় না। গত বছর আয়কর মেলা থাকার পরও সময় বাড়ানো হয়েছিল। এবার এই সুযোগ না থাকায় অনেক করদাতা বিপাকে পড়তে পারেন।

করোনাকালে অনলাইন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় একজন করদাতা চাইলেও নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন জমা দিতে পারছেন না। এক পাতার রিটার্ন ফরম চালু করলেও এ নিয়ে করদাতাদের মধ্যে জটিলতা রয়েছে। এনবিআরের ওয়েবসাইটেও এই এক পাতার রিটার্ন ফরম পাওয়া যাচ্ছে না। কবে পাওয়া যাবে এনবিআর তাও সুস্পষ্টভাবে করদাতাদের জানাচ্ছে না। নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন জমা দিতে না পারলে অনেক করদাতা আইনি জটিলতায় পড়বেন। এছাড়া নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন জমা না দিলে অনেক আয়করদাতাকে জরিমানার মুখোমুখি হতে হবে। এসব জটিলতার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়বে রিটার্ন জমা ও সরকারের রাজস্ব আদায়ে। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সময় থাকতেই এটা বিবেচনা করতে হবে।

সর্বশেষ এনবিআরের তথ্যানুযায়ী সারা দেশে মোট ট্যাক্সপেয়ারস আইডিন্টিফিকেশন নাম্বারধারী (টিআইএনধারী) হচ্ছেন ৪৯ লাখের বেশি। এর মধ্যে সর্বশেষ তথ্য পর্যন্ত রিটার্ন জমা দিয়েছেন মাত্র সাড়ে সাত লাখ করদাতা। অর্থাৎ এখনও রিটার্ন জমা দেননি ৪১ লাখ। লাখ লাখ করদাতা ৩০ নভেম্বরের মধ্যে রিটার্ন জমা না দিতে পারলে তাদের জরিমানা গুনতে হবে। এরই মধ্যে নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন জমা দিতে না পারার আশঙ্কায় অনেকে এনবিআরের কাছে সময় বাড়ানোর আবেদন করেছেন। নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন জমা দেওয়ার ব্যাপারে সন্দিহান তারা।

রিটার্ন দাখিলের জটিলতায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আয়কর আদায়ে ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে। করোনার কারণে সরকারিভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। সারা বিশ্বে করোনাকালে সব কাজকর্মে অনলাইনে নির্ভরতা বাড়লেও আমাদের এনবিআর ম্যানুয়াল পদ্ধতিতেই রিটার্ন জমা নিচ্ছে। সার্ভার জটিলতায় বন্ধ রয়েছে অনলাইনে জমা এবং এটা সক্রিয় করারও কোনো লক্ষণ এনবিআরের পক্ষ থেকে দেখা যাচ্ছে না। এরই মধ্যে এনবিআর জানিয়েছে, সময় বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। আর সাধারণ করদাতারা রিটার্ন-সংক্রান্ত এসব জটিলতায় নিশ্চিত আইনি ফাঁদে পড়বেন। এর প্রভাব পড়বে রিটার্ন জমায়ও। কিন্তু হতাশার খবর হচ্ছে, অনেক আয়কর প্রদানকারী অভিযোগ করছেন, তারা পূর্ববর্তী বছরগুলোয় আয়কর মেলা কিংবা অফিসে রিটার্ন জমাদান করে প্রাপ্তিরশিদ ও আয়কর সনদ সংগ্রহ করার পরও পরে কোনো কোনো আয়কর সার্কেল অফিস আয়কর প্রদানকারীদের চিঠি দিয়ে তলব করে। তখন তাদের জানানো হয়, তাড়াহুড়ো করে রিটার্ন জমা নেওয়ার সময় তাদের রিটার্ন ফরম যথাযথভাবে হিসাব বা পরিমাপ করা যায়নি। এক্ষেত্রে তাদের কাছে অতিরিক্ত অর্থ ঘুষ (তাদের ভাষায় বকশিশ) হিসেবে দাবি করা হয় এবং চাহিদামতো প্রদান না করলে আয়কর মামলা বা এ ধরনের জটিল অবস্থায় ফেলার ভয় দেখানো হয়। রিটার্ন জমা

দিয়ে আয়কর সনদ সংগ্রহের পরও এ ধরনের পরিস্থিতি খুবই বিব্রতকর, লজ্জাজনক এবং বড় ধরনের মানসিক চাপ তৈরি করে। অনেকে লোকলজ্জার ভয়ে দাবি করা অর্থ পরিশোধ করে রফাদফা করে থাকে, কিন্তু তারপরও তার মধ্যে পরবর্তী বছরের ভীতিকর অবস্থা কাজ করে।

কভিডের কারণে সারা বিশ্ব সংকটে রয়েছে, এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। এই পরিস্থিতিতে সময় বাড়ানোর বিষয়টি এনবিআর বিবেচনা করতে পারে। আজও টিআইএনধারী এবং রিটার্ন জমাদানকারীর মধ্যে বিশাল পার্থক্য বিদ্যমান রয়েছে। টিআইনধারীরা যদি রিটার্ন দাখিল না করেন, তাহলে এনবিআরের কাছে তাদের তথ্য থাকবে না। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো রিটার্ন দাখিল-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে অনেকে কর দিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। এক্ষেত্রে এনবিআরকে রাষ্ট্রের স্বার্থে করদাতাবান্ধব সর্বজনীন ফরম তৈরি ও সহজে বিতরণের ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া রাজস্ব আহরণের স্বার্থে সময় বাড়ানোর বিষয়টিও এনবিআরের ইতিবাচকভাবে বিবেচনায় করা উচিত। এতে বাড়বে রিটার্ন দাখিলকারী, বাড়বে সরকারের রাজস্ব আয়।

ব্যাংকার ও ফ্রিল্যান্স লেখক

[email protected]

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..