দিনের খবর প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

আয়ুষ্কাল পেরিয়ে গেছে রেলের পশ্চিমাঞ্চলের ৭৬৫টি সেতুর

ঝুঁকি নিয়ে চলছে ট্রেন

ইসমাইল আলী: বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের অধীনে রাজশাহী, রংপুর, ময়মনসিংহ ও খুলনা বিভাগের পুরোটাই রয়েছে। এক হাজার ৪২৭ কিলোমিটারব্যাপী এ রেলপথে সেতু (মেজর ও মাইনর) রয়েছে প্রায় দেড় হাজার। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক রেল সেতুর আয়ুষ্কালই পেরিয়ে গেছে। তাই মেয়াদোত্তীর্ণ এসব রেল সেতুর ওপর দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলছে ট্রেন। মাঝেমধ্যে এসব সেতু ধসে পড়ে ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

সূত্রমতে, পশ্চিমাঞ্চলে আটটি সেকশনে (রুট) ১৪৪টি মেজর সেতুর আয়ুষ্কাল পেরিয়ে গেছে। এর মধ্যে বড় সেতু রয়েছে ১০টি। বাকি ১৩৪টি মাঝারি সেতু। আর মাইনর (ছোট) সেতুর আয়ুষ্কাল পেরিয়ে গেছে ৬২১টির। সব মিলিয়ে পশ্চিমাঞ্চল রেলের ৭৬৫টি সেতুর আয়ুষ্কাল পেরিয়ে গেছে।

আয়ুষ্কাল পেরিয়ে এসব সেতুর মধ্যে মেজর রেল সেতুগুলোর দৈর্ঘ্য ছয় হাজার ৫৪৪ কিলোমটার। আর মাইনর সেতুগুলোর দৈর্ঘ্য দুই হাজার ৯৭৫ দশমিক ৫০ কিলোমিটার। এসব সেতু পুনর্নির্মাণ ও পুনর্বাসনে প্রকল্প নিতে যাচ্ছে রেলওয়ে। এর মধ্যে মেজর সেতুগুলোর স্থলে গার্ডার সেতু নির্মাণ করা হবে। আর মাইনর সেতুগুলোর স্থলে নির্মাণ করা হবে বক্স কালভার্ট। এজন্য ব্যয় ধরা হয়েছে চার হাজার ২৩২ কোটি ৩৮ লাখ টাকা।

তথ্যমতে, মেয়াদোত্তীর্ণ সেতু সবচেয়ে বেশি রয়েছে আব্দুলপুর-চাঁপাইনবাবগঞ্জ-রোহানপুর বর্ডার সেকশনে। এ রুটে ২১২টি সেতুর আয়ুষ্কাল পেরিয়ে গেছে। এর মধ্যে বড় সেতু রয়েছে দুটি, মাঝারি ৯টি ও ছোট ২০১টি। এর পর ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে সান্তাহার-চিলাহাটি সেকশন। এ রুটে ১১২টি সেতুর আয়ুষ্কাল শেষ। এর মধ্যে বড় সেতু রয়েছে একটি, মাঝারি ১৭টি ও ছোট ৯৪টি।

এদিকে পোড়াদহ-গোয়ালন্দঘাট সেকশনে মেয়াদোত্তীর্ণ সেতু রয়েছে ১০৩টি। এর মধ্যে ১৫টি মাঝারি ও ৮৮টি ছোট সেতু রয়েছে। আর সান্তাহার-কাউনিয়া সেকশনে মোট ১০২টি সেতুর আয়ুষ্কাল পেরিয়ে গেছে। এর মধ্যে একটি বড়, ৩৬টি মাঝারি ও ৬৫টি ছোট সেতু রয়েছে। এছাড়া ঈশ্বরদী-সান্তাহার সেকশনে মেয়াদোত্তীর্ণ সেতু রয়েছে ৬৮টি। এর মধ্যে বড় সেতু দুটি, মাঝারি ৩৩টি ও ছোট সেতু ৩৩টি।

এর বাইরে সিরাজগঞ্জ-ভেড়ামারা সেকশনে ৫৮টি, সান্তাহার-কাউনিয়া সেকশনে ৫৭টি ও ভেড়ামারা-দর্শনা বর্ডার সেকশনে ৫৩টি সেতুর আয়ুষ্কাল পেরিয়ে গেছে। এর মধ্যে সিরাজগঞ্জ-ভেড়ামারা সেকশনে চারটি বড়, ১৪টি মাঝারি ও ৪০টি সেতু মেয়াদোত্তীর্ণ। সান্তাহার-কাউনিয়া সেকশনে দুটি মাঝারি ও ৫৫টি সেকশনে ছোট সেতুর আয়ুষ্কাল শেষ। আর ভেড়ামারা-দর্শনা বর্ডার সেকশনে আটটি মাঝারি ও ৪৫টি ছোট সেতুর আয়ুষ্কাল ফুরিয়ে গেছে।

সেতুগুলো পুনর্নির্মাণ-সংক্রান্ত প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, দর্শনা থেকে জগতি পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণের মাধ্যমে ১৮৬২ সালে এ অঞ্চলে শুরু হয় ট্রেনের যাত্রা। এরপর পশ্চিমাঞ্চল রেলপথ সম্প্রসারণ হতে থাকে। এসব রেলপথে ইটের গাঁথুনির স্ট্রাকচার হিসেবে রেল সেতুর ডিজাইন করা হয়েছে। অধিকাংশ মেজর সেতুর পিয়ার ও এমব্যাংকমেন্ট ইটের গাঁথুনির ফাউন্ডেশনের ওপর নির্মিত। অন্যান্য সেতুর ফাউন্ডেশনও ডিজাইন করা ইটের গাঁথুনির ওপর। এসব সেতুর আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে গেলেও এগুলোর ওপর দিয়ে ট্রেন চলাচল অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে ইটের গাঁথুনিতে ফাটল দেখা দেওয়ায় এসব সেতুতে ট্রেন চলাচলে নিয়ন্ত্রণাদেশ দেওয়া হয়। এতে ট্রেন চলাচলে সময়ানুবর্তিতা হ্রাস পাওয়াসহ নানা ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হয়। এছাড়া যাত্রী সাধারণের মনে নিরাপত্তা ভীতির সঞ্চার হয়। তাই সেতুগুলো পুনর্নির্মাণ করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে ২৫ টন এক্সেল লোড ধরে সেতুগুলোর ডিজাইন করা হবে।

প্রকল্প প্রস্তাবনায় বড় মেজর সেতুর প্রতি মিটার নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ৪০ টাকা ৭১ পয়সা। মাঝারি আকারের মেজর সেতুর প্রতি মিটার নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৭ টাকা ৮৭ পয়সা। আর মাইনর সেতুর প্রতি মিটার নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ৩২ টাকা ১২ পয়সা। এছাড়া নতুন সেতু নির্মাণকালে অস্থায়ী ডাইভার্সন লাইন ও সেতু নির্মাণ করে ট্রেন চলাচল অব্যাহত রাখতে হবে। এজন্য প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৫৫ টাকা ৭০ পয়সা। পাশাপাশি অন্যান্য অস্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ এককপ্রতি ব্যয় ধরা হয়েছে ২৮ টাকা ৯৮ পয়সা।

উল্লিখিত হিসাবের ভিত্তিতে সিরাজগঞ্জ-ভেড়ামারা সেকশনের সেতুগুলো নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৭৫ কোটি ৬২ লাখ টাকা, ঈশ্বরদী-সান্তাহার সেকশনের জন্য ৮৯৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকা, সান্তাহার-চিলাহাটি সেকশনের জন্য ৫১৪ কোটি ৭৪ লাখ টাকা, আব্দুলপুর-চাঁপাইনবাবগঞ্জ-রোহানপুর বর্ডার সেকশনের জন্য ৫০৬ কোটি ৬৯ লাখ টাকা, ঈশ্বরদী-দর্শনা বর্ডার সেকশনের ৪৫৫ কোটি ৯৭ লাখ টাকা, পোড়াদহ-গোয়ালন্দ ঘাট সেকশনের জন্য ৪০০ কোটি পাঁচ লাখ টাকা, সান্তাহার-কাউনিয়া সেকশনের জন্য ৪৭৮ কোটি ৫১ লাখ টাকা এবং কাউনিয়া-বুড়িমারি সেকশনের জন্য ১০৬ কোটি চার লাখ টাকা।

রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে প্রকল্পটি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে নতুন রেলপথ নির্মাণ করতে গিয়ে যেসব সেতু পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে বা হচ্ছে, সেগুলো তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। যাচাই-বাছাইশেষে চূড়ান্ত করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর যাবে পরিকল্পনা কমিশনে। এরপর চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য যাবে একনেকে (জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি)।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..