দিনের খবর প্রথম পাতা

আয় গোপনে কর ফাঁকিতে মিউচুয়াল ফুড প্রোডাক্টস

রহমত রহমান: হরলিকস, ডানো, সেনসোডাইন প্রসিদ্ধ গ্লোবাল ব্র্যান্ড। এসব আমদানি, উৎপাদন ও বাজারজাত করে মিউচুয়াল গ্রুপের প্রতিষ্ঠান মিউচুয়াল ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে আয় গোপন করে কর পরিহারের অভিযোগ উঠেছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে দুটি খাতে প্রায় সাড়ে ৪৪ কোটি টাকা আয়ের বিপরীতে প্রায় সাড়ে ১৫ কোটি টাকার কর দেয়নি প্রতিষ্ঠানটি।

## দুইটি খাতে ২০১৯-২০ অর্থবছরে আয়ের উপর কর দেয়নি সাড়ে ১৫ কোটি টাকা

## ২০১৯-২০ অর্থবছর আয় ৪৫ কোটি টাকা হলেও দেখানো হয়েছে মাত্র ৯৭ লাখ টাকা

অনিয়মের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি এ কর পরিহার করেছে। একই সঙ্গে ওই অর্থবছর প্রতিষ্ঠানের আয় প্রায় ৪৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা হলেও আয়কর রিটার্নে দেখানো হয়েছে মাত্র ৯৭ লাখ ২০ হাজার টাকা। রাজস্ব অডিট অধিদপ্তরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে মিউচুয়াল ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেডের এমন অনিয়ম উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে রাজস্ব অডিট অধিদপ্তর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) প্রতিবেদন দিয়েছে।

এনবিআর সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশের কম্পোট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল কার্যালয়ের অধীন রাজস্ব অডিট অধিদপ্তর এনবিআরের আওতাধীন তিনটি কর অঞ্চলের অধীনে ১০টি কর সার্কেলের ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের ২০১৯-২০ করবর্ষের (২০২০ সালের ৪ অক্টোবর থেকে ৮ নভেম্বর পর্যন্ত) ওপর আয়কর নির্ধারণের সঠিকতা যাচাইয়ের ওপর অডিট ইন্সপেকশন রিপোর্ট (এআইআর) সম্পন্ন করেছে, যার মধ্যে মিউচুয়াল ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেডের অনিয়ম উঠে এসেছে। মিউচুয়াল ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেড কর অঞ্চল-৩, ঢাকার অধীন ৫৭ কর সার্কেলের (কোম্পানিজ) করদাতা প্রতিষ্ঠান।

অডিট অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়, করদাতা প্রতিষ্ঠান মিউচুয়াল ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেড ২০১৯-২০ করবর্ষে আয়কর অধ্যাদেশের ৮২ বিবি ধারায় রিটার্ন দাখিল করেছে। ওই করবর্ষে প্রতিষ্ঠানটি আয় দেখিয়েছে ৯৭ লাখ ২০ হাজার ৬২৯ টাকা। অথচ দুটি খাতে খরচ দেখানো হলেও তাতে কর কর্তন করেনি। প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্টেটমেন্ট অব প্রফিট অর লস অ্যান্ড আদার কমপ্রিহেনসিভ ইনকাম-এ ‘পারচেজ প্যাকেজিং ম্যাটেরিয়ালস’ বাবদ ৩৯ কোটি ৫ লাখ ৫৩ হাজার ৯৫৫ টাকা খরচ দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। আয়কর অধ্যাদেশ অনুযায়ী, দাবি করা এ খরচের ওপর ৭ শতাংশ হারে উৎসে কর কর্তন করতে হবে। কিন্তু খরচ দাবি করা হলেও উৎসে কর কর্তন ও সরকারি কোষাগারে জমার কোনো প্রমাণক পাওয়া যায়নি। ফলে এটি মোট আয়ের সঙ্গে যোগ হয়ে যাবে।

প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্টেটমেন্ট অব প্রফিট অর লস অ্যান্ড আদার কমপ্রিহেনসিভ ইনকাম-এ ‘ক্যারিয়েজ আউটওয়ার্ড’ বাবদ ৫ কোটি ৩৩ লাখ ৩৫ হাজার ১৩৩ টাকা খরচ দাবি করা হয়েছে। আয়কর অধ্যাদেশ অনুযায়ী, এর ওপর ৪ শতাংশ হারে উৎসে কর কর্তনযোগ্য। কিন্তু খরচ দাবি করা হলেও উৎসে কর কর্তন ও সরকারি কোষাগারে জমার কোনো প্রমাণক পাওয়া যায়নি। ফলে এই খরচ অননুমোদনযোগ্য ব্যয় হিসেবে মোট আয়ের সঙ্গে যোগ হয়ে যাবে।

প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এই দুটি খাতে মোট ৪৪ কোটি ৩৮ লাখ ৮৯ হাজার ৮৮ টাকা খরচ দাবি করা হয়েছে। কিন্তু উৎসে কর কর্তনের কোনো চালান বা প্রমাণক নিরীক্ষার সময় পাওয়া যায়নি। ফলে আইন অনুযায়ী, এই খরচ অননুমোদনযোগ্য ব্যয় হিসেবে গণ্য হবে এবং এই আয় প্রতিষ্ঠানের মোট আয়ের সঙ্গে যোগ করতে হবে। অডিট কর্তৃক নিরীক্ষায় পাওয়া প্রতিষ্ঠানের ওই অর্থবছরের এই আয়ের ওপর ৩৫ শতাংশ হারে কর ১৫ কোটি ৫৩ লাখ ৬১ হাজার ১৮১ টাকা, যা প্রতিষ্ঠানটি অনিয়মের মাধ্যমে এই আয় গোপন করে আয়কর পরিশোধ না করে ফাঁকি দিয়েছে।

অডিট অধিদপ্তরের নিরীক্ষা অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছর প্রতিষ্ঠানের আয় হয়েছে প্রায় ৪৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। কিন্তু প্রতিষ্ঠান ওই অর্থবছর আয়কর রিটার্নে আয় দেখিয়েছে প্রায় ৯৭ লাখ ২০ হাজার টাকা। বাকি প্রায় ৪৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা আয় গোপন করা হয়েছে। করদাতা কোম্পানি ৮২ বিবি ধারায় রিটার্ন দাখিল করায় অনিয়মের বিষয়টি পরীক্ষা করে পরে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে অডিট অধিদপ্তরকে জানাতে বলা হয়েছে।

অন্যদিকে, একই অর্থবছরের অপর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্টেটমেন্ট অব প্রফিট অর লস অ্যান্ড আদার কমপ্রিহেনসিভ ইনকাম-এ ‘ইন্টারটেইনমেন্ট’ বাবদ ৭ লাখ ৬ হাজার ৯৩৫ টাকা খরচ দাবি করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪ লাখ ৯২ হাজার ৫২২ টাকার ওপর কর কর্তন করা হয়নি, যা মোট আয়ের সঙ্গে যোগ হয়ে যাবে। এর ওপর প্রযোজ্য কর এক লাখ ৭২ হাজার ৩৮৩ টাকা। নিরীক্ষায় এ কর কর্তন ও সরকারি কোষাগারে জমা দেয়ার কোনো প্রমাণক পাওয়া যায়নি। প্রতিষ্ঠান এই কর পরিশোধ না করে ফাঁকি দিয়েছে।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মিউচুয়াল গ্রুপের চেয়ারম্যান আজিম উদ্দিন আহমেদের ব্যক্তিগত মোবাইল নাম্বারে বারবার ফোন ও খুদেবার্তা দেয়া হয়। তিনি জবাব দেননি। পরে ফোন রিসিভ করলেও তিনি পরিচয় গোপন করেন। ফাঁকির বিষয় উল্লেখ করে বক্তব্য চেয়ে আজিম উদ্দিন আহমেদের হোয়াটঅ্যাপে খুদেবার্তা দেয়া হয়। তিনি জবাব দেননি।

পরে বক্তব্য জানতে মিউচুয়াল গ্রুপের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) নাইম আক্তার খন্দকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি শেয়ার বিজকে বলেন, ‘এনবিআর থেকে এ ধরনের কোনো প্রতিবেদন বা চিঠি পাইনি। পেলে হোমওয়ার্ক করে আমরা বলতে পারব।’

উল্লেখ্য, মিউচুয়াল ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেড ১৯৬২ সালে ব্যবসা শুরু করে। আজিম উদ্দিন আহমেদ ছাত্র থাকা অবস্থায় বিশ্বের বহুল প্রচলিত ও পরিচিত ডানো ও হরলিকস ব্র্যান্ড বিক্রির মাধ্যমে ব্যবসা শুরু করেন। ১৯৬৪ সালে জিএসকে থেকে প্রস্তুত করা হরলিকস আমদানি শুরু করা হলেও পরে ভারত থেকে এটির আমদানি শুরু হয়। সর্বশেষ বাংলাদেশে এটির উৎপাদন শুরু হয় ২০০২ সালে। গাজীপুরের কোনাবাড়ীতে মিউচুয়াল গ্রুপের কারখানায় এটির উৎপাদন শুরু হয়।

হরলিকসের প্রধান ব্র্যান্ড ছাড়াও এর অন্য চারটি ব্র্যান্ডের পণ্য কারখানাটিতে উৎপাদন করা হয়। এগুলো হলো শিশুদের জন্য জুনিয়র হরলিকস, গর্ভবতী মায়েদের জন্য মাদার হরলিকস, চকোলেট হরলিকস ও উইমেন হরলিকস। এছাড়া অন্য পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে মালটোভা, ভাইভা ও বুসট।

আরো পড়ুন-

হরলিকসের উৎপাদন প্রক্রিয়া নিয়ে ‘ধূম্রজাল’

আদালতে হরলিকসের উপকারিতার প্রমাণ দিতে পারেনি জিএসকে

হরলিকসের ‘প্রতারণামূলক’ বিজ্ঞাপনে বিপাকে জিএসকে

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..