দিনের খবর প্রথম পাতা

আয় গোপন করে কর ফাঁকি নিউজিল্যান্ড ডেইরির

রহমত রহমান: বহুজাতিক কোম্পানি নিউজিল্যান্ড ডেইরি প্রোডাক্টস বাংলাদেশ লিমিটেড। ‘স্বাদের কাছে হারবে সবাই’Ñমনকাড়া এমন সেøাগান দিয়ে ১৯৯২ সাল থেকে বাংলাদেশে ডিপ্লোমা ফুলক্রিম মিল্ক পাউডার দুধ বাজারজাত করে আসছে বহুজাতিক ফন্টেরা লিমিটেডের এ প্রতিষ্ঠানটি।

নিউজিল্যান্ড ডেইরির বিরুদ্ধে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১১ কোটি টাকার বেশি আয় গোপনের অভিযোগ উঠেছে। এতে প্রায় চার কোটি টাকার আয়কর পরিশোধ না করে ফাঁকি দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। রাজস্ব অডিট অধিদপ্তরের ২০১৯-২০ করবর্ষের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে নিউজিল্যান্ড ডেইরি প্রোডাক্টস বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসএ মল্লিক শেয়ার বিজকে বলেন, ‘এ ধরনের প্রতিবেদনের কথা আমি শুনিনি। তিন কোটি কেন, এনবিআরের সঙ্গে আমাদের ৩ টাকারও ডিসপিউট নেই। আমরা কখনও ফাঁকি দিই না। বিষয়টি আমাদের সিইও দেখেন।’

তথ্যমতে, রাজস্ব অডিট অধিদপ্তর বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ) ঢাকা ও চট্টগ্রাম কার্যালয়ের ২০১৯-২০ করবর্ষের ওপর আয়কর নির্ধারণের সঠিকতা যাচাইয়ের ওপর কমপ্লায়েন্স অডিট (২০২০ সালের ৪ অক্টোবর থেকে ৩০ নভেম্বর) সম্পন্ন করেছে। এতে ২৭টি প্রতিষ্ঠানের (ব্যাংক, বিমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান) বিপরীতে মোট ১৫৮ কোটি ৪১ লাখ ২০ হাজার ৮৪৮ টাকার অনিয়ম উদ্ঘাটিত হয়, যার মধ্যে নিউজিল্যান্ড ডেইরি প্রোডাক্টস বাংলাদেশ লিমিটেডের অনিয়ম উঠে এসেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম পর্যালোচনা ও পরিহার করা, রাজস্ব বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া এবং সরকারি কোষাগারে জমা নিশ্চিত করতে এনবিআরকে সম্প্রতি প্রতিবেদন দেয়া হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, নিউজিল্যান্ড ডেইরি প্রোডাক্টস বাংলাদেশ লিমিটেড এনবিআরের আওতাধীন এলটিইউ, আয়করের একটি করদাতা প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানের ২০১৯-২০ অর্থবছরের হিসাব নিরীক্ষাকালে আয়কর নথি, বার্ষিক নিরীক্ষিত হিসাব বিবরণী ও অন্যান্য রেকর্ড পর্যালোচনা করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, করদাতা কোম্পানি আয়কর রিটার্নের সঙ্গে বার্ষিক প্রতিবেদন দাখিল করেছে, যাতে (বার্ষিক প্রতিবেদন নোট-২১) ‘সেলিং অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন হেড’-এ অ্যাডভার্টাইজমেন্ট (বিজ্ঞাপন) খাতে ৮ কোটি ২৮ লাখ ১৭ হাজার ৬০১ টাকা খরচ দাবি করা হয়েছে। আয়কর অধ্যাদেশ অনুযায়ী, এর ওপর ৪ শতাংশ হারে উৎসে কর প্রযোজ্য হলেও তা কর্তন করা হয়নি। ফলে দাবি করা এ খরচ আয়কর অধ্যাদেশ অনুযায়ী মোট আয়ের সঙ্গে যোগযোগ্য।

অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক প্রতিবেদনে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ এক্সপেন্স হেড-এ (নোট-২২) ২ কোটি ৮৬ লাখ ১৯ হাজার ৩৮০ টাকা ব্যয় দাবি করা হয়েছে। আয়কর অধ্যাদেশ অনুযায়ী, এ ধরনের প্রভিশনকৃত খরচ বিয়োজন অনুমোদনযোগ্য নয় বিধায় মোট আয়ের সঙ্গে তা আয়যোগ্য। দুই খাতে প্রতিষ্ঠানটি মোট ১১ কোটি ১৪ লাখ ৩৬ হাজার ৯৮১ টাকা। প্রতিষ্ঠানটি করযোগ্য এ আয় মোট আয়ের সঙ্গে যোগ করেনি। যার ওপর ৩৫ শতাংশ হারে করপোরেট কর ৩ কোটি ৯০ লাখ দুই হাজার ৯৪৩ টাকা। প্রতিষ্ঠানটি আয় গোপন করে এ আয়কর পরিশোধ না করে ফাঁকি দিয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, করদাতা কোম্পানি ২০১৯-২০ করবর্ষে ৮২ বিবি ধারায় আয়কর রিটার্ন দাখিল করেছে, যাতে আয় প্রদর্শন করেছে ৫৩ কোটি ২৯ লাখ ৯০ হাজার ৬৮৫ টাকা। আয়কর অধ্যাদেশের ২৯ ধারা অনুযায়ী ১১ কোটি ১৪ লাখ ৩৬ হাজার ৯৮১ টাকা খরচ বিয়োজন অনুমোদনযোগ্য নয় বলে মোট আয়ের সঙ্গে তা যোগ করলে মোট আয় দাঁড়ায় ৬৪ কোটি ৪৪ লাখ ২৭ হাজার ৬৬৬ টাকা, যার ওপর ৩৫ শতাংশ হারে (২০১৯-২০ করবর্ষে) ২২ কোটি ৫৫ লাখ ৪৯ হাজার ৬৮৩ টাকা।

প্রতিষ্ঠানটি ১৮ কোটি ৬৫ লাখ ৪৬ হাজার ৭৪০ টাকা আয়কর হিসাব করলেও ৩ কোটি ৯০ লাখ দুই হাজার ৯৪৩ টাকা আয়কর হিসাব করেনি। যাতে সরকারি রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। করদাতা কোম্পানি ৮২ বিবি ধারায় আয়কর রিটার্ন দাখিল করেছে বলে বিষয়টি পরীক্ষা করে পরবর্তী আইনানুগ কার্যক্রম গ্রহণ করতে নিরীক্ষা মন্তব্য এবং পরিহার করা আয়কর সরকারি কোষাগারে জমা করে প্রমাণসহ নিরীক্ষা অধিদপ্তরে পাঠাতে প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে।

এনবিআর সূত্রমতে, নিউজিল্যান্ড ডেইরির বিরুদ্ধে এর আগে রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। এলটিইউ (ভ্যাট) প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ১৩ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি উদ্ঘাটন করেছিলেন। নিউজিল্যান্ড ডেইরির বিক্রয় করা পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট প্রযোজ্য রয়েছে। এলটিইউ প্রতিষ্ঠানটির জব্দকৃত নথিপত্র যাচাই করে দেখতে পায়, ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে মোট বিক্রয় হয়েছে প্রায় ৫২৪ কোটি টাকার পণ্য। আর ভ্যাট দপ্তরে দেখানো হয়েছে, ৪৪৪ কোটি টাকার বিক্রয়। আলোচ্য সময়ে ৭৯ কোটি টাকা কম বিক্রয় দেখানোর মাধ্যমে ভ্যাট ফাঁকি দেয়া হয়েছে ১১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। আর এর পরবর্তী বছর ভ্যাট অফিসকে বিক্রয় দেখানো হয়েছে ৪৮৭ কোটি টাকা।

এদিকে এলটিইউ কর্মকর্তারা নথিপত্র পরীক্ষা করে প্রকৃত বিক্রয়ের পরিমাণ পেয়েছেন ৪৯৪ কোটি টাকার। ভ্যাট ফাঁকির পরিমাণ ১ কোটি ৯ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে ভ্যাট ফাঁকির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৩ কোটি টাকা। অপরদিকে এলটিইউ প্রতিষ্ঠানটির ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত প্রায় ৫ কোটি ৩৭ লাখ টাকা অবৈধভাবে রেয়াত নেয়ার মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি উদ্ঘাটন করেছে। এছাড়া বিভিন্ন সময় প্রতিষ্ঠানটির ভ্যাট ও ফাঁকি উদ্ঘাটন এবং আদায় করেছে এনবিআর। উল্লেখ্য, নিউজিল্যান্ড ডেইরি প্রোডাক্টস বাংলাদেশ লিমিটেডের ঝুলিতে রয়েছে ডিপ্লোমা, রেড কাউ, রেড কাউ বাটার অয়েল, ফার্মল্যান্ড, ফার্মল্যান্ড গোল্ড, শেপ আপ এবং ক্যালসি-প্রোর পুষ্টিগত পণ্যের সমাহার। ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠানটি সব ধরনের খাবারের শৃঙ্খলা রক্ষায় বিশেষ পদক্ষেপ নেয়। ব্যবসার প্রসারে ডুডল্স ইনস্ট্যান্ট নুডলস এবং ডুডল্স স্টিক নুডলস নিয়ে আসে। প্রতিষ্ঠানের ঝুলিতে এছাড়া রয়েছে ক্রাকার (ব্র্যান্ডগুলো : পর্পাস, ডিটোস ও ক্রাকার কিং)।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..