প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

আয়-ব্যয়ে ভারসাম্যহীন ফারইস্ট ইসলামী লাইফ

পলাশ শরিফ:ব্যবসায়িকভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে শীর্ষস্থানীয় শরীয়াহ্ভিত্তিক জীবন বিমা কোম্পানি ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। কোম্পানিটির প্রিমিয়াম ও বিনিয়োগ আয়ের প্রবৃদ্ধি কমছে। এর বিপরীতে বিমা দাবি পরিশোধ ও ব্যবস্থাপনায় ব্যয় বাড়ছে। এর জেরে ২০১৮ সাল শেষে কোম্পানিটির জীবন বিমা তহবিলের আকার কমেছে। সেইসঙ্গে বিরিয়োগকারীদের লভ্যাংশও কমেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেসরকারি বিমা কোম্পানি ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স বাণিজ্যিকভাবে ভালো অবস্থানে থাকলেও ব্যবস্থাপনা ব্যয় ও সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগসহ কয়েকটি ইস্যুতে বারবার প্রশ্নের মুখে পড়ছে কোম্পানিটি। ২০১৫ সালে ইসলামী জীবন বিমা কোম্পানির মোট প্রিমিয়াম আয়ের প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ দশমিক ৯৪ শতাংশ, যা ২০১৮ সাল শেষে চার দশমিক ৬১ শতাংশে নেমেছে। একইভাবে বিনিয়োগ আয় কমার প্রবণতাও বাড়ছে। ২০১৫ সালে ওই আয় কমার হার ছিল ১৪ দশমিক ৪৫ শতাংশ, যা ২০১৮ সাল শেষে ৩১ দশমিক শূন্য পাঁচ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ প্রথম সারির বিমা কোম্পানিটির মূল দুই খাতে আয় কমছে। এর প্রভাব পড়ছে কোম্পানিটির জীবন বিমা তহবিলের ওপর। ২০১৫ সালে জীবন কোম্পানিটির বিমা তহবিলের প্রবৃদ্ধি ছিল সাত দশমিক ২১ শতাংশ, যা ২০১৮ শেষে তিন দশমিক ১১ শতাংশে নেমেছে।

আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০১৫ সালে এজেন্ট কমিশন হিসেবে প্রায় ১০১ কোটি ব্যয় করেছিল ফারইস্ট ইসলামী লাইফ, যা ২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে প্রায় ১৪২ কোটি ১১ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। একইসঙ্গে ওই সময়ে বিমা দাবি পরিশোধের ব্যয় ১৮৬ শতাংশের বেশি বেড়েছে। সর্বশেষ সমাপ্ত আর্থিক বছরে দাবি পরিশোধে প্রায় ৭৫৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয় করেছে কোম্পানিটি, যা কোম্পানিটির মোট প্রিমিয়াম আয়ের ৭১ শতাংশেরও বেশি। কমিশন ও বিমা দাবির ব্যয়ের সঙ্গে ব্যবস্থাপনা ব্যয়ও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। এমনকি কোম্পানিটির বিরুদ্ধে আইনে নির্দেশিত সীমার বেশি ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের অভিযোগ উঠেছে। ২০১৮ সালে ব্যবস্থাপনা খাতে প্রায় ৩৭৬ কোটি ৯৩ লাখ টাকা ব্যয় দেখিয়েছে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ। অথচ বিমা আইন অনুযায়ী কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা ব্যয় প্রায় ৩৫৬ কোটি ৬১ লাখ টাকার মধ্যে থাকার কথা। এ হিসেবে প্রায় ২০ কোটি ৩২ লাখ টাকা বাড়তি ব্যবস্থাপনা ব্যয় দেখিয়েছে কোম্পানিটি। প্রতিযোগী অন্য শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলো ওই ব্যয় নির্দেশিত সীমার নিচে নামিয়ে আনলেও ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ব্যয়ের লাগাম টানতে ব্যর্থ হয়েছে।

আয়-ব্যয়ের ভারসাম্যহীনতায় বিপাকে পড়েছে শীর্ষস্থানীয় ইসলামী জীবন বিমা কোম্পানি ফারইস্ট ইসলামী লাইফ। এর প্রভাব পড়ছে কোম্পানিটির লাইফ ফান্ডের ওপর। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে ওই ফান্ডের আকার ৩৩৮ কোটি ৮১ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা এর আগের আর্থিক বছরের তুলনায় প্রায় ছয় কোটি টাকা কম। অথচ এর আগের চার বছরে কোম্পানিটির লাইফ ফান্ডের আকার ক্রমেই বেড়েছে। দাবি ও ব্যবস্থাপনায় ব্যয় বৃদ্ধির কারণেই ফারইস্ট ইসলামী লাইফকে পিছিয়ে পড়তে হয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে বিনিয়োগকারীদের ওপর। সর্বশেষ আর্থিক বছরে বিনিয়োগ জন্য ২০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা দিয়েছে কোম্পানিটি, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনি¤œ।

তবে পিছিয়ে পড়লেও ফারইস্ট ইসলামী লাইফের দায়িত্বশীলরা এ বিষয়ে মুখ খুলছেন না। কোম্পানিটির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হেমায়েত উল্লাহ’র সঙ্গে কয়েক দফায় যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। কথা বলার জন্য সময় দিলেও পরে ব্যস্ততা দেখিয়ে কৌশলে এড়িয়ে গেছেন। 

উল্লেখ্য, ২০১৮ সাল শেষে ফারইস্ট ইসলামী লাইফের পরিশোধিত মূলধন প্রায় ৭৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। আর জীবন বিমা তহবিল তিন হাজার ৩০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। তবে কয়েক বছরে ব্যবসায়িকভাবে ভালো অবস্থানে থাকলেও বিনিয়োগকারীদের প্রাপ্তি কমছে। ২০১৩ সালে ৪০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেওয়া কোম্পানিটি ২০১৮ সালে ২০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে। অর্থাৎ কোম্পানির আয়-ব্যবসা বাড়লেও বিনিয়োগকারীদের জন্য লভ্যাংশের হার কমেছে। কোম্পানিটির সাত কোটি ৪৭ লাখ শেয়ারের ৩২ দশমিক ৮৮ শতাংশ উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে রয়েছে। এর বাইরে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ৩৮ দশমিক ৮৬ শতাংশ, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে তিন দশমিক ৫৯ শতাংশ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ২৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। পিছিয়ে পড়ার তথ্য প্রকাশের পর ডিএসইতে দরপতনের মুখে পড়েছে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ। গতকাল কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ার সর্বশেষ ৪৯ টাকা ১০ পয়সায় লেনদেন হয়েছে।

সর্বশেষ..