প্রচ্ছদ শেষ পাতা সাক্ষাৎকার

আর্থিক খাতকে আরও শক্তিশালী করতে করপোরেট কর কমাতে হবে: আসাদ খান

প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড দেশের আর্থিক বাজারে কার্যক্রম শুরু করে ১৯৯৬ সালে। পুঁজিবাজারের নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানটি করপোরেট সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য প্রশংসিত। এরই স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৪ সালে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাতের শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান হিসেবে ‘আইসিএসবি’র প্রথম পুরস্কার অর্জন করে প্রাইম ফাইন্যান্স।

আসাদ খান প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। ২০১১ সাল থেকে তিনি এ প্রতিষ্ঠানপ্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তিনি ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার ও বিজনেস ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর করে ১৯৮০ সাল থেকে দেশের আর্থিক খাতে তার ক্যারিয়ার শুরু।

সম্প্রতি শেয়ার বিজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি আর্থিক খাতের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তানিয়া আফরোজ

শেয়ার বিজ: ব্যাংকগুলোর সঙ্গে বাজার প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হয় আপনাদের এই চ্যালেঞ্জকে কীভাবে মোকাবেলা করেন?

আসাদ খান: ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো (এনবিএফআই) যখন এ দেশে কার্যক্রম শুরু করে, তখন একমাত্র পণ্য ছিল লিজিং। ২০ বছর আগের কথা বলছি। এরপর ব্যাংকগুলোও লিজিংয়ের অনুমতি পায়। ফলে বাজারে টিকে থাকতে পণ্য বৈচিত্র্যের দরকার হয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে পাঁচ-ছয় বছরের জন্য আমরা টার্ম লোন দেওয়া শুরু করলাম। অনেক সময় ব্যাংকের সঙ্গে আমরা সিন্ডিকেশনও করেছি। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে এনবিএফআই’র মনোযোগ ধাবিত হয়েছে এসএমই ও স্বল্পমেয়াদি ঋণের দিকে। আমাদের বাধ্য হয়েই এসএমইতে যেতে হয়েছে। কারণ ব্যাংকগুলোর সঙ্গে করপোরেট ঋণ দানে পেরে ওঠা সম্ভব হচ্ছে না।

ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাতের কস্ট অব ফান্ড ব্যাংকের চেয়ে বেশি। তবে আমাদের দুটো সুবিধা রয়েছে। কমসংখ্যক  ব্রাঞ্চ ও লোকবলের মাধ্যমে আমরা ব্যবসা করতে পারি, যা ব্যাংকের পক্ষে সম্ভব নয়। ফলে একদিকে আমাদের কস্ট অব ফান্ড ব্যাংকের থেকে বেশি হলেও অন্যদিক থেকে সে খরচ পুষিয়ে নিতে পারি।

বর্তমানে ব্যাংকে আমানতের ও ঋণের সুদের হার কম। স্প্রেডও কম। এটা  ব্যাংকিং খাতে সংকট তৈরি করবে কি নাÑএ নিয়ে অনেকে শঙ্কিত। আমি মনে করি, দুই শতাংশ স্প্রেড (আমানত ও সুদের হারের ব্যবধান) থাকলেও ব্যাংকগুলোর চিন্তার কোনো কারণ নেই। বিশ্বের বেশিরভাগ উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের স্প্রেড দুই শতাংশের বেশি নয়। অর্থনীতি উন্নত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্প্রেড কমতে থাকে, এটা স্বাভাবিক। আমাদের খাতেও স্প্রেড কমে এসেছে। বর্তমানে আমাদের এসএমই ঋণে গড়ে তিন শতাংশ ও করপোরেটে দুই শতাংশ স্প্রেড থাকে।

শেয়ার বিজ: আর্থিক খাতের করপোরেট সুশাসনকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

আসাদ খান: ব্যাংক খাতের করপোরেট সুশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব রয়েছে। এ খাতে বিনিয়োগ বাড়ছে। খেলাপি ঋণও বাড়ছে। একই খেলাপি গ্রাহককে ঋণসীমা বাড়িয়ে পুনরায় ঋণ দেওয়া হচ্ছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা ব্যাংক খাতের ব্যাপারে যথেষ্ট কঠোর নয়, বরং অনেক সময়ই নমনীয়। বিআইডিএস এবং আরও দু-একটি প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় দেখা গেছে, অন্তত ৫০ শতাংশ ব্যাংকে শ্রেণিকৃত ঋণ যা দেখানো হচ্ছে, যথাযথভাবে প্রভিশনিং রাখলে অন্তত ১৪টি ব্যাংকের ইক্যুইটি প্রকাশিত তথ্য থেকে নিচে নেমে আসবে। এ চিত্র আমাদের খাতে নেই, তা বলবো না। তবে  ব্যাংকের তুলনায় কম। নিয়ন্ত্রক সংস্থা আমাদের এক চুলও ছাড় দেয় না।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা শক্তিশালী হলে, যে প্রবৃদ্ধিটা হয়, সেটাকে সঠিক প্রবৃদ্ধি বলা চলে। ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাতেও করপোরেট সুশাসনের অভাব আছে। যে কারণে এ খাতের যতটা প্রসার হওয়ার কথা ছিল, ততোটা হয়নি। তারপরও খারাপ-ভালোর মধ্য দিয়ে আমরা প্রকৃত চিত্রটা তুলে ধরেই এগোচ্ছি। প্রত্যেক বছরই এ খাতে ১০ থেকে ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। এটি প্রকৃত প্রবৃদ্ধি।

শেয়ার বিজ: প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট অনেক পুরোনো আর্থিক  প্রতিষ্ঠান কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে লোকসানের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে অবস্থার কারণ কী?

আসাদ খান: একসময় শেয়ার বাজার থেকে আমরা অনেক বেশি লাভ করেছি, এটাই এখন

 

আর্থিক খাতকে আরও শক্তিশালী করতে হলে করপোরেট কর কমাতে হবে: আসাদ খান কাল হয়ে উঠেছে। অতিরিক্ত মুনাফা করায় প্রাইম ফাইন্যান্স তাদের ব্যবসা বাড়ায়। মার্চেন্ট ব্যাংক, সিকিউরিটিজ হাউজ ইত্যাদি সম্পূরক (সাবসিডিয়ারি অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস) ইউনিট তৈরি করে। পরে এগুলো ক্ষতির মুখে পড়ে। গত সাত বছর ধরে আমরা সম্পূরক ইউনিটগুলোয় অনেক ধরনের প্রণোদনা দিয়ে আসছি। এ কারণেই গ্রুপ পর্যায়ে আমরা ক্ষতির মধ্যে রয়েছি। তবে এ ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছি।

শেয়ার বিজ: ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে কী উপায় অবলম্বন করছেন

আসাদ খান: গত চার বছর ধরে আমাদের ফোকাস এসএমই ও কৃষি ঋণে।  করপোরেট ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দান থেকে সরে এসেছি। বড় করপোরেটের সঙ্গে ব্যবসায় স্প্রেড কম থাকে, এক থেকে দেড় শতাংশের বেশি পাওয়া যায় না। কিন্তু এসএমইতে গড়ে তিন থেকে চার শতাংশ স্প্রেড থাকে। গত বছর আমরা ৪২৮ কোটি টাকার ব্যবসা করেছি। উপরন্তু এসএমইতে আমাদের শ্রেণিকৃত ঋণের হার এক শতাংশের কম। আবার কৃষি ঋণ মৌসুমভিত্তিক। গ্রাহকেরা তিন-চার মাসের মধ্যে টাকা ফেরত দেয়। ফলে নিজেদের টাকা খাটিয়েই আয় করতে পারি। এতে করে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার পরিমাণও কমিয়ে আনতে পেরেছি।

শেয়ার বিজ: বর্তমানে আপনাদের প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগের অবস্থা কী?

আসাদ খান: বিনিয়োগের অবস্থা বেশ ভালো। গত বছর আমরা প্রায় ৩০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছি। আমাদের সম্পূরক প্রতিষ্ঠানগুলোও বিনিয়োগ করছে। এক সময় আমাদের বিনিয়োগ অনেক বেশি ছিল। বাজার মন্দা যাওয়ার কারণে আমরা একটু মন্থরগতিতে এগোচ্ছি। গত চার মাসের মধ্যে ১০ কোটি টাকা নতুন করে বাজারে ঢুকিয়েছি। মনে করছি, কোনো ধরনের ম্যানুপুলেশনের ঘটনা না ঘটলে, পুঁজিবাজারে আমাদের অবস্থান ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবো।

শেয়ার বিজ: বন্ড এবং মিউচুয়াল ফান্ডের বাজার সম্পর্কে কিছু বলুন?

আসাদ খান: আমাদের দেশে বন্ড বা মিউচুয়াল ফান্ডের বাজার প্রসারিত হয়নি। অথচ বন্ড বাজার পুঁজিবাজারের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। আর সাধারণ মানুষ, পুঁজিবাজার সম্পর্কে যাদের স্বচ্ছ ধারণা নেই, মিউচুয়াল ফান্ড তাদের জন্য উপযুক্ত। বন্ড বাজারকে প্রতিষ্ঠার জন্য একটি বড় বাধা হচ্ছে কর। ব্যাংক, এনবিএফআই, ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি কোনো বন্ড ছাড়লে তাদেরও সাধারণ নিয়মেই কর দিতে হয়। কয়েক বছর আগে আমরা এনবিআরকে (জাতীয় রাজস্ব বোর্ড) অনুরোধ করেছিলাম, বন্ড বাজারে প্রথম তিন বছর কর আরোপ না করতে। কিন্তু তারা এ ব্যাপারে কোনো ইতিবাচক উদ্যোগ নেননি।

শেয়ার বিজ: ‘প্রাইস আরনিং রেশিওকত হলে নিরাপদ বিনিয়োগ মনে করা যায়?

আসাদ খান: সাধারণভাবে ‘প্রাইস আরনিং রেশিও’ ১০-এর মধ্যে থাকলে নিরাপদ বলে ধরা হয়। তবে এটা নির্দিষ্টভাবে বলা যায় না। ক্ষেত্রবিশেষে ১৮ থেকে ২০ শতাংশও হতে পারে। এমনকি ২০ থেকে ২৫ শতাংশ হলেও ঠিক থাকতে পারে। ধরুন, একটি কোম্পানির নতুন একটি ইউনিট খোলা হয়েছে। নতুন ইউনিটের জন্য মূল কোম্পানিতে বড় ধরনের আয় যোগ হলে সাময়িকভাবে পি রেশিও বাড়তে পারে। তবে কিছুদিনের মধ্যে এ রেশিও কমে আসবে।

শেয়ার বিজ: পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ ২৫ হাজার টাকার বেশি হলে  আয়কর দিতে হয় ব্যাপারে আপনার মতামত কী?

আসাদ খান: আমাদের দেশের পুঁজিবাজারের ম্যাচিউরিটিকে পর্যবেক্ষণ করা দরকার। সরকার কেন পুঁজিবাজারকে উৎসাহিত করবে? মনে রাখা দরকার, একটা দেশের জিডিপি যত বড় হতে পারে, পুঁজিবাজারের আকারও ততোটা হতে পারে। এখানে বিনিয়োগকৃত টাকার বেশিরভাগ যাচ্ছে শিল্পায়নে। পুঁজিবাজার সাধারণ মানুষের একটা ফোরাম। ডিভিডেন্ডের ওপর কর আরোপ সাধারণ মানুষকে বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করবে, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না।

শেয়ার বিজ: অর্থিক খাতের উন্নয়নে করপোরেট কর কতটা প্রতিবন্ধক বলে মনে করেন?

আসাদ খান:  বর্তমানে আর্থিক খাতের করপোরেট কর ৪২ দশমিক পাঁচ শতাংশ। এটা গ্রহণযোগ্য নয়। আর্থিক খাত হচ্ছে ‘মাদার সেক্টর’। এ খাতের প্রসার ঘটলে শিল্প খাতের প্রসার ঘটবে। এখন আমরা প্রত্যন্ত এলাকায় চলে গিয়ে এসএমইতে অর্থায়ন করছি। এটা আগে ছিল না। আর্থিক খাত মুনাফা অর্জন করছে বলেই এটা সম্ভব হচ্ছে। সুতরাং আর্থিক খাতকে আরও শক্তিশালী করতে করপোরেট কর কমাতে হবে। তাহলে সামাজিকভাবে এর ইতিবাচক প্রভাব স্থিতিশীল থাকবে।

শেয়ার বিজ: ধন্যবাদ আপনাকে

আসাদ খান: ধন্যবাদ।

 

 

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..