প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে

আমানতে ধীর প্রবৃদ্ধি

শেখ আবু তালেব: আমানত প্রবৃদ্ধির ধীরগতিতে তারল্য সংকটে ভুগছে ১৫টির অধিক ব্যাংক। অন্যদিকে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কেলেঙ্কারির খবরে ব্যাংকের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় আমানত রাখা কমিয়ে দিতে শুরু করেছে। ফলে উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহ করায় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে ক্রমাগত। জুন শেষে সমন্বিত তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় ১০ দশমিক ছয় শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা গত সাড়ে তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন তথ্য। গত ছয় মাসে এ ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে দশমিক ৫৪ শতাংশীয় পয়েন্ট। আর এক বছরে বৃদ্ধি পেয়েছে দশমিক ৪৪ শতাংশীয় পয়েন্ট। বর্তমানে কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান ১০০ টাকার তহবিল ব্যবস্থাপনায় গড়ে ১০ টাকা ৬০ পয়সা ব্যয় করছে।
একই সঙ্গে বৃদ্ধি পাচ্ছে কম সুদের বিদেশি তহবিল ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন তহবিল থেকে পাওয়া অর্থের ব্যবস্থাপনা খরচও। জুন শেষে তা দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক সাত শতাংশে। এক বছরের ব্যবধানে তা বৃদ্ধি পেয়েছে দশমিক ৩৬ শতাংশীয় পয়েন্ট।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তহবিল ব্যয় ব্যবস্থাপনা বৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব পড়বে জাতীয় অর্থনীতিতে, বিশেষ করে পুঁজিবাজারে। বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ কমে আসবে।
ব্যাংকগুলো বিভিন্ন মেয়াদে আমানত নিতে পারলেও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান তা পারে না। এছাড়া ব্যাংক বিনা সুদে আমানত সংগ্রহ করতে পারে। বিদ্যমান নিয়মে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তিন মাসের কম মেয়াদের জন্য কোনো আমানত নিতে পারে না। এছাড়া বিনা সুদের আমানতও থাকে না আর্থিক প্রতিষ্ঠানে।
ফলে গ্রাহকের কাছ থেকে সরাসরি আমানত সংগ্রহের পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যাংকের কাছ থেকে উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহ করে থাকে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। ব্যাংকের চেয়ে বেশি সুদে ঋণ বিতরণ করে। এতে প্রতিষ্ঠানের তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় ব্যাংকের চেয়ে তুলনামূলক বেশি হয় সব সময়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপ ও আমানতের সহজলভ্যতার ফলে ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে কমে আসছিল এনবিএফআইয়ের সমন্বিত তহবিল ব্যয় ব্যবস্থাপনা। ২০১৬ সালের জানুয়ারি এ হার ছিল ৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ, যা ২০১৭ সালের নভেম্বর পর্যন্ত কমতে থাকে। এক পর্যায়ে তা আট দশমিক ২১ শতাংশে নেমে যায়।
কিন্তু এরপরই ফের ঊর্ধ্বগতিতে উঠতে থাকে। সর্বশেষ গত জুন শেষে সমন্বিত তহবিল ব্যয় ব্যবস্থাপনার খরচ ১০ দশমিক ছয় শতাংশে উন্নীত হয়েছে, ছয় মাস আগে গত ডিসেম্বরে যা ছিল ১০ দশমিক শূন্য ছয় শতাংশে।
জানা গেছে, ২০১৩ সাল পর্যন্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় ডাবল ডিজিট বা ১৬ থেকে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত ছিল। পরবর্তীকালে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা ও সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনতে একটি নীতিমালা প্রকাশ করে। সে নীতিমালার আলোকে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তহবিল ব্যয়ের চিত্র প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
নীতিমালা অনুযায়ী, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব সংগৃহীত আমানত ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের পাশাপাশি কম সুদের বিদেশি তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের চিত্র আলাদাভাবে প্রকাশ করতে হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা থেকে পাওয়া অর্থসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর গড় তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় ছিল সাত দশমিক ৯৫ শতাংশ। এক বছর পর ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ২১ শতাংশ। গত জুন শেষে তা দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক সাত শতাংশে। ছয় মাসের ব্যবধানে বৃদ্ধি পেয়েছে দশমিক ৪৯ শতাংশীয় পয়েন্ট।
ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়ে একটি বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সুদের হার তুলনামূলক বেশি হওয়ায় বর্তমানে আমানতের বড় একটি অংশ সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করছেন সঞ্চয়কারীরা। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা মেনে ঋণ-আমানত (এডিআর) অনুপাত নির্ধারিত সীমায় নামিয়ে আনতে অনেক ব্যাংক সুদহার বাড়িয়ে আমানত সংগ্রহ করছে। ফলে আমানত সংগ্রহে সুদ বৃদ্ধি পেয়েছে। আবার ডলার সংকটে ভুগতে থাকা ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে ডলার কিনছে। এতেও বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে টাকা প্রবেশ করছে। এজন্য আগের রেটে আমানত সংগ্রহ করা যাচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, সার্বিক পরিস্থিতিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বেশি সুদে ঋণ বিতরণ করতে হচ্ছে। এতে তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানে। উচ্চ সুদহার অর্থনীতির জন্য ভালো নয়। যেসব প্রতিষ্ঠানের দক্ষ ব্যবস্থাপনা আছে, তারা ভালো থাকলেও সমস্যায় পড়বে কিছুটা দুর্বল অবস্থায় থাকা প্রতিষ্ঠান। তাদের জন্য সামগ্রিক খাতটি সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা যাচ্ছে সব মহলে।
তথ্য বলছে, গত বছরের জানুয়ারিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় আট দশমিক ৮৭ শতাংশে উন্নীত হয়, যা ফেব্রুয়ারিতে ৯ দশমিক ১০ শতাংশ, মার্চে ৯ দশমিক ৫৩ শতাংশ, এপ্রিলে ১০ দশমিক ১০ শতাংশ, মে মাসে ১০ দশমিক শূন্য তিন শতাংশ, জুনে ১০ দশমিক ১৬ শতাংশ, জুলাইয়ে ১০ দশমিক ২০ শতাংশ, আগস্টে ১০ দশমিক শূন্য চার শতাংশ, সেপ্টেম্বরে ১০ দশমিক শূন্য তিন শতাংশ, নভেম্বরে দশমিক শূন্য আট শতাংশ ও ২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে ১০ দশমিক শূন্য ছয় শতাংশে উন্নীত হয়। গত বছর তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় সর্বোচ্চে উঠেছিল অক্টোবরে ১০ দশমিক ৪৭ শতাংশ।
জানা গেছে, কয়েকটি ব্যাংকের আগ্রাসী ঋণ বিতরণে ব্যাংক খাতের এডিআর অনুপাত প্রচলিত ব্যাংকের জন্য ৮৫ থেকে কমিয়ে ৮৩ দশমিক ৫০ ও ইসলামি ধারার ব্যাংকের জন্য ৯০ থেকে কমিয়ে ৮৯ নির্ধারণ করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। আমানতের চেয়ে ঋণ প্রবৃদ্ধি বেশি হওয়ায় এ সিদ্ধান্ত দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এটি বাস্তবায়নে চার দফায় সময় বৃদ্ধি করে সর্বশেষ আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে ব্যাংকগুলোকে।

 

 

সর্বশেষ..