মত-বিশ্লেষণ

আর্থিক ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসার জন্য বাজেট রাখুন

আমরা প্রতি মাসে যে টাকা আয় করি, সেই টাকা ব্যয় করার একটি বাজেট থাকে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নি¤œমধ্যবিত্ত মানুষগুলো এই বিষয়ে বেশি সচেতন থাকে। কারণ আয় নির্দিষ্ট হওয়ার কারণে ব্যয় কোন কোন খাতে হবে, সেটা পূর্বনির্ধারিত থাকে। পান থেকে চুন খসার সুযোগ নেই। তবে এই আর্থিক ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসাসেবার জন্য যে একটা বাজেট রাখা উচিত, সেটা আমরা অনেকেই মনে রাখি না। মূল বিষয়ে যাওয়ার আগে একটি ঘটনা সবার কাছে তুলে ধরছি।

গত ডিসেম্বরে এক ভদ্রলোক পরিবার নিয়ে কক্সবাজার বেড়াতে গিয়েছিলেন। বাজেট ছিল এক লাখ টাকা। বছরে অফিস থেকে একটা ইনসেনটিভ পান। সেটার একটা অংশ ঘোরাঘুরির জন্য ব্যয় করেন। এটা খারাপ কিছু নয়, শরীর-মন ভালো রাখার জন্য প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু কক্সবাজার থেকে ফিরে আসার পর মেয়ের জ্বর। কভিড টেস্ট করার কথা একবার ভেবেছিলেন, কিন্তু মেয়ের সঙ্গে কথা বলে বুঝলেন, কভিড হয়নি। এই সমস্যাটি আমাদের অনেকের মধ্যেই আছে। কোনো রোগ হয়েছে কি না, নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিই। ডাক্তার, পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রভৃতি পুরোটাই অপ্রয়োজনীয় মনে করি। যাহোক, জ্বর সারানো দরকার। কিন্তু এই সময়টাতে তার মনে হয়েছে, হাতে টাকা নেই। এক লাখ টাকা খরচ করে যে মানুষ পরিবার নিয়ে কক্সবাজার ঘুরতে পেরেছেন, তার কাছে ডাক্তার দেখানোর টাকা নেই! এটা আমাদের এক ধরনের মানসিক রোগ। কী আর করা? প্রথমে বাড়ির পাশের ফার্মেসি থেকে তিনি নাপা কিনলেন এবং সর্দি-কাশির সিরাপ নিলেন। দুই দিনেও জ্বর কমে না। এবার ফার্মেসির কর্মচারীর সঙ্গে আলাপ করে অ্যান্টিবায়োটিক নিলেন। শরীর আরও খারাপের দিকে। এবার তো সেই ভদ্রলোকের মাথায় হাত। প্রায় হাজার টাকা শেষ, কিন্তু মেয়ের জ্বর ঠিক হচ্ছে না। এবার মনে হলো, ডাক্তার দেখানো দরকার। কিন্তু এবার অন্য দুশ্চিন্তা। ডাক্তারের ভিজিট গুনতে হবে। ডাক্তার তো আবার সরাসরি ওষুধ দেবে না। বেশ কিছু টেস্ট করতে দেবে। সেটারও অনেক খরচ পড়বে। মন-মেজাজ দুটোই খারাপ। নিজের হলে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতেন। কিন্তু মেয়ের জন্য ভদ্রলোকেরও মন খারাপ। তাই পরিচিত ডাক্তার খুঁজতে লাগলেন, যাতে ভিজিট একটু কম দেয়া যায়। আমাদের দেশের অনেক মানুষের এই মানসিকতা আছে। এক লাখ টাকা খরচ করে বেড়ানোর সময় আমরা ভাবছি না, কিন্তু ডাক্তারের ভিজিট ৮০০ টাকা হলে সেটা ৩০০ টাকা দেয়ার জন্য অনেক সময় আমরা ১০ জনের সঙ্গে যোগাযোগ করি। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, যে মানুষ পরিবার নিয়ে কোনো দর্শনীয় স্থান ঘোরার জন্য এক লাখ টাকা বাজেট রাখতে পারেন, তিনি কি পরিবারের চিকিৎসাসেবার জন্য ২০ হাজার টাকার একটা বার্ষিক বাজেট রাখতে পারেন না? অবশ্যই পারতেন। যদি রাখতেন, তাহলে পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে শুরুতেই ডাক্তারের কাছে যেতেন। কম ভিজিট দেয়ার বিভিন্ন উপায় খুঁজতেন না। টেস্টের ব্যয়ের জন্য দুশ্চিন্তা করতেন না। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া নিজে নিজে ওষুধ কিনতেন না।

চিকিৎসার বিষয়ে আমাদের মানসিকতায় পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। সেটা না করলে আমরা নিজেরাই আমাদের বিপদ ডেকে আনব। কারণ স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল। বাল্যশিক্ষার এই কথাটা আমরা যত ভালোভাবে জানি, ঠিক তত ভালোভাবেই অবজ্ঞা করি। শরীর যে অসুস্থ হতে পারে, সেটা সুস্থ থাকা অবস্থায় সবসময় আমাদের চিন্তার বাইরেই থাকে।

আমার এক ডাক্তার বন্ধু প্রাইভেট ক্লিনিকে রোগী দেখে থাকেন। কনসালট্যান্সি ফি নতুন রোগী ৫০০ টাকা এবং পুরনো রোগী ৩০০ টাকা। জ্বর, সর্দি, কাশি প্রভৃতি সমস্যা নিয়ে বিভিন্ন রকমের রোগীরা আসেন। এক-দেড় বছর পর হয়তো একজনের জ্বর হয়েছে। ডাক্তারের কাছে এসেছে। আসার সময় ডাক্তার বন্ধুর সামান্য পরিচিত কিংবা দূর-সম্পর্কের আত্মীয়ের কোনো ধরনের পরিচিত এমন একজনের রেফারেন্স নিয়ে চলে আসে। মূল উদ্দেশ্য ভালো সেবা পাওয়া নয়, মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ভিজিট কম দেয়া। মাঝে মাঝে এরকম রোগী এলে সমস্যা হয় না। কিন্তু দেখা যায়, দিনের মধ্যে প্রায় অর্ধেক রোগী এরকম রেফারেন্স নিয়ে তার কাছে আসে। আমার সেই ডাক্তার বন্ধু যেহেতু প্রাইভেট ক্লিনিকে প্র্যাকটিস করেন, তাই ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ বন্ধুকে বেশ কয়েকবার বলেছে, এত রেফারেন্সের রোগী এলে আমাদের তো কিছুই থাকে না। ডাক্তার বন্ধু কথাগুলো বলছিলেন আর হাসছিলেন।

মৌলিক প্রয়োজন সম্পর্কে সবাই কমবেশি জানি। চাহিদাগুলো হচ্ছেÑঅন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, চিকিৎসা ও শিক্ষা। একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে, চিকিৎসা ব্যতীত বাকি চারটি মৌলিক চাহিদা পূরণ করার জন্য আমাদের প্রতি মাসে খরচের আলাদা আলাদা বাজেট থাকে। উদাহরণ দিলে বিষয়টা আরও পরিষ্কার হবে। ধরুন, আপনি প্রতি মাসে ২৫ হাজার টাকা বেতন পান। এখান থেকে আট হাজার টাকা বাবদ বাসা ভাড়া দিচ্ছেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীর জন্য সাত হাজার টাকা, সন্তানদের শিক্ষাব্যয় এবং প্রয়োজনীয় কাপড়চোপড় বাবদ মাসে সাত হাজার টাকা খরচ করছেন। এরপর তিন হাজার টাকা যা অবশিষ্ট থাকে, সেটা সঞ্চয় করেন। কিন্তু আমরা অনেকেই চিকিৎসা নামক মৌলিক চাহিদার কথা মনে রাখি না, যে কারণে চিকিৎসাসেবার জন্য আমরা আমাদের আয়ের কোনো টাকা আলাদাভাবে বরাদ্দ রাখি না। অথচ আমরা যেকোনো সময় অসুস্থ হতে পারি, যা আগে থেকে অনুমান করা সম্পূর্ণ অসম্ভব।

চিকিৎসা ব্যয় বাবদ যে খরচ আমাদের হতে পারে, সেটা অনেকেরই বিবেচনার বাইরে থাকে। যারা সামান্য বেতনে চাকরি করেন, কিংবা আয় সীমিত বা নির্ধারিত, তাদের এই চিকিৎসা ব্যয়ের বিষয়টি সবসময় বিবেচনায় রাখা উচিত।

ভবিষ্যতে যদি কখনও পরিবারের কোনো সদস্যের অসুখ-বিসুখ ধরা পড়ে, তখন ডাক্তার, ওষুধ ও হাসপাতালের ব্যয়ের জন্য আপনাকে প্রতি মাসের সঞ্চয়ের সেই তিন হাজার টাকা থেকেই খরচ করতে হয়। অনেকেই আবার সঞ্চয়ের পুরো টাকা দিয়ে ডিপিএস করে থাকেন। অনেকের হাতে নগদ টাকা থাকে না, যে কারণে হঠাৎ করে চিকিৎসা ব্যয়ের জন্য টাকার প্রয়োজন হলে অন্যের কাছ থেকে ঋণ নিতে হয়। যেটা অনেক সময় আর্থিক অনটনের কারণ হয়।

এই সমস্যা সমাধানের জন্য আমাদের মাসিক খরচের পরিকল্পনায় একটু পরিবর্তন আনা উচিত। প্রশ্ন হতে পারে, সেটা কীভাবে? ওপরের উদাহরণ থেকে বুঝতে পারলাম, প্রতি মাসে আপনি ২২ হাজার টাকা খরচ করে থাকেন। এই খরচের সঙ্গে প্রতি মাসে অন্তত ৫০০ টাকা কিংবা ১০০০ টাকা আপনি চিকিৎসার জন্য আলাদাভাবে সংরক্ষণ করুন। এরপর বাকি টাকা আপনি সঞ্চয় করুন। প্রতি মাসে চিকিৎসা খরচ যদি আপনার নাও হয়, তবুও আপনি চিকিৎসার জন্য সংরক্ষিত টাকা অন্য কোনো খাতে খরচ করবেন না। এই টাকা চিকিৎসা খরচ হিসেবেই বিবেচনা করুন এবং আলাদাভাবে রেখে দেন। যদি টাকা খরচ না হয়, ছয় মাস পর আপনি চিকিৎসার খরচের টাকা ব্যাংকের সঞ্চয়ী হিসাবে জমা রাখতে পারেন। যখনই দরকার হবে, সেই টাকা তুলে নিয়ে চিকিৎসার খরচ বহন করবেন। আবার কিছু লাভও যোগ হলো।

যদি আপনার মাসিক আয় বেশি হয়, তাহলে চিকিৎসার জন্য সঞ্চয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি করুন। এটাকে আবশ্যক ব্যয় হিসেবে বিবেচনা করুন। ঘর ভাড়ার কথা একবার চিন্তা করুন। যত যাই ঘটুক, আমাদের আয়ের একটা অংশ বাড়িওয়ালার জন্য বরাদ্দ থাকে। এখানে কিন্তু আমাদের কাছে অন্য কোনো বিকল্প নেই। ভাড়া দিতেই হবে। চিকিৎসার খরচও ঘর ভাড়ার মতো বিবেচনা করতে হবে। হয়তো প্রতি মাসে দিতে হবে না, কিন্তু কোনো না কোনো সময় লেগেই যায়। তখন বাড়ি ভাড়ার মতোই চিকিৎসার জন্য জমানো সেই টাকা ব্যয় করলে, আয়-ব্যয়ের বাজেট ঠিক থাকে। বড় কোনো সমস্যা না হলে অন্তত ঘাটতি হবে না।

এতে ছোটখাটো চিকিৎসা ব্যয়ের জন্য বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হবে না, কারও কাছ থেকে ঋণও নিতে হবে না। চিকিৎসার খরচের জন্য কখনও মন খারাপ হবে না। কারণ আপনি আগে থেকেই প্রস্তুত থাকছেন, বাসা ভাড়া, খাবার খরচের মতো চিকিৎসা খরচেরও প্রয়োজন পড়বে। ফলে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার সময় ভিজিট কম দেয়ার জন্য কারও রেফারেন্স খুঁজতে হবে না। আর চিকিৎসাসেবার জন্য আলাদাভাবে কিছু টাকা হাতে থাকলে কিছু মানুষ নিয়মিতভাবে মেডিকেল চেকআপ করতেও উৎসাহিত হবেন। এতে অনেক সময় সম্ভাব্য বড় ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হবে।

যাদের মোটামুটি টাকা-পয়সার অভাব নেই, তাদের অনেকের মধ্যে অপব্যয় করার এক ধরনের খেয়াল থাকে। যেখানে প্রয়োজন নেই, সেখানেও টাকা খরচ করে। যে কাজ ৫০০ টাকায় হয়, অন্যকে দেখানোর জন্য সেই কাজে হয়তো দুই হাজার টাকা খরচ করবে। যদি বেশুমার টাকা-পয়সা থাকে, তাহলে ভিন্ন কথা। কিন্তু যারা অল্প টাকা আয় করেন, তাদের অপব্যয় কিংবা লোকদেখানো খরচ করা ঠিক নয়।

নিজেদের শারীরিক সুস্থতার জন্য চিকিৎসাসেবার বিকল্প নেই। এই চিকিৎসাসেবা ভালোভাবে নিশ্চিত করার জন্য প্রতি মাসের আয় থেকে সামান্য কিছু অংশ চিকিৎসা খাতের জন্য সঞ্চয় করা প্রয়োজন। আমাদের দেশের অনেকেই টাকা খরচের ভয়ে ডাক্তারের কাছে যেতে চান না। অথচ স্বাস্থ্য সচেতন হলে এবং চিকিৎসার বিষয়ে যদি আমরা অধিক সচেতন হই, তাহলে আমাদের গড় আয়ুও বৃদ্ধি পাবে। উদাহরণ হিসেবে জার্মানির কথা বলা যেতে পারে। জার্মানির মোট জনসংখ্যা আট কোটি ২০ লাখের মধ্যে এক কোটি ৭০ লাখ অর্থাৎ ২০ ভাগ প্রবীণ। জার্মানিতে প্রবীণ তাদেরই ধরা হয়, যাদের বয়স ৬৫ বছরের বেশি। এক সমীক্ষায় দেখা যায়, জার্মানিতে ৮০ বছরের ওপরে যাদের বয়স, তাদের অন্তত ৩০ শতাংশ নিজে গাড়ি ড্রাইভ করে থাকেন।

আমাদের একজনের আয়ের সঙ্গে অন্যজনের আয়ের পরিমাণ এক নয়। যার যত আয়, তার ব্যয়ের খাত তত বেশি থাকে। ব্যয়ের খাত কম থাকুক আর বেশি থাকুক, চিকিৎসাসেবা নামক মৌলিক খাতকে উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। প্রত্যেকেরই আয়ের একটি অংশ চিকিৎসাসেবার জন্য সংরক্ষণ করতে হবে। চিকিৎসার জন্য বাজেট রাখতেই হবে শুধু নিজেদের প্রয়োজনেই। কারণ সুস্বাস্থ্য না থাকলে আপনার যত প্রভাব-প্রতিপত্তিই থাকুক না কেন, সবকিছুই মূল্যহীন। আমাদের উচিত সময়ের সঠিক মূল্যায়ন করা।

কেউ হয়তো বলতে পারেন, ডাক্তারদের কনসালট্যান্সি ফি বেশি, তাই অল্প আয়ের মানুষ খুব বেশি সমস্যা না হলে ডাক্তারের কাছে যেতে চায় না। এর সঙ্গে বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক পরীক্ষার খরচের বিষয় জড়িত আছে। এখন বিষয় হচ্ছে, কোনো ডাক্তার যদি বেশি কনসালটেন্সি ফি নেন, তাহলে যে কম নেয় তার কাছে যেতে হবে। কারণ কম-বেশি নেয়া তো ডাক্তারের বিষয়। আমরা রোগীরা কোথায় যাব, সেটা আমাদের বিষয়। সুস্থ থাকা অবস্থায় খোঁজ-খবর রাখুন, কোন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গেলে তুলনামূলকভাবে কম খরচে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা যায়। এর ফলে হঠাৎ করে অসুস্থ হলে আপনি সহজে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেনÑকোথায় আপনার যাওয়া উচিত। যে বিষয়গুলো আপনার নিজের হাতে রয়েছে, সেই বিষয়ে নিজেকেই এগিয়ে যেতে হবে।

যুগ্ম পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..