মত-বিশ্লেষণ

আর্সেনিক ঝুঁকিতে নারী ও শিশু

আলম শামস : সাতক্ষীরার তালা উপজেলার শরভানু বিবি আর্সেনিক রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। শুধু শরভানু বিবি একা নয়, আর্সেনিকোসিস আক্রান্ত হয়ে গত ১৫ বছরে একই পরিবারের চারজনের মৃত্যু হয়েছে। সুপেয় খাবার পানির সংকটে আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করে আর্সেনিক ঝুঁকিতে পড়েছে সাতক্ষীরার তালা উপজেলার নারী ও শিশু। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর জানিয়েছে, ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট এলাকা পরিদর্শন করে বিষয়টির সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেছে এবং তা নিরূপণে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

মানবদেহের জন্য একটি ক্ষতিকর দূষিত পদার্থ আর্সেনিক। আর্সেনিকের (arsenic) শাব্দিক অর্থ ভঙ্গুর, ইস্পাত ধূসর, স্বচ্ছ রাসায়নিক পদার্থ, যা শঙ্খবিষ, সেঁকো বিষ বা ধাতব বিষ নামে পরিচিত। আর্সেনিকের সাদা খনিজ যৌগ এক প্রকার তীব্র বিষ। বিভিন্ন প্রকারের আর্সেনিকের মধ্যে অং(ওওও) হলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর পদার্থ। আর্সেনিক সুপেয় পানি ও খাদ্য শৃঙ্খলকে দূষিত করে। কারণ আর্সেনিক মাটি, পলি, শিলা, পাথর এমনকি কারখানার বর্জ্য পদার্থ ও কীটনাশকের সঙ্গে মিশে থাকে।

আর্সেনিক কোনো ছোঁয়াচে বা বংশগত রোগ নয়। স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে বেশি অর্থাৎ প্রতি লিটার পানিতে ০.০৫ মিলিগ্রামের চেয়ে বেশি আর্সেনিক থাকলে তা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। এর কোনো রং, গন্ধ ও স্বাদ নেই। এটি মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। আমাদের দেশের বেশিরভাগ এলাকায় টিউবওয়েলের পানিতে আর্সেনিক পাওয়া গেছে। আর্সেনিক আছে এমন টিউবওয়েলের পানি পান করলে অথবা রান্নার কাজে ব্যবহার করলে আর্সেনিকজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়।

পানিতে আর্সেনিক আছে কি না অথবা কী পরিমাণে আছে, তা খালি চোখে নির্ণয় করা যায় না। স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি পরিমাণে আর্সেনিক শরীরে গ্রহণের ফলে ধীরে ধীরে তা শরীরে জমা হয়ে মানুষের দেহে আর্সেনিকের বিষক্রিয়া সৃষ্টি করে। সাধারণত আর্সেনিকের বিষক্রিয়ার লক্ষণ ছয় মাস থেকে ২০ বছর, আবার অনেক ক্ষেত্রে এর চেয়েও বেশি পরে দেখা যেতে পারে। কত দিন পরে বিষক্রিয়া দেখা যাবে, সেটি নির্ভর করে মানুষের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর।

সাধারণত তিনভাবে মানুষের শরীরে আর্সেনিক প্রবেশ করতে পারে। বাতাসের মাধ্যমে শ্বাসনালির  ভেতর দিয়ে, পানি ও খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে এবং ত্বকের মাধ্যমে শোষিত হয়ে শরীরে প্রবেশ করতে পারে। বাংলাদেশে আর্সেনিক ঝুঁকি অনেক বেশি। সচেতনতা বৃদ্ধি করে এবং আর্সেনিকমুক্ত পানি নিশ্চিত করার মাধ্যমে আর্সেনিকজনিত নানা রোগ থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মান অনুযায়ী, প্রতি লিটার পানিতে আর্সেনিকের সহনীয় মাত্রা ০.০১ মিলিগ্রাম। বাংলাদেশ সরকার নির্ধারিত, প্রতি লিটার পানিতে আর্সেনিকের সহনীয় মাত্রা ০.০৫ মিলিগ্রাম অর্থাৎ ০.০৫ মিলিগ্রামের বেশি আর্সেনিক থাকলে সে পানি পান করা কিংবা রান্নার কাজে ব্যবহার করা যাবে না।

প্রাথমিক অবস্থায় অনেকের ধারণা ছিল বিভিন্ন সার, কীটনাশক ব্যবহার, কারখানার বর্জ্য নিষ্কাশন, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের খুঁটি, যা আর্সেনিক যৌগ দ্বারা পরিশোধিত ইত্যাদির কারণে এই সমস্যাটি হয়েছে। কিন্তু সর্বশেষ বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের একটি যৌথ গবেষক দল একটি বিকল্প তথ্য দেয়, বিভিন্ন উৎস থেকে আর্সেনিকযুক্ত পলি বদ্বীপ ও পলল সমভূমি অঞ্চলে জমা হয়। যেখানে আর্সেনিকের প্রধান বাহক হলো আয়রন অক্সিহাইড্রোক্সাইড নামের একটি মিনারেল। পরবর্তীকালে পলির সঙ্গে সঞ্চিত জৈব পদার্থ কর্তৃক অক্সিজেন আহরণের ফলে পানিবাহী শিলাস্তরে বিজারিত অবস্থার সৃষ্টি হয় এবং বিজারণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আয়রন অক্সিহাইড্রোক্সাইডের মধ্যে সংযোজিত আর্সেনিক ও আয়রন, ভূগর্ভস্থ পানিতে তরল অবস্থায় যুক্ত হয়ে ভূগর্ভস্থের পানিতে আর্সেনিক ছড়িয়ে পড়ে।

বাংলাদেশে ৬৪টি জেলার মধ্যে ৫৯টি জেলার নলকূপের পানিতে আর্সেনিক দূষণ পাওয়া গেছে এবং কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও শেরপুর এই পাঁচটি জেলায় এখনও আর্সেনিক দূষণ পাওয়া যায়নি। সাধারণত কোনো ব্যক্তির চুল, নখ ও চামড়া পরীক্ষা করলে সে আর্সেনিকে আক্রান্ত কি না তা বোঝা যায়। আর্সেনিক আক্রান্ত ব্যক্তির প্রাথমিক অবস্থায় গায়ে কালো কালো দাগ দেখা দেয় অথবা চামড়ার রং কালো হয়ে যায়; হাত ও পায়ের তালু শক্ত খসখসে হয়ে যায় এবং ছোট ছোট শক্ত গুটির মতো দেখা দিতে পারে, যা পরে কালো হয়ে যায়; গায়ের চামড়া মোটা ও খসখসে হয়ে যায়; বমি বমি ভাব কিংবা বমি হতে পারে; খাবারে অরুচি, পাতলা পায়খানা, রক্ত আমাশয়, মুখে ঘা ইত্যাদি দেখা দেয়; আবার কখনও কখন জিহ্বার ওপর কিংবা ভেতর কালো হয়ে যেতে পারে; হাত-পা ফুলে ওঠে এবং হাত ও পায়ের তালু ফেটে শক্ত গুটি ওঠে; সবশেষে কিডনি, লিভার ও ফুসফুস বড় হয়ে যায় ও টিউমার হয়। হাত ও পায়ে ঘা হয় এবং পচন ধরে। আর্সেনিকে আক্রান্ত হওয়ার ফলে চামড়া, মূত্রথলি এবং ফুসফুসে ক্যান্সার হতে পারে আবার কিডনি ও লিভার অকেজো হয়ে যেতে পারে।

এ রোগ থেকে সুস্থ থাকার জন্য আর্সেনিকমুক্ত পানি পান করতে হবে। নদী, পুকুর, বিল ইত্যাদির পানি পানের ক্ষেত্রে, ছেঁকে এবং ২০ মিনিট ফুটিয়ে বিশুদ্ধ করে পান করতে হবে। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করে পান করা যেতে পারে; আর্সেনিকে আক্রান্ত রোগীর খাবারে কোনো বিধিনিষেধ নেই। তবে শাকসবজি, ফল ও পুষ্টিকর খাবার বেশি করে খেতে হবে; আর্সেনিক রোগের প্রাথমিক উপসর্গ দেখা দিলেই দ্রুত চিকিৎসক অথবা স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে।

আর্সেনিক দূষণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য টিউবওয়েল বসানোর আগে অবশ্যই মাটির নিচের পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা পরীক্ষা করে দেখতে হবে। পুরোনো নলকূপের পানিতে আর্সেনিক মাত্রা এবং আশপাশের টিউবওয়েলের পানিতে আর্সেনিকের মাত্রাও পরীক্ষা করাতে হবে; টিউবওয়েল বসানো শেষ হলে গোড়া বাঁধানোর আগে আবার আর্সেনিক পরীক্ষা করাতে হবে; টিউবওয়েলের পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পাওয়া গেলে টিউবওয়েলের মুখ লাল রং করতে হবে, আর স্বাভাবিকের চেয়ে কম পাওয়া গেলে সবুজ রং করতে হবে; লাল রং করা টিউবওয়েলের পানি পান করা বা রান্নার কাজে ব্যবহার করা যাবে না; আর্সেনিক যুক্ত পানি ফুটিয়ে খাওয়া যাবে না। কারণ ফুটালে আর্সেনিক দূর তো হয়ই না বরং পানি শুকিয়ে তাতে আর্সেনিকের ঘনত্ব আরও বেরে যাবে; আর্সেনিক মুক্ত টিউবওয়েলের পানি প্রতি ছয় মাস পরপর পরীক্ষা করে দেখতে হবে পানি আর্সেনিক দূষণমুক্ত আছে কি না; কুয়ার পানিতে আর্সেনিক আছে কি না তা পরীক্ষা করে দেখতে হবে; বৃষ্টির পানি সংগ্রহের মাধ্যমে সম্পূর্ণ আর্সেনিকমুক্ত ও নিরাপদ পানি পাওয়া যায়। তাই বৃষ্টি পানি সংগ্রহ করে খাওয়া ও রান্নার কাজে ব্যবহার করতে হবে।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের আওতায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সারা দেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ডিজিটাল পদ্ধতিতে নলকূপের পানি পরীক্ষা করে থাকে। কোনো নলকূপের পানিতে আর্সেনিক-সংক্রান্ত কোনো সমস্যা দেখা দিলে বিনামূল্যে সরকারি সেবা নেওয়া যাবে এবং নিয়মিত নলকূপ পরীক্ষা করাতে হবে।

সরকার মানুষকে আর্সেনিক বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টিতে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। তবে এতে মৃত্যুর সংখ্যা কম এবং জনস্বাস্থ্যের ইস্যু হিসেবে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আর্সেনিকের চিকিৎসাও খুব সহজ। একজন আর্সেনিক আক্রান্ত মানুষ যদি ছয় মাস আর্সেনিকযুক্ত পানি না পান করে তাহলে তার রোগ এমনিতেই সেরে যাবে। এখন প্রয়োজন মানুষকে সচেতন করা। তাছাড়া পাঁচ বছর মেয়াদি একটি উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। এতে আর্সেনিকে আক্রান্তদের চিকিৎসা এবং সচেতনতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। নলকূপের পানি নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে এবং রোগের উপসর্গ দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।

এ ছাড়া আর্সেনিক বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে লিফলেট ও মাইকিং করতে হবে। মসজিদে জুমার খুতবার পূর্বে এ বিষয় সতর্কতামূলক আলোচনা করতে হবে। পাঠ্যপুস্তকেও এ বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা যায়। সর্বোপরি স্কুল, কলেজ, মাদরাসা শিক্ষক, সুশীল সমাজ ও জনগণের আর্সেনিক বিষয়ে গণসচেতনতার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ »

সর্বশেষ..