দিনের খবর প্রচ্ছদ শেষ পাতা

আলুর মজুত মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কব্জায়

আয়নাল হোসেন: আলুর বিশাল মজুত মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কব্জায়। এসব আলু সিøপের মাধ্যমে চড়া দামে কিনেছেন একশ্রেণির মৌসুমি ব্যবসায়ী। সরকার মূল্য বেঁধে দেওয়ায় তাদের লোকসান হবে। এ কারণে তারা কোল্ড স্টোরেজ থেকে আলু বের করছেন না। এসব আলু বীজ হিসেবে রাখা হয়েছে বলে কোল্ড স্টোরেজের মালিকরা অজুহাত দেখাচ্ছেন। স্থানীয় বাসিন্দা, কোল্ড স্টোরেজ মালিক, আড়তদার ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে এর সত্যতা পাওয়া গেছে। 

রাজধানীর কারওয়ানবাজার, শ্যামবাজার ও দেশের বিভিন্ন জেলায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মুন্সীগঞ্জ, ফরিদপুর, পাবনা, বগুড়া, সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন জেলায় প্রতি বছরই একশ্রেণির মৌসুমি ব্যবসায়ী আলু, পেঁয়াজ ও রসুনসহ বিভিন্ন পণ্য মজুত রাখেন, পরে তাদের সুবিধামতো দামে বাজারে ছাড়েন। মাঝেমধ্যেই তারা লোকসান করলেও এ বছর করোনাকালে তাদের ভাগ্য খুলে গেছে।

সম্প্রতি বাজারে সব ধরনের নিত্যপণ্যের দামই ঊর্ধ্বমুখী। এবার মৌসুমি ব্যবসায়ীদের পোয়াবারো। সরকার আলুর দাম বেঁধে দিলেও কাক্সিক্ষত দাম না পাওয়ায় তারা আলু বাজারে ছাড়া বন্ধ রেখেছেন। সরবরাহ সংকটে বাজারে চড়া দামেই তা বিক্রি হচ্ছে। গতকাল কারওয়ানবাজার ও শ্যামবাজারে প্রতিকেজি আলু ৪১ থেকে ৪২ টাকায় বিক্রি হয়েছে, যা গত মঙ্গলবার বিক্রি হয় ৪২ থেকে ৪৩ টাকায়।

একাধিক আড়তদার ও কোল্ড স্টোরেজের মালিক জানান, এ বছর উৎপাদন মৌসুমের শুরুতেই আলুর দাম ভালো ছিল। অনেকেই আলু বিক্রি করেছেন। বিগত কয়েক বছর লোকসান দেওয়ায় আলুর আবাদও এ বছর কম ছিল। এছাড়া চলতি বছর দেশে করোনাভাইরাসের আক্রমণ শুরু হওয়ায় দেশব্যাপী সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। আর এতে সারা দেশই এক ধরনের লকডাউনে চলে যায়। এতে নি¤œ ও মধ্য আয়ের মানুষেরা খাদ্য সংকটে পড়েন। তখন সরকার ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ দেশব্যাপী ত্রাণ কার্যক্রম শুরু করে। চাল, ডাল ও তেলের সঙ্গে আলুও ত্রাণ হিসেবে দেওয়া হয়। এতে বিপুল পরিমাণ আলু বিক্রি হয়ে গেছে। এছাড়া এ বছর দেশের ২৭টি জেলায় কয়েক দফা বন্যা হওয়ায় আগাম সবজি উৎপাদন ব্যাহত হয়। এতে বাজারে সবজির সরবরাহ কমে যাওয়ায় আলুর ওপর চাপ পড়ে।   

রাজধানীর কারওয়ানবাজারের পাইকারি আলু ব্যবসায়ী মেসার্স মক্কা ট্রেডার্সের দুলাল আহমেদ জানান, মুন্সীগঞ্জ এলাকার একটি সাধারণ ব্যাপার হচ্ছে মৌসুমি পণ্যের ব্যবসা। প্রতি বছরই এসব ব্যবসায়ী কোল্ড স্টোরেজে সিøপের মাধ্যমে আলু কিনে মজুত রাখেন। একজন ৫০০ থেকে হাজার বস্তা কিনে রাখেন। যাদের ব্যাংকে ২০ লাখ টাকা রয়েছে, তারা ১০ লাখ টাকার আলু কিনে

রেখেছেন। এ ধরনের ব্যবসায়ীর সংখ্যা অনেক রয়েছে মুন্সীগঞ্জে বলে জানান ওই আড়তদার। 

এ বাজারের আরেক ব্যবসায়ী মুসলেম উদ্দিন জানান, কোল্ড স্টোরেজ থেকে চাহিদা অনুযায়ী আলুর সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চড়া দামে আলু কিনে রেখেছেন। এখন সরকার দাম বেঁধে দেওয়ায় তারা বিপাকে পড়েছেন। তবে আলুর দাম কিছুটা কমতে আরও দুই থেকে তিন দিন সময় লাগবে। কোল্ড স্টোরেজ থেকে বের করার পর তা বাতাসে শুকাতে হয়। এরপর ট্রাকে তোলার পর বাজারে আসতে কমপক্ষে তিন দিন সময় লাগে।

রাজধানীর শ্যামবাজারের একাধিক ব্যবসায়ী জানান, আলু প্রতি বছরই একশ্রেণির মৌসুমি ব্যবসায়ী কোল্ড স্টোরেজে মজুত রাখেন। সময় ও সুযোগ অনুযায়ী তারা এসব আলু বাজারে ছাড়েন। তবে বিগত ২০১১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত অনেকেই আলু মজুত রেখে লোকসান গোনেন। এ বছর যারা আলু মজুত রেখেছেন, তারা মোটামুটি ভালো দামই পেয়েছেন। তবে অনেকেই চড়া দামে আলু কিনে রেখেছেন। সরকারের বেঁধে দেওয়া দামে আলু বিক্রি করা হলে তাদের লোকসান হবে। এ কারণে তারা আলু বাজারে ছাড়া বন্ধ রেখেছেন।    

আমাদের মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি শেখ মোহাম্মদ রতন জানান, মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার পশ্চিম মুক্তারপুর এলাকার দুই ভাই আতাউর ও মতিউর মৌসুমি আলু ব্যবসায়ী, তারা উপজেলার দেওয়ান কোল্ড স্টোরেজে আলু মজুত রেখেছেন। এছাড়া একই এলাকার নওশের ও ইউনুছ মৌসুমি আলু ব্যবসায়ী। তাদের মজুতকৃত আলু রয়েছে রিভারভিউ কোল্ড স্টোরেজে। তবে সদর উপজেলার কৃষক সুরুজ তালুকদার ও চুন্নু শেখের কাছে বিপুর পরিমাণ আলু মজুত রয়েছে।

পাবনার সুজানগরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই এলাকার বেষশ কয়েকজন কাঁচামালের ব্যবসায়ী বিপুল পরিমাণ আলু কিনে কোল্ড স্টোরেজে মজুত রেখেছেন। তাদের অনেকেই সম্প্রতি বিক্রি করে দিয়েছেন। এসব ব্যবসায়ীরা প্রতি বছরই আলু, পেঁয়াজ, রসুনসহ বিভিন্ন পণ্য মজুত রাখেন। এসব ব্যবসায়ী হচ্ছেন লিটন, মুকসেদ আলী, আমিরুল ইসলাম, লালন ও লিটন-২। সম্প্রতি সরকার কোল্ড স্টোরেজে নজরদারি দেওয়ায় তাদের মধ্যে কেউ কেউ আলু বিক্রি করে দিয়েছেন। 

বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক ও এফবিসিসিআইয়ের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট মোস্তফা আজাদ চৌধুরী শেয়ার বিজকে বলেন, এ বছর অনেকেই সিøপের মাধ্যমে আলু কিনে কোল্ড স্টোরেজে রেখেছেন। তারা প্রতিকেজি আলু ৪০-৪২ টাকায় কিনেছেন। সরকার কোল্ড স্টোরেজ পর্যায়ে প্রথমে দাম নির্ধারণ করে ২৩ টাকা। পরে হয়তো বাড়িয়ে ২৭ টাকা করা হয়। কিন্তু এতেও তাদের লোকসান দিয়ে বিক্রি করতে হবে। তবে কেজিপ্রতি চার টাকা বাড়ানোটা ইতিবাচক বলে তিনি মনে করছেন।

এ বছর অন্যান্য পণ্যের মতো আলুর কেজি অর্ধশত টাকায় ওঠে। এতে নি¤œ ও মধ্য আয়ের মানুষের জীবন কঠিন হয়ে পড়ে। সরকার আলুর দাম সাধারণ মানুষের নিয়ন্ত্রণে রাখতে গত ৭ অক্টোবর প্রথম দফায় দাম বেঁধে দেয়। কিন্তু সরকার-নির্ধারিত দামে কোথাও আলু বিক্রি না হওয়ায় গত মঙ্গলবার আলু ব্যবসায়ী, চাষি ও কোল্ড স্টোরেজের মালিকসহ স্বার্থসংশ্লিষ্টদের নিয়ে বৈঠক করা হয়। বৈঠকে কোল্ড স্টোরেজ পর্যায়ে প্রতিকেজি আলু ২৭ টাকা, পাইকারিতে ৩০ টাকা এবং খুচরা পর্যায়ে ৩৫ টাকা দাম নির্ধারণ করা হয়, যদিও নির্ধারিত মূল্যে আলু বিক্রি হয়নি।

রাষ্ট্রায়ত্ত বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের হিসাব অনুযায়ী, গতকাল রাজধানীতে খুচরা পর্যায়ে প্রতিকেজি আলু ৪২-৪৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে, যা এক সপ্তাহ আগে ছিল ৫৪৫-৫০ টাকা, আর এক মাস আগে ছিল ৩৪-৪০ টাকা। এই আলু গত বছর এ সময়ে বিক্রি হয়েছে ২০-২৫ টাকায়। এক বছরের ব্যবধানে কেজিপ্রতি দাম বেড়েছে ৯৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..