মত-বিশ্লেষণ

আসুন বঞ্চিত ও অসহায়দের পাশে দাঁড়াই

সিনথিয়া সুমি: শত কষ্ট ও দুঃখের মাঝে শুধু সন্তানদের জন্য দু’বেলা আহার জোগাড়ের উদ্দেশ্যে কখনও অন্যের গৃহকর্ম, আবার কখনও অন্য পেশায় ছদ্মবেশ ধারণ, যেমনÑভিক্ষা, চৌর্যবৃত্তি প্রভৃতিসহ সমাজের সবচেয়ে নিন্দনীয় ও নিকৃষ্ট কাজ করতেও অনেকে দ্বিধা করে না। এমন চিত্র দেখার জন্য খুব বেশি দূরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। নাবালক সন্তানদের নিয়ে কষ্টে কাটানো প্রচুর মানুষ এই সমাজে বাস করে। তাদের মধ্যে কেউ স্টেশনে কেউবা ফুটপাতে জীবনযাপন করে। আর এই কনকনে শীতে তারা কত কষ্টের মধ্য যে আছে।

অনেক গরিব ও অশিক্ষিত মা-বাবা সবকিছু খুইয়ে একমাত্র সন্তানকে মানুষ করেছে। বৃদ্ধ বয়সে মা-বাবা দুর্বল, অসুস্থ ও অক্ষম হওয়ায় সন্তানের আয়ের ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল হয়, কিন্তু ততদিনে বিদ্বান সন্তান ওপরতলার মানুষে পরিণত হয়। এ অবস্থায় সন্তান মা-বাবাকে না পারে ফেলতে, না পারে পুরোপুরিভাবে মেনে নিতে। সামান্য বিষয় নিয়ে মনোমালিন্য ও ঝগড়া-ফ্যাসাদ প্রভৃতি অশান্তি সংসারে লেগে থাকে। শেষে বৃদ্ধ মা-বাবা সন্তানের সংসারে অতিরিক্ত ঝামেলা হিসেবে বিবেচিত হয় এবং তারা (মা-বাবা) বঞ্চনা, গঞ্জনা ও অশান্তি সইতে না পেরে অবশেষে স্বেচ্ছায় সন্তানের গৃহত্যাগ করে ভিক্ষাবৃত্তি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। 

‘টাকা না দিলে পা ছাড়ব না।’ ১০-১২ বছরের মেয়ে ও মাঝবয়সি মহিলা পথচারী যুবকের পা শক্তহাতে ধরে ভিক্ষা চাচ্ছে। দাড়ি-গোঁফে ভরা মাথায় উষ্কখুষ্ক চুলওয়ালা পুরুষটিও মাথা নিচু করে চুপ করে বসে। পুরুষ-মহিলা উভয়ের গায়ে ময়লা ও ছেঁড়া কাপড় এবং তাদের শরীর দুর্বল, ক্ষীণ ও রোগা। বুঝতে অসুবিধা হয় না, তারাই ওই মেয়ে ভিক্ষুকের মা ও বাবা। ট্রেনে-বাসে এতিমখানা, মাদরাসা ও মসজিদের উন্নয়নের কথা বলে যাত্রীদের কাছে মুক্তহস্তে সাহায্য (ভিক্ষা) চাওয়ার ঘটনাও নতুন কিছু নয়। 

আমরা জানি, দেশের বেশিরভাগ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান অন্যদের দেয়া সাহায্য-সহযোগিতায় গড়ে ওঠে এবং চালিত হয়। অন্যদিকে নিঃস্ব-গরিব বৃদ্ধ ও দুর্বল ব্যক্তিদের এ কাজ (ভিক্ষা) করলেও মানায়। কিন্তু কেন সুস্থ-সবল দেহের অধিকারী যুবক জীবনধারণের জন্য ধর্মকে পুঁজি করে ভিক্ষা পেশা বেছে নেবে? হিজড়া, যুবক ও ধর্মের নামে ভিক্ষাপেশায় নিয়োজিত মানুষকে যথাযথভাবে শিক্ষা (স্বশিক্ষা, গুরুর দীক্ষা ও প্রতিষ্ঠানিক) এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণদানের মাধ্যমে অন্যান্য সবল, সুস্থ ও দক্ষ মানুষের মতো জাতীয় উন্নয়নে শরিক করা ছাড়াও আত্মনির্ভরশীল হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। 

গরিব নি¤œবিত্ত মানুষের শ্রমে-ঘামে বিত্তবানরা যে সম্পদ উপার্জন করেছেন, তাদের উচিত শ্রমজীবী মানুষের খাদ্যসংকট দূর করা এবং ভোগবিলাসিতা ও অপচয়ের টাকাগুলো দিয়ে অসহায় শ্রমজীবী মানুষের প্রতি সাহায্যের হাত প্রসারিত করা। বর্তমান প্রেক্ষাপটে দিনমজুর মানুষের পক্ষে তার পরিবারের জন্য দুই থেকে তিন বেলা আহার জোগান দেয়া তো দূরের কথা, এক বেলাও দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বিত্তবানরা যদি দারিদ্র্য সমস্যার প্রতিকারে এগিয়ে না আসেন, তাহলে আর কারা আসবে?

সমাজ ও দেশের ধনাঢ্য, জ্ঞানী-গুণী, শিক্ষিত, বিদ্বান ও বুদ্ধিজীবী এবং প্রশাসনিক ও রাজনৈতিকভাবে অসীম ক্ষমতাধর মানুষের প্রতি উদাত্ত আহ্বানÑযেসব মানুষ চরমভাবে বঞ্চিত, বিপথগামী ও জনমদুঃখী হিসেবে পরিচিত, তাদের পাশে দাঁড়ান। নয়তো কঠিন শোষণ, চরম বঞ্চনা ও গঞ্জনায় কেবলই ধুঁকে ধুঁকে অকাল মৃত্যুর জন্য প্রহর গোনা ছাড়া এসব দুঃখী, বঞ্চিত, নিঃস্ব ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীর কোনো পথ নেই। অসহায় ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের প্রতি দানের হাত বাড়িয়ে দেয়া রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নত ও মানবিক কর্তব্য। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে উত্তম নেক আমল এটিই। বর্তমান দুর্যোগ ও মহামারিতে গরিবদের সাহায্যার্থে বিত্তবানদের এগিয়ে আসা উচিত।

শিক্ষার্থী

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..