মত-বিশ্লেষণ

আস্থাহীন কৃষকের স্বস্তি ফেরাতে হবে

আকিজ মাহমুদ: বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন এক প্রবন্ধে কৃষক সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘নিজ অন্ন পর কর পণ্যে দিলে, পরিবর্তে ধনে দুঃখে নিলে।’ প্রায় ১০০ বছর পেরিয়ে গেলেও কৃষকের অবস্থার কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। কৃষকের উৎপাদিত শস্যে দেশের খাদ্যের অভাব পূরণ হয়, তথাপি কৃষকের জীবন কাটে অনাহারে, অনাদরে ও অখ্যাতিতে। যুগে যুগে হাজার হাজার শাসকের পরিবর্তন হলেও কৃষকের রূপ বদলায়নি। সভ্যতার সবচেয়ে আদি ও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর পেশা বরাবরই পেয়ে এসেছে শোষণের তিক্ত স্বাদ, নির্যাতন ও বঞ্চনা।

দেশের চালচিত্রে কৃষি ক্রমেই শিল্প খাতের কাছে প্রচ্ছন্ন হলেও কৃষির গুরুত্ব কখনও কমবে না। সভ্যতার উষালগ্ন থেকে কৃষিই ছিল মানুষের প্রথম এবং জীবিকা নির্বাহের প্রধান অবলম্বন। ‘আজকের পৃথিবী কৃষি ও কৃষকের দীর্ঘ সংগ্রামের ফসল’ কথাটি যথার্থ সমীচীন বলে মনে করি। দেশের মোট জিডিপির (২০১৯-২০ অর্থবছর) ১৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ আসে কৃষি খাত থেকে। কিন্তু দেশে কৃষি দিন দিন অলাভজনক পেশা হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় প্রতিনিয়ত বাড়ছে কৃষকের বঞ্চনা-অবহেলা, তারা পাচ্ছে না ন্যায্য পাওনা। বেসরকারি একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশের ৮৪ শতাংশ কৃষক তাদের মূলধন সংকটে আছে।

গ্রামে থাকায় কৃষকের অনেক সমস্যা সম্পর্কে কমবেশি জানি। এক কৃষকের আক্ষেপের কথা এখানে প্রণিধানযোগ্য। কৃষকের ভাষ্য, ‘সরকার শুধু চাকরিওয়ালাদের বেতন বাড়ায়, আমাগোর জন্য কোনো কিছু করে না। ফসলের যে দাম, তা দিয়া আমাগোর সারের দামও ওঠে না।’ অর্থাৎ কৃষকটি তার কথায় মূলধনের লোকসানের কথাই উচ্চারণ করেছেন। কৃষি ও কৃষকের অবস্থা পশ্চাতে কেমন ছিল এ সম্বন্ধে তর্কহীনভাবেই বলা যায়, এদেশে কৃষকের অবস্থা কখনোই ভালো ছিল না। অথচ দেশের ৭০ শতাংশ লোক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুসারে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে শ্রমশক্তির ক্ষেত্রে কৃষির অবদান ৪০ দশমিক ছয় শতাংশ। বাংলাদেশের বিপুল শ্রমশক্তির আয়-রোজগারের পথ এই কৃষি। প্রযুক্তি আর বিজ্ঞানের নানা উদ্ভাবনের ছোঁয়ায় কৃষিতে উৎপাদন যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে উৎপাদন খরচও। কিন্তু সমস্যা ওই এক জায়গায় কৃষি পণ্যের ন্যায্য মূল্য কৃষকের হাত অবধি পৌঁছে না।

গ্রামীণ এই কৃষকদের দুর্দশাগ্রস্ত জীবন আমাদের নানা ধরনের সংকটের অশনিসংকেত দেয় বৈকি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো থেকে প্রকাশিত ‘মনিটরিং দ্য সিচুয়েশন অব ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস অব বাংলাদেশ’ (এমএসভিএসবি) প্রকল্পের স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস জরিপে দেখা যায়, ২০১৪ সালে গ্রামের মানুষের মধ্যে প্রতি হাজারে শহরে আসার হার ছিল ২৮ দশমিক ২, ২০১৮ সালে যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ দশমিক ছয়। গ্রাম থেকে শহরান্তর ঘটানো এসব মানুষের পেশা স্বভাবতই কৃষি। কেননা দেশের এক গবেষণায় দেখা যায়, দেশের ৬৫ দশমিক ৪৮ শতাংশ কৃষক নানা সময় অন্য পেশায় চলে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। কৃষক পরিবারগুলোর মধ্যে ৮৩ দশমিক ১৫ শতাংশ বলেছে, তাদের খামারের আয় তাদের পারিবারিক চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট নয়।

কৃষিকাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে কৃষকদের শহরমুখী হওয়া দেশের জন্য মোটেই মঙ্গলজনক নয়। কেননা কৃষি যেমন অত্যাবশকীয় একটি পেশা, তেমনি শিল্প খাতও অনেকটা কৃষির ওপরেই পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। শিল্পবিপ্লবের এই পর্যায়ে এসে কৃষিকে অস্বীকার করা আমাদের জন্য হবে নির্ঘাত আত্মঘাতী হওয়ার শামিল। দেশের অধিকাংশ এই শহরমুখী কৃষকদের গন্তব্য মূলত দেশের বড় শহরগুলো। এমনিতেই নানা সমস্যায় জর্জরিত অপরিকল্পিত শহরগুলোর অবস্থা এখন কাহিল; তার ওপরে বাড়তি জনসংখ্যা সামাল দিতে গিয়ে কর্তৃপক্ষ দিচ্ছে ব্যর্থতার পরিচয়। সেখানে ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে আসা এসব মানুষের জন্য শহরগুলোর পরিস্থিতি দিন দিন আরও দুর্বিষহ হয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতির দরুন শহরমুখী এসব ছিন্নমূল মানুষের অপকর্মে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতার প্রমাণ অতি সম্প্রতি অহরহ পাওয়া যাচ্ছে, যা শহরের আইন-শৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হলেও আমাদের কৃষিকে পুরোপুরি ঢেলে সাজাতে হবে। কৃষকের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করা গেলে কৃষির কদর অনেকটাই বেড়ে যাবে। দেশে কৃষি বাজারকে একটি বৃহৎ চক্র নিজেদের মতো করে গড়ে তুলেছে, যাদের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে অসাধু ব্যবসায়ীদের অসংখ্য সিন্ডিকেট। এসব কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ী ও পাইকারদের দৌরাত্ম্যে কৃষি বাজার অর্থনীতি কৃষকের হাতে আর নেই। ফলে কৃষিপণ্যের দাম মাঝেমধ্যেই আকাশচুম্বী হলেও কৃষকের পকেটে বাড়তি পাওনা যোগ হয় না। তাই কৃষিকে এসব সিন্ডিকেটের হাত থেকে বাঁচাতে হবে। কৃষিকে কৃষকের হাতে ফিরিয়ে দেয়া এবং দেশের প্রচলিত আইন প্রয়োগের মাধ্যমে এসব সিন্ডিকেটের পতন ঘটানোর এখনই মোক্ষম সময়। সরকারের নির্ধারিত কৃষিপণ্যের মূল্য তালিকা অনুযায়ী কৃষকরা যাতে পণ্য বিক্রি করতে পারে, সেজন্য বাজারগুলোয় সরকারি নজরদারি বাড়াতে হবে। পাশাপাশি গ্রামীণ ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোগত উন্নয়নে সরকার ঘোষিত ডেল্টা প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।

বিশেষজ্ঞতের মতে, যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গে কৃষি অর্থনীতি অনেকটাই সম্পর্কযুক্ত। তাই দেশের প্রান্তিক অঞ্চলের বেহাল রাস্তাগুলোর সংস্করণে মনোযোগ দিতে হবে। দেশীয় উৎপাদিত কৃষিপণ্যের মূল্যায়ন করতে হবে। বাইরের দেশগুলোয় কৃষিপণ্যের বাজার বৃদ্ধিতে নতুন বাজার সৃষ্টি করতে হবে। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কৃষিপ্রযুক্তির সঙ্গে গ্রামীণ কৃষকদের পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। এতে করে কৃষিকর্মের গতিকে আরও ত্বরান্বিত করা সম্ভব হবে। একইসঙ্গে কৃষি ও শিল্প খাতের সমন্বয় ঘটানো গেলে কৃষি খাত থেকে দেশের পক্ষে অনেক মুনাফা অর্জন করা সম্ভব। কৃষকের জীবনমানের উন্নয়নে কৃষিভাতা চালু, কৃষি উৎপাদন-সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির মূল্য হ্রাস করা এবং কৃষকদের জন্য স্বল্প সুদের আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

ভারতে অনেক কৃষক আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় মূলত কৃষিতে তাদের চরম জরাজীর্ণ ও দুর্দশাগ্রস্ত জীবনের জন্য। বাংলাদেশেও কৃষকদের আত্মহত্যার কথা মাঝেমধ্যেই শোনা যায়। কৃষক ঋণগ্রস্ত অসহায় জীবন থেকে মুক্তি পেতেই নিজেকে হত্যার মতো নির্মম পথ বেছে নেয়। তাই সময় এসেছে কৃষিকে অর্থনৈতিকভাবে একটা সমৃদ্ধিশালী পেশা হিসেবে মানুষের মধ্যে নবপরিচয় ঘটানোর। ২০৪১ সালের মধ্যে দেশকে উন্নত দেশের কাতারে পৌঁছাতে হলে কৃষির পাশাপাশি কৃষকের চলমান দুর্দশাগ্রস্ত জীবনের পরিবর্তন ঘটাতে হবে অবশ্যই।

শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ ➧

সর্বশেষ..