প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

আস্থা সংকট চরমে ব্যাকরণ মানছে না পুঁজিবাজার

মুস্তাফিজুর রহমান নাহিদ:পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি এবং মিউচুয়াল ফান্ডের শেয়ার ও ইউনিটের গড় মূল্য আয় অনুপাত (পিই-রেশিও) বর্তমানে ১৩’র নিচে অবস্থান করছে। ফান্ড ও কোম্পানির মধ্যে ৭৮ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দর নেমে গেছে অভিহিত দর বা ১০ টাকার নিচে। ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ প্রায় সব ধরনের প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর রয়েছে ক্রয়যোগ্য অবস্থায়।

নিয়ম অনুযায়ী, এ অবস্থায় পুঁজিবাজার স্থিতিশীল থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে এর উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। বাজার মানছে না কোনো ধরনের ব্যাকরণ। যে কারণে আস্থা সংকট চরমে পৌঁছেছে বিনিয়োগকারীদের।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, পতনের জেরে চলতি বছরে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক কমেছে ৬১৫ পয়েন্ট। এ সময়ে উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে বাজার মূলধন। ২০১৮ সালের শেষ কার্যদিবসে ডিএসইর তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার ও ইউনিটের বাজার মূলধন ছিল তিন লাখ ৮৭ হাজার কোটি টাকা। সর্বশেষ গতকাল বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে তিন লাখ ৫৯ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ পতনের কবলে পড়ে বাজার মূলধন কমে গেছে ২৮ হাজার কোটি টাকারও বেশি।

বিষয়টি নিয়ে আলাপ করলে পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা বলেন, দীর্ঘমেয়াদি পতন থাকায় পুঁজিবাজার নিয়ে নেতিবাচক ধারণার জš§ হচ্ছে। যে কারণে বাজারের প্রতি ক্রমেই আস্থা হারাচ্ছেন ভুক্তভোগীরা। এজন্য তারা বিনিয়োগকারীদের অধৈর্য সিদ্ধান্তকে দায়ী করছেন। তাদের অভিমত, বিনিয়োগকারীরা ধৈর্য না ধরে ভীত হয়ে পোর্টফোলিওতে থাকা শেয়ার কম দরে বা লোকসানে বিক্রি করে দেন। ফলে পতন আরও ঘনীভূত হয়।

জানতে চাইলে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি শাকিল রিজভী বলেন, বিনিয়োগকারীদের উচিত যে কোনো পরিস্থিতির মোকাবিলা করা। কিন্তু এটা না করে তারা অল্পতেই ভীত হয়ে পড়েন। লোকসানে হলেও শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে বের হতে চান তারা। যার প্রভাবে সেল প্রেশার বাড়ে। ফলে বাজারও নি¤œমুখী হয়।

এদিকে শুধু বিনিয়োগকারীদের মনোগত কারণে পুঁজিবাজারের পরিস্থিতি এ যুক্তি মানতে নারাজ বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও ডিএসইর একটি পক্ষ। তাদের অভিমত, নীতিনির্ধারকদের ভুলের কারণে বাজারে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএসইর একজন পরিচালক বলেন, বাজারের এমন পরিস্থিতির জন্য দায়ী দুর্বল কোম্পানির তালিকাভুক্তি। গত কয়েক বছরে যেসব কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়েছে, তার মধ্যে বেশিরভাগই দুর্বল। এসব কোম্পানি বাজারে আসার মূল উদ্দেশ্য ছিল অর্থ সংগ্রহ করা। অনুমোদন দেওয়ার আগে এসব কোম্পানির বিষয়ে আরও খোঁজ-খবর নেওয়া উচিত ছিল।

তিনি বলেন, পুঁজিবাজারে এখনও সুশাসনের অভাব রয়েছে। তালিকাভুক্ত কিংবা বাজারে আসতে ইচ্ছুক কোম্পানিগুলো এখনও ভুয়া আর্থিক প্রতিবেদন দিচ্ছে। পুঁজিবাজারে কোনো কারসাজির ঘটনা ঘটলে তাকে জরিমানা করেই দায়িত্ব শেষ করা হচ্ছে। মূলত এসব কারণেই পুঁজিবাজার স্বরূপে ফিরতে পারছে না।

এদিকে পুঁজিবাজারের এমন অস্বাভাবিক উত্থান-পতনের পেছনে কারসাজির ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ করেন বিনিয়োগকারীরা। গতকাল বাজার নি¤œমুখী হলে ডিএসইর সামনে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করার সময় তারা এমন অভিযোগ করেন। তারা বলেন, সম্প্রতি বিএসইসি চেয়ারম্যানের পদত্যাগের গুজব রটিয়ে একদিনে সূচক ১১০ পয়েন্ট বাড়ানো হয়। পরদিন আবার সূচক ৪০ পয়েন্ট হ্রাস পায়। এটা কোনো স্বাভাবিক পুঁজিবাজারের লক্ষণ নয়। একটি চক্র কৃত্রিমভাবে এটা করছে।

প্রসঙ্গত, পুঁজিবাজারের বর্তমান পরিস্থিতির সূচনা হয় ২০১০ সাল থেকে। সে সময়ের ধসের পর আর দীর্ঘমেয়াদি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি বাজার। এ পরিস্থিতি পাল্টানোর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে নানা প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়। ঢেলে সাজানো হয় পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি।

এছাড়া প্রণোদনা হিসেবে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ফোর্স সেল বন্ধ রাখা হয়। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের জন্য আইপিও কোটার ব্যবস্থা করা হয়। আনা হয় বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে সংশোধন। বিনিয়োগকারীরা যাতে আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারেন, সে জন্য ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) পক্ষ থেকে স্বল্পসুদে ঋণ দেওয়া হয়।

সম্প্রতি বাজার স্থিতিশীল করার জন্যও বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে করপোরেট ট্যাক্স কমিয়ে আনা, বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশমুক্ত আয় ২৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার  টাকায় উন্নীত করা, নগদ লভ্যাংশের প্রতি উদ্যোক্তাদের মনোযোগ বাড়াতে বোনাস লভ্যাংশ ও রিটেইনড আর্নিংসের ওপর ১০ শতাংশ করারোপ অন্যতম। এছাড়া পুঁজিবাজারে প্রাইভেট প্লেসমেন্ট নিয়ে সৃষ্ট নৈরাজ্য দূরীকরণে নেওয়া পদক্ষেপসহ আরও কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।

পাশাপাশি, পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির নেওয়া বিনিয়োগ শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণ, বাজারে বৈচিত্র্য আনতে নতুন পণ্য হিসেবে স্মল ক্যাপিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু, ডেরিভেটিভস, শর্ট সেল ও ইনভেস্টমেন্ট আইন প্রণয়নের ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়। কিন্তু এসবের কোনো কিছুতেই বাজার ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।

সর্বশেষ..