প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

আড়াই হাজার কোটি টাকার প্রকল্প: খুলনা নগরীতে পানির ঘাটতি পূরণে উদ্যোগ

 

মহসিন হোসেন, খুলনা: খুলনা ওয়াসা নগরবাসীর সুপেয় পানির চাহিদা মেটাতে বাস্তবায়ন করছে আড়াই হাজার কোটি টাকার খুলনা ওয়াটার সাপ্লাই প্রকল্প। এ প্রকল্পের প্রায় ৫২ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। সব কিছু ঠিক থাকলে আগামী বছরের জুনেই নগরবাসী মুক্তি পাবে লবণাক্ত পানি পান থেকে।

খুলনা অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানি বরাবরই লবণাক্ত। সে কারণে নগরবাসীর সুপেয় পানির অভাব দীর্ঘদিনের। বর্তমানে খুলনা শহরের ১৫ লাখ মানুষের দৈনিক পানির চাহিদা গড়ে ২৪ কোটি লিটার। এ চাহিদা পূরণে খুলনা ওয়াসা ভূগর্ভস্থ স্তর থেকে উত্তোলিত মাত্র ১১ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করতে সক্ষম। তার মধ্যে ছয় কোটি লিটার নলকূপ ও পাঁচ কোটি লিটার পানি চাপকলের মাধ্যমে উত্তোলন ও সরবরাহ করা হয়। বাকি ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যে খুলনা শহর থেকে ৭১ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মধুমতি নদীর পানি সংগ্রহের পর তা পরিশোধনের মাধ্যমে সিটি করপোরেশনে সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এজন্য ২০১১ সালের ২৭ জুন খুলনা ওয়াটার সাপ্লাই প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন হয়। এ প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় দুই হাজার ৫৫৮ কোটি ৩৩ লাখ ৭২ হাজার টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার ৭৫০ কোটি ৪২ লাখ ৯৮ হাজার টাকা এবং উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ৫২৩ কোটি ৭৭ লাখ ৯৬ হাজার টাকা ও জাইকা এক হাজার ২৮৪ কোটি ১২ লাখ ৭৮ লাখ টাকা অর্থায়ন করছে। প্রকল্পের আওতায় মধুমতি নদী থেকে খুলনা শহরের দিকে ৩৩ কিলোমিটার দূরে পাইপের মাধ্যমে অপরিশোধিত পানি রূপসার সামন্তসেনা নামক স্থানে পরিশোধন করা হবে। সেখানে গড়ে দৈনিক ১১ কোটি লিটার পরিশোধন ক্ষমতাসম্পন্ন একটি শোধনাগারের পাশাপাশি অপরিশোধিত পানি সংরক্ষণের জন্য সাত লাখ ৭৫ হাজার কিউবিক মিটার ধারণক্ষমতা সম্পন্ন একটি জলাধার নির্মাণ করা হচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে এক থেকে দুই সপ্তাহ মধুমতির পানি কিছুটা লবণাক্ত হয়ে পড়ে। সে সময় জলাধারের পানি পরিশোধন করে প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ করা হবে।

এডিবির অর্থায়নে তিনটি ইন্টারন্যাশনাল কন্ট্রাক্ট

বিডি-আইসিবি প্যাকেজ ও দুটি ন্যাশনাল কন্ট্রাক্ট

বিডি-এনসিবি প্যাকেজ সাতটি ডিস্ট্রিবিউশন রিজার্ভার এবং ১০টি ওভারহেড ট্যাংক নির্মাণের মাঠপর্যায়ে কাজ চলছে। এর মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। ২০১৭ সালের মে মাসে কাজ সম্পন্ন হবে বলে কর্তৃপক্ষ আশা করছে। অন্যদিকে ‘ক্লিয়ার ওয়াটার ট্রান্সমিশন মেইনস ইনক্লুডিং রিভার ক্রসিং’র মাধ্যমে রূপসার সামন্তসেনা পানি শোধনাগার থেকে রূপসা নদীর তলদেশ হয়ে খুলনা শহরের বিভিন্ন স্থানে সাতটি রিজার্ভার পর্যন্ত প্রায় ৪০ কিলোমিটার পাইপ লাইন বসানো হচ্ছে। এ পর্যন্ত ৫৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে নগরীর পিটিআই মোড় এলাকায় এ পাইপ বসানোর কাজ চলছে। এ বছরের ডিসেম্বর নাগাদ কাজটি সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া ডিস্ট্রিবিউশন পাইপ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পাইপ লেয়িং কাজও শুরু হয়েছে। আগামী বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজটি সমাপ্ত করা হবে। এ কাজের আওতায় সিটি করপোরেশন এলাকায় বিভিন্ন ব্যাসের প্রায় ৬৫০ কিলোমিটার পাইপ লাইন বসানো হবে। যার মাধ্যমে গ্রাহকদের সুপেয় পানি সরবরাহ করা হবে। সূত্র জানায়, ‘ডিস্ট্রিবিউশন পাইপ নেটওয়ার্ক’টি রূপসার পাথরঘাটা ট্রিটমেন্ট প্লান্ট থেকে রূপসা ফেরিঘাট পর্যন্ত আনা হবে। এরপর রূপসা নদীর তলদেশ দিয়ে পাইপ লাইনটি পশ্চিম রূপসা বাস টার্মিনালে ওঠানো হবে। সেখান থেকে খানজাহান আলী রোড হয়ে রয়েল মোড়, ময়লাপোতা মোড়, শিববাড়ী মোড়, জোড়াগেট, বয়রা মহিলা কলেজ মোড়, বৈকালী হয়ে যশোর রোড দিয়ে নতুন রাস্তা মোড় দৌলতপুর-ফুলবাড়ীগেট, মিরেরডাঙ্গাসহ বিভিন্ন স্থানে ডিস্ট্রিবিউশন রিজার্ভার ও ওভারহেড ট্যাংকগুলোতে পৌঁছাবে। ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ে পাইপ বসানোর কাজ শুরু হয়েছে। এ পর্যন্ত কাজের ৫০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। এদিকে প্রায় ১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ইতোমধ্যে নগরীর সাত নম্বর ঘাট এলাকায় রেলওয়ের জমিতে পানি সরবরাহ প্রকল্পের আতওতাধীন খুলনা ওয়াসার ১০ তলা ফাউন্ডেশন বিশিষ্ট (প্রথম পর্যায়ে ৬ তলা) প্রধান ভবনের নির্মাণকাজ ২০১৬ সালের জুনে সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া চার কোটি টাকা ব্যয়ে মহেশ্বরপাশা ও চরেরহাট এলাকায় দুটি জোনাল বিল্ডিং নির্মাণের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। জাইকার অর্থায়নে ইমপাউন্ডিং রিজার্ভার অ্যান্ড সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট প্যাকেজের আওতায় রূপসা উপজেলার তিলক ও পাথরঘাটা নামক স্থানে এক কোটি ১০ লাখ লিটার (এমএলডি) ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন পানি শোধনাগার এবং ইমপাউন্ডিং রিজার্ভার নির্মাণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে বিদেশ থেকে শিট পাইল আমদানি করা হয়েছে এবং পাইল ড্রাইভিংয়ের কাজ শেষ হয়েছে। পাইলের কাজ ৯০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া ওয়াটার ইনটেক ফ্যাসিলিটি অ্যান্ড র ওয়াটার ট্রান্সমিশন পাইপলাইন প্যাকেজে বাগেরহাটের মোল্লাহাট ব্রিজসংলগ্ন মধুমতি নদী থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে রূপসা উপজেলার তিলক ও পাথরঘাটা নামক স্থানে প্রস্তাবিত পানি শোধনাগার স্থাপন করা হবে এবং মোল্লাহাট ব্রিজসংলগ্ন মধুমতি নদীর পাড়ে (ইনটেক স্ট্রাকচার অ্যান্ড পাম্প হাউজ) নির্মাণ করা হবে। ইতোমধ্যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ম্যাটেরিয়াল মোবিলাইজেশনের কাজ শুরু করেছে। এ পর্যন্ত ৩০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।

খুলনা ওয়াসার উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রকল্প পরিচালক কামাল উদ্দিন আহমেদ শেয়ার বিজকে জানান, বাংলাদেশ সরকার, এডিবি ও জাইকার অর্থায়নে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে খুলনা মহানগরীসহ আশপাশের ৬৫০ কিলোমিটার এলাকার মানুষের পানির চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে। আশা করা যায়, ২০১৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে এ কাজ শেষ হবে।