প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

আয়কর প্রদানে উৎসাহ বাড়াতে কিছু করণীয়ের প্রস্তাব

সোহেল রানা : আয়কর হচ্ছে একজন ব্যক্তির আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ, যা তিনি সরকারি কোষাগারে জমা দেন। আয়কর সরকারি অর্থায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। একটি দেশের উন্নয়নে আয়কর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কথায় আছে ‘জীবনে দুটি ব্যাপার নিশ্চিত মৃত্যু ও আয়কর’! যদিও আমাদের দেশে নানা কারণে আয়কর নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এর আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা যেমন আছে, তেমনি আছে করদাতাদের উৎসাহিত করায় ব্যর্থতাও।

বাংলাদেশে করদাতার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য নয়। ১৬ কোটি মানুষের দেশে গত ২০১৫-১৬ আয়করবর্ষে রিটার্ন দাখিলকারীর সংখ্যা ছিল ১৩ লাখের মতো, যা মোট জনগোষ্ঠীর ১ শতাংশেরও কম। ২০১৬-১৭ আয়করবর্ষে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১৬ লাখ। একই সময়ে মোট আয়করদাতা শনাক্তকরণ সংখ্যা (টিআইএন) সনদধারী বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২৯ লাখ। অর্থাৎ আয়কর সনদ নেওয়ার পরও প্রায় অর্ধেক সনদধারী রিটার্ন জমা দিচ্ছেন না।

একটা সময় আয়কর সনদ নেওয়া বা রিটার্ন জমা দেওয়া ঝামেলাপূর্ণ ছিল। মানুষ আয়কর প্রদানে খুব বেশি আগ্রহী ছিল না। অনলাইনে আয়কর সনদ প্রদান ও আয়কর মেলা প্রচলনের মতো যুগোপযোগী পদক্ষেপ উভয় ক্ষেত্রেই করদাতাদের ভোগান্তি লাঘবে ভূমিকা রেখেছে। গত কয়েক বছর আয়কর মেলায় উপচে পড়া ভিড় এর গ্রহণযোগ্যতাই প্রমাণ করে।

তারপরও গত বছরগুলোয় বাংলাদেশের জনসংখ্যা অনুপাতে করদাতার সংখ্যায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা যায়নি। আশার কথা, বর্তমানে করদাতাদের একটি বড় অংশই তরুণ, যারা এক দশক বা তার একটু বেশি আগে কর্মজীবনে প্রবেশ করেছে। এর অর্থ হচ্ছে তরুণ প্রজšে§র একটি অংশ কর প্রদানে আগ্রহী। কিন্তু সব কিছুর পরও যখন আয়করদাতার সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ১ শতাংশেরও কম, তখন এ কথা মেনে না নিয়ে উপায় থাকে না যে, আমরা আয়কর প্রদানকে জনপ্রিয় করতে পারিনি। কারণ বেশিরভাগ মানুষের কাছে কর একটি বাড়তি বোঝা। সর্বসাধারণকে আয়কর দিতে আগ্রহী করতে হলে আয়করকে খরচ না ভেবে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে।

যিনি আয়কর দিচ্ছেন, তিনি দেশের উন্নয়নে প্রত্যক্ষ অবদান রাখছেন। আর যিনি এটা দিচ্ছেন না, তিনি দেশের উন্নয়নে প্রত্যক্ষ অবদান রাখছেন না। পার্থক্য স্পষ্ট। কিন্তু যিনি নিজের উপার্জিত অর্থ আয়কর হিসেবে দিচ্ছেন, তিনি কি রাষ্ট্র থেকে প্রাপ্ত সুবিধায় সুস্পষ্ট পার্থক্য পাচ্ছেন?

সরকার শীর্ষ করদাতাদের সম্মাননা দিচ্ছে। শীর্ষ ও দীর্ঘমেয়াদি করদাতাদের সম্মাননা, ট্যাক্স কার্ড দেওয়ার পাশাপাশি ‘কর বাহাদুর’ খেতাব প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি সত্যিকার অর্থে সামান্য কিছু মানুষের জন্য নির্দিষ্ট। এ ধরনের সুবিধা সাধারণ করদাতার মধ্যে আগ্রহ বা উৎসাহ কোনোটিই আনতে পারছে না।

ব্যাংক আমানতে প্রাপ্ত মুনাফার ওপর আয়কর সনদধারীর কর কাটা হয় ১০ শতাংশ আর আয়কর সনদ না থাকলে কর ১৫ শতাংশ। যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মধ্যম আয়ের করদাতার টাকার অঙ্কে এ পার্থক্য খুবই সামান্য; তারপরও এটি করদাতাদের একধরনের মানসিক প্রশান্তির কারণ এ অর্থে যে, রাষ্ট্র তাদের আলাদাভাবে মূল্যায়ন করছে। শুধু এ একটি ক্ষেত্র ছাড়া আয়করদাতা দৃশ্যমান কোনো সুবিধা রাষ্ট্র থেকে পাচ্ছেন না। আয়করকে জনপ্রিয় করতে এ জায়গায় পরিবর্তন আনা জরুরি। এমন কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, যাতে করযোগ্য আয় করেও যারা আয়কর দিচ্ছেন না, তাদের কর প্রদানে উৎসাহিত করা যায়।

এ ধরনের সুবিধার উদাহরণ হতে পারে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে ব্যাংকিং ও বিভিন্ন বিল পরিশোধে করদাতাদের জন্য আলাদা লাইন; থানা, ইউনিয়ন পরিষদ, ভূমি নিবন্ধন, পাসপোর্ট অফিসসহ সাধারণ মানুষের জন্য জরুরি সরকারি অফিসগুলোতে সাধারণের তুলনায় করদাতাদের জন্য দ্রুত সেবার ব্যবস্থা; করদাতাদের জন্য বিদ্যুৎ, টেলিফোন, পানির বিল পরিশোধে অতিরিক্ত এক সপ্তাহ সময় প্রদান প্রভৃতি। আর্থিক প্রণোদনার তুলনায় সামাজিক সম্মান মানুষকে বেশি উৎসাহিত করে। চাইলেই সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি না করে এ ধরনের অনেক সুবিধা দেওয়া যায়।

অধিকাংশ বেসরকারি চাকরিতেই পেনশন বা ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নেই। নেই চাকরির নিশ্চয়তা। অবশ্য আমাদের দেশে সামাজিক নিরাপত্তা জাতীয় কোনো ব্যবস্থাও নেই। তাই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিরা স্বাভাবিকভাবে ভবিষ্যৎ নিয়ে একধরনের অনিশ্চয়তায় ভোগেন। হিসাব করলে দেখা যাবে, মোট করদাতার ভেতর প্রায় ৫০ শতাংশই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী। কারণ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বেতন ও সুযোগ-সুবিধা বেশি এবং বেতন দেওয়ার সময়ই প্রতিষ্ঠান উৎসে কর কেটে নেয়।

দেখা যায়, ৩০-৪০ বছরের চাকরিজীবনের প্রায় পুরো সময়টায়ই কর দেওয়ার পরও শেষ বয়সে অবসরের পর কোনো কারণে অসচ্ছল হয়ে পড়লে রাষ্ট্রের পক্ষে তার ভরণপোষণে কোনো পরিকল্পনা বা ব্যবস্থা নেই। এটি একধরনের অন্যায়। কর হতে প্রাপ্ত আয় থেকে একটি ফান্ড করা যেতে পারে, যেখানে ১০, ২০, ৩০ বছর কর দেওয়া ব্যক্তিরা প্রয়োজনে অবসরকালীন মাসিক ভাতার জন্য আবেদন করতে পারবেন। বেশিরভাগ ব্যক্তির হয়তো কখনও ভাতা নেওয়ার প্রয়োজন পড়বে না। কিন্তু ২০-৩০ বছর আয়কর দেওয়ার পরও কোনো ব্যক্তি যদি আর্থিক অনটনে না খেয়ে মারা যায়, এর দায় কি রাষ্ট্র এড়াতে পারবে?

এ ধরনের সুযোগ তৈরি করতে পারলে মানুষ আর আয়করকে খরচ ভাববে না; বরং একধরনের বিনিয়োগ ভেবে মানসিক প্রশান্তি পাবে, যা সামগ্রিকভাবে আয়কর দেওয়ার প্রতি আগ্রহ বাড়াবে।

কেউ অপরাধ করে পার পেয়ে গেলে তা অন্যদেরও অপরাধ করতে উৎসাহী করে। তাই করদাতাদের জন্য নানা রকম সুবিধা ঘোষণার পাশাপাশি যারা কর আদায়কারী রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে বিশেষ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ফাঁকি দিচ্ছে, তাদের জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি থাকা জরুরি। শীর্ষ ধনীর তালিকায় অনেকের নাম থাকার পরও শীর্ষ করদাতার তালিকায় তাদের নাম দেখা যায় না, যা করব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা বৃদ্ধি করে না।

অনেক স্বনামধন্য প্রভাবশালী ব্যবসায়ীকে পেছনে ফেলে বেশ কয়েকবার (টানা গত দুই বছরের শীর্ষ করদাতা) হাকিমপুরী জর্দা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী কাউছ মিয়া শীর্ষ করদাতা হওয়া যেমন উৎসাহ জাগানিয়া, তেমনি এটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, কর-জাল রাঘববোয়ালদের ধরতে ব্যর্থ।

বিভিন্ন তথ্যমতে, দেশে কর দেওয়ার যোগ্য মানুষের সংখ্যা ৮০ লাখের বেশি। এর মধ্যে মাত্র ১৫-১৬ লাখ মানুষকে করজালে আনা সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ করযোগ্য আয় থাকা ব্যক্তিদের অন্তত ৮০ শতাংশই কর দিচ্ছে না। এ বিপুল সংখ্যক মানুষ করের বাইরে থেকে যাওয়ায় দেশের উন্নয়ন যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি বাড়ছে বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা। আবার কর না দেওয়া ব্যক্তিদের কারণে যারা কর দিচ্ছে, তাদের ওপর চাপ বাড়ছে। ফলে গত দুই বছর করমুক্ত আয়সীমা বাড়েনি। কমেছে কর রেয়াতের সুবিধা।

আয়কর হচ্ছে প্রত্যক্ষ কর। এখানে ঘাটতি থেকে যাওয়ায় পরোক্ষ কর যেমন ভ্যাটের ওপর চাপ বাড়ছে, যা সরাসরি নি¤œ আয়ের মানুষের ওপরও চাপ সৃষ্টি করছে।

করের টাকা কীভাবে, কোন খাতে খরচ হচ্ছে, সে ব্যাপারে স্বচ্ছতা প্রয়োজন। করের টাকায় চলা নানামুখী উন্নয়ন প্রকল্পে লুটপাটের ঘটনা করদাতাদের হতাশ করে। তাই তাদের উৎসাহী করার পাশাপাশি কর ফাঁকি রোধ করতে হবে। মানুষ যদি বুঝতে পারে, তার দেওয়া করের টাকা উন্নয়নের পাশাপাশি তার নিজের ভবিষ্যৎকেও নিরাপদ করছে, তাহলে কর দিতে তার আপত্তি থাকবে না। কিন্তু যদি উচ্চবিত্ত ও বড় ব্যবসায়ীদের কর ফাঁকির কারণে মধ্যম আয়ের করদাতাদের ওপর চাপ বাড়েÑতা যেমন করদাতাদের নিরুৎসাহিত করবে, তেমনি সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতিতেও বিরূপ প্রভাব ফেলবে।

 

ফাইন্যান্স অ্যান্ড ট্যাক্স কো-অর্ডিনেটর

 

স্পিই অয়েল অ্যান্ড গ্যাস

সার্ভিসেস (থাইল্যান্ড) লিমিটেড

sohelrana.ibaÑgmail.com