মত-বিশ্লেষণ

আয় বৈষম্য কমানো ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়

কনক বর্মন: একজন সুস্থ মানুষের শরীরের জন্য প্রয়োজন পাঁচ থেকে ছয় লিটার রক্তের। পাঁচ-ছয় লিটার রক্ত শরীরে থাকল ঠিকই কিন্তু সেই রক্ত যদি শরীরের একটা অংশে জমা থাকে তাহলে সেই মানুষটিকে কি সুস্থ বলা যাবে? অবশ্যই না। দেশের উন্নয়ন হচ্ছে, দেশ এগিয়ে যাচ্ছে।
বিবেচনার বিষয় হচ্ছে, দেশের এই উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় দেশের প্রায় ছয় কোটি শ্রমিকের অবস্থান কোথায়? আদৌ কি শ্রমিকরা এগিয়ে যেতে পারছেন? কিংবা দেশের এই বিশাল অংশের মানুষের জন্য উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় এগিয়ে যাওয়ার সুযোগই বা কতটুকু আছে?
বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০০৭ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু গড় আয় ছিল ৫৪১ মার্কিন ডলার, ২০১৮ সালে এসে সেই মাথাপিছু গড় আয় দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৭৫১ মার্কিন ডলারে। দশ-এগারো বছরে মাথাপিছু গড় আয় তিন গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পাওয়া অবশ্যই প্রশংসার যোগ্য। কিন্তু মাথাপিছু গড় আয় বৃদ্ধির চোরাগলিতে যেভাবে দিনের পর দিন দেশে লাগাতারভাবে আয় বৈষম্য বেড়েই চলছে, সেটা মোটেই সুখকর নয়। আয় বৈষম্য পরিমাপের সারা পৃথিবীব্যাপী স্বীকৃত পদ্ধতি হচ্ছে ‘জিনি সহগ’ সূচক। ‘জিনি সহগ’ অনুপাত ‘শূন্য’ মানে সে দেশে কোনো বৈষম্য নেই। আর যদি ‘১’ হয় তাহলে সে দেশে পূর্ণ মাত্রার বৈষম্য বিদ্যমান আছে ধরা হয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত জরিপগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৯১-৯২ সালে ‘জিনি সহগ’ সূচকে বাংলাদেশের মান ছিল শূন্য দশমিক ৩৬। ২০০৫ সালে এই মান এসে দাঁড়ায় শূন্য দশমিক ৪৬৭ এবং ২০১০ সালে এসে কিছুটা কমে দাঁড়ায় শূন্য দশমিক ৪৫৮। সর্বশেষ জরিপে ২০১৬ সালে এসে এই মান দাঁড়িয়েছে শূন্য দশমিক ৪৮৩। দ্রুত বেড়ে গিয়ে এখন এই মান প্রায় শূন্য দশমিক ৫০-৫১তে এসে পৌঁছে গেছে। এই মান কোনো দেশে শূন্য দশমিক ৫০ পেরিয়ে যাওয়া মোটেও ভালো কিছু নয়। শূন্য দশমিক ৫০ পেরিয়ে যাওয়াকে বৈষম্যের বিবেচনায় একটি দেশের জন্য ‘অশনিসংকেত’ হিসেবে দেখা হয় এবং সেই দেশকে তখন ‘উচ্চ আয় বৈষম্যের’ দেশ বলা হয়। সেদিক থেকে ‘জিনি সহগ’ সূচকের মান বিবেচনায় বাংলাদেশ এখন ‘উচ্চ আয় বৈষম্যের’ দেশ।
২০১৬ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যা ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত সর্বশেষ খানা আয়-ব্যয় জরিপ অনুযায়ী, দেশের মোট আয়ের প্রায় ২৮ শতাংশই এখন মাত্র পাঁচ শতাংশ ধনাঢ্য পরিবারের হাতে। আর সবচেয়ে গরিব পাঁচ শতাংশ পরিবারের আয় মাত্র দশমিক ২৩ শতাংশ। অর্থাৎ দেশে ১০০ টাকা আয়ের ২৮ টাকা যাচ্ছে ধনাঢ্য পাঁচ শতাংশ পরিবারে। আর মাত্র ২৩ পয়সা পাচ্ছে সবচেয়ে গরিব পাঁচ শতাংশ পরিবার। দেশের মোট খানাকে ভাগ করে আয় বণ্টনের চিত্রে দেখা যায়, সবচেয়ে ধনাঢ্য ১০ শতাংশের হাতে রয়েছে ৩৮ শতাংশ আয়। অন্যদিকে সবচেয়ে গরিব ১০ শতাংশের হাতে রয়েছে মাত্র এক শতাংশ আয়। অথচ ২০১০ সালেও সবচেয়ে ধনাঢ্য পাঁচ শতাংশ পরিবারের হাতে ছিল মোট আয়ের ২৪ দশমিক ৬১ শতাংশ এবং সবচেয়ে গরিব পাঁচ শতাংশ পরিবারের আয় ছিল দশমিক ৭৮ শতাংশ। দেশে যে শুধু আয়-বৈষম্য বাড়ছে তাই নয়, একই সঙ্গে
অতিধনীদের সংখ্যাও নজিরবিহীন হারে বাড়ছে। অতিধনীদের সংখ্যা বৃদ্ধির হারের দিক থেকে শতকরা হিসেবে আমেরিকা, রাশিয়া, চীন জাপানসহ বহু দেশকে ছাড়িয়ে বাংলাদেশের অবস্থান এখন সারা বিশ্বে তৃতীয়। দেশে বিদ্যমান এই আয়-বৈষম্য বৈশ্বিক অর্থনীতির গতিপ্রকৃতির থেকে আলাদা কিছু নয়। সম্প্রতি সময়ে গবেষণা সংস্থা অক্সফামের প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে জানা যায়, বর্তমানে ২৬ জন ধনী ব্যক্তির কাছে যে পরিমাণ সম্পদ রয়েছে, তা পৃথিবীর সব গরিব মানুষের অর্ধেক সম্পদের সমান। অর্থাৎ ২৬ জন মানুষের হাতে রয়েছে ৩৮০ কোটি মানুষের সমান সম্পদ। বর্তমান পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থায় বেশিরভাগ রাষ্ট্রের অবস্থাও একই রকম। মূলত কোনো রাষ্ট্রে নাগরিকদের মধ্যে আয় ও সম্পদের ভারসাম্য বা বৈষম্য কতটা থাকবে সেটা নির্ভর করে সেই দেশের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ধারার ওপর। এ বিষয়ে সাফল্যেও উদাহরণ হিসেবে সাবেক সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে ‘ওয়েলফেয়ার ইকোনমি’-এর কথা বলা যাতে পারে। ইউরোপের নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্ক, জার্মানি এবং যুক্তরাজ্যের মতো ‘ওয়েলফেয়ার স্টেট’গুলোতে কিন্তু এমন উচ্চমাত্রার আয় বা সম্পদ বৈষম্য দেখা যায় না। এখন বাংলাদেশ এই উচ্চমাত্রার আয় বা সম্পদ বৈষম্য কমানোর জন্য বা সহনীয় পর্যায়ে রাখার জন্য কোন পথে হাঁটবে সেটা ভাববার বিষয়। বাংলাদেশ যে পথেই হাঁটুক না কেন দেশের
এই উন্নয়ন ধারাকে যদি টেকসই রাখতে হয় তাহলে উন্নয়নের এই অগ্রযাত্রায় অবশ্যই বৃহত্তর শ্রমিক সমাজকে অন্তর্ভুক্ত করতেই হবে। তা না হলে কখনোই এই উন্নয়নকে টেকসই উন্নয়নে রূপ দেওয়া সম্ভব হবে না। আর শ্রমিকের অন্তর্ভুক্তিমূলক টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন শ্রমিকের সামাজিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা। আইএলও কনভেনশন ৮৭ এবং ৯৮ অনুযায়ী সব শ্রমিকের জন্য সংঘবদ্ধ হওয়া, ট্রেড ইউনিয়ন করা এবং দর কষাকষি করার অধিকার নিশ্চিত করা। প্রাতিষ্ঠানিক এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের সব শ্রমিক যাতে অবাধে ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার ভোগ করতে পারে সেটা নিশ্চিত করা।
শ্রমিক ছাড়া যেমন আধুনিক বিশ্বের কথা চিন্তা করা যায় না, তেমনি শ্রমিকের জীবন মানের উন্নয়ন, চাকুরির নিরাপত্তা, উপযুক্ত মজুরি, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের মৃত্যুতে সারা জীবনের আয়ের সমান ক্ষতিপূরণ প্রদানের নিশ্চয়তা ব্যতিরেখে কোনোভাবেই বাংলাদেশের জন্য টেকসই উন্নয়ন কামনা করা যায় না। যে শ্রমিকরা দিন-রাত শ্রম দিয়ে মুষ্টিমেয় মানুষের পুঁজি বৃদ্ধির জোগান দিচ্ছে সেই শ্রমিকদের সন্তানরা যদি নিরাপদ নিশ্চিন্তে পড়াশোনা করতে না পারে, অর্থকষ্টে তাদের যদি পড়াশোনা বন্ধ করে দিতে হয় তাহলে এই উন্নয়ন দেশের সামগ্রিক কল্যাণে কাজে আসবে না। যে শ্রমিকদের রক্ত ঘামে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে সেই শ্রমিকদের বা শ্রমিক প্রতিনিধিদের দেশের সিদ্ধান্ত বা পরিকল্পনা গ্রহণের সব পর্যায়ে যদি অন্তর্ভুক্ত করা না যায় তাহলে এই উন্নয়ন কখনোই শ্রমিকের জন্য কল্যাণকর হয়ে উঠবে না। দেশের প্রতিটি সিদ্ধান্ত বা পরিকল্পনা গ্রহণের সঙ্গে শ্রমিকের কল্যাণ বা অকল্যাণ যুক্ত। মনে রাখতে হবে শ্রমিকের কল্যাণ মানেই দেশের কল্যাণ এবং শ্রমিকের অকল্যাণ মানেই তা হবে দেশের জন্য অকল্যাণকর।

শ্রমিক সংগঠক

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..