প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

ইআরডিতে চিঠি: জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী ডাবল লাইন নির্মাণে ৭৫ কোটি ডলার দেবে চীন

 

ইসমাইল আলী: জয়দেবপুর থেকে পাবনার ঈশ্বরদী পর্যন্ত রেলপথটি ডুয়েলগেজ ডাবল লাইনে উন্নীত করবে রেলওয়ে। জিটুজি ভিত্তিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে গত বছর প্রস্তাব দেওয়া হয়। এতে সম্মত হয়েছে চীন সরকার। গত বুধবার অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি) এ সংক্রান্ত চিঠি পাঠায় বাংলাদেশে অবস্থিত চীনা দূতাবাস। এতে বলা হয়, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ৭৫ কোটি ২৮ লাখ ডলার ঋণ দেবে চীন।

তথ্যমতে, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে জয়দেবপুর- ঈশ্বরদী সেকশনে ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন নির্মাণ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হয়। রিজিওনাল কো-অপারেশন অ্যান্ড ইন্টিগ্রেশন প্রজেক্টের (আরসিআইপি) রেল কমপোনেন্ট শিরোনামে কারিগরি সহায়তা প্রকল্পের অধীনে নিয়োজিত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান স্ম্যাক ইন্টারন্যাশনাল এ সমীক্ষা পরিচালনা করে। এ রেলপথের দৈর্ঘ্য হবে ১৭৩ দশমিক ৩৪ কিলোমিটার।

রেলপথটি নির্মাণে ২০১৪ সালের ২৬ অক্টোবর চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের (সিসিইসিসি) সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই হয়। পরে এ সংক্রান্ত চূড়ান্ত প্রস্তাবনা দেয় প্রতিষ্ঠানটি। এতে রেলপথ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় ৯৪ কোটি ১০ লাখ ডলার বা সাত হাজার ৫২৭ কোটি ৯২ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৭৫ কোটি ২৮ লাখ ডলার বা ছয় হাজার ২২ টাকা ৪০ লাখ টাকা ঋণ দেবে চীন। আর সরকারের ব্যয় হবে ১৮ কোটি ৮২ লাখ ডলার বা এক হাজার ৫০৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এ প্রস্তাব অনুমোদন করেছে দেশটির সরকার।

গত ২৮ ডিসেম্বর ইআরডিতে পাঠানো চিঠিতে এ প্রসঙ্গে বলা হয়, গত ১১ নভেম্বর বাংলাদেশের অর্থ মন্ত্রণালয় জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী রেলপথ নির্মাণে অর্থায়ন প্রস্তাব (রেফারেন্স নং- ০৯.৮১৪.০২৪.০০.৭৩.০৭৩.২০১৩) চীনা দূতাবাসে পাঠায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে চীনা দূতাবাসের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কাউন্সিলর আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছে যে, প্রকল্পটি অর্থায়নে ৭৫ কোটি ২৮ লাখ ডলার ঋণ দিতে সম্মত হয়েছে চীনের এক্সিম ব্যাংক। আর প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে সিসিইসিসি, যা চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত একটি প্রতিষ্ঠান।

চীনের অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে শিগগিরই বাণিজ্যিক চুক্তি করার পরামর্শ দিয়ে চিঠিতে বলা হয়, চুক্তির পর ঋণ নিয়ে চীনের এক্সিম ব্যাংক ও বাংলাদেশের ইআরডি দরকষাকষি করবে। দুবছরের মধ্যে এ প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে। তা না হলে প্রকল্পের বৈধতাপত্র বাতিল হয়ে যাবে। তাই বাংলাদেশ প্রকল্পটিতে ঋণ নিতে আগ্রহী হলে এ সংক্রান্ত একটি আগ্রহপত্র দ্রুত চীনা দূতাবাসের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কাউন্সিলে পাঠানোর ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়।

এছাড়া চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে কোনো ধরনের ঘুষ বা দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হলে বৈধতাপত্র বাতিল করা হবে বলে চিঠিতে জানানো হয়।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আমজাদ হোসেন শেয়ার বিজকে বলেন, চীনের অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে আগ্রহী রেলওয়ে। এজন্য গত বছর ইআরডির মাধ্যমে চীনা দূতাবাসে আগ্রহপত্র পাঠানো হয়। প্রয়োজনে আবারও আগ্রহপত্র পাঠানো হবে। এছাড়া রেলপথ নির্মাণ প্রস্তাবটি ক্রয় কমিটিতেও অনুমোদন করা হয়েছে। শিগগিরই এ সংক্রান্ত বাণিজ্যিক চুক্তি সই হবে।

সূত্র জানায়, জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী সেকশন বাংলাদেশ রেলওয়ের একটি ব্যস্ত রুট। রাজশাহী, খুলনা, রংপুর, দিনাজপুর, লালমনিরহাট এবং উত্তরাঞ্চলের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শহরের সঙ্গে রাজধানী ঢাকা অভিমুখী সব যাত্রীবাহী ও মালবাহী ট্রেন এ রুটে চলাচল করে। এ কারণে ঈশ্বরদী-জয়দেবপুর রুট সেকশনে ট্রেন চলাচল ক্ষমতা এরই মধ্যে পূর্ণ হয়েছে। ফলে এ রুটে নতুন কোনো ট্রেন চালু করা সম্ভব হবে না। এ কারণেই রেলপথটি ডাবল লাইনে উন্নীত করা দরকার।

জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী সেকশনে ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন নির্মিত হলে আন্তনগর ট্রেনের মাধ্যমে ঢাকা থেকে রাজশাহী সাড়ে ছয় ঘণ্টার বদলে চার ঘণ্টায়; ঢাকা থেকে খুলনা, দিনাজপুর ও লালমনিরহাট ১০ ঘণ্টার বদলে আট ঘণ্টায় এবং ঢাকা থেকে রংপুর ও দিনাজপুর ৯ ঘণ্টার বদলে সাত ঘণ্টায় পৌঁছানো সম্ভব হবে।

তথ্যমতে, বর্তমানে পার্বতীপুর-দিনাজপুর-পঞ্চগড় এবং কাঞ্চন-বিরল বর্ডার সেকশনকে ডুয়েলগেজে রূপান্তরের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এটি শেষ হলে পঞ্চগড়-ঢাকা রুটে নতুন যাত্রী ট্রেনসহ বিরল বর্ডার দিয়ে আন্তদেশীয় মালবাহী ট্রেন চালু করা সম্ভব। তবে জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী সেকশনের সক্ষমতা না বাড়ালে নতুন ট্রেন চালু করা সম্ভব হবে না।

গত ১০ অক্টোবর রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে পাঠানো সারসংক্ষেপে বলা হয়, জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী সেকশনে ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন নির্মিত হলে ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ের রুট ১, ২ ও ৩-এর মাধ্যমে আন্তএশীয় রেল নেটওয়ার্কে উপনীত হবে। ফলে অভ্যন্তরীণ ও আন্তদেশীয় মালবাহী এবং কন্টেইনার পরিচালনা করা সম্ভব হবে। এটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

উল্লেখ্য, ২০১৫ সালের ১৫ জানুয়ারি প্রায় সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকার প্রকল্পটির প্রাথমিক উন্নয়ন প্রস্তাবনা (পিডিপিপি) অনুমোদন করেন পরিকল্পনামন্ত্রী। এরপর ১৮ জানুয়ারি অনুমোদিত পিডিপিপি অর্থায়ন অনুসন্ধানের জন্য অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে পাঠায়। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ প্রকল্পটিতে অর্থায়নের জন্য গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় চীনা দূতাবাসের কাছে অনুরোধপত্র পাঠায়। গত ২২ আগস্ট চীনের রাষ্ট্রদূত বরাবর অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ২৫টি অগ্রাধিকার প্রকল্পের তালিকা পাঠিয়ে তাতে দ্রুত অর্থায়নের অনুরোধ জানান। পরে চীনের রাষ্ট্রপতির ঢাকা সফরে প্রকল্পগুলোর অর্থায়নে সমঝোতা স্মারক সই হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পটির অর্থায়ন নিশ্চিত করলো চীন।