প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

ইউরোপের ‘রানি’ অ্যাঙ্গেলা মেরকেলের বিদায়

মো. জিল্লুর রহমান:প্রায় ১৬ বছরের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের পর গত বৃহস্পতিবার (২ ডিসেম্বর) আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিলেন জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল। অ্যাঙ্গেলা মেরকেল জার্মানির একালের সবচেয়ে বলিষ্ঠ চ্যান্সেলর। যার আরেক নাম ‘ইউরোপের ক্রাইসিস ম্যানেজার’। শুধু ইউরোপ নয়, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য ছাড়িয়ে এশিয়ায়ও তার সমান প্রভাব। বিশ্ব রাজনীতিবিদদের মধ্যে একটা প্রবাদ ছিল ‘মেরকেলকে কখনও খাটো করে দেখ না’। অনেক আগেই তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি আর চ্যান্সেলর পদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বি^তা করবেন না। এটা সত্য যে, তিনি হচ্ছেন ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের বর্তমান নেতাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে নেতৃত্বের পদে থাকা ব্যক্তি এবং একমাত্র নারী। তিনি প্রায় ১০০টি ইইউ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন, মাঝে মধ্যে তাকে বলা হতো অ্যাঙ্গেলা মেরকেলই ইইউ সম্মেলনের একমাত্র বয়স্ক ব্যক্তি। নিজের দায়িত্ব পালনকালে অ্যাঙ্গেলা মেরকেল পাঁচ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর শাসনকাল দেখেছেন। এছাড়া চারজন ফরাসি প্রেসিডেন্ট, সাত ইতালিয়ান প্রধানমন্ত্রী, চারজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট এবং আট জাপানি প্রধানমন্ত্রীর পালাবদল দেখেছেন।

মেরকেল ২০০৫ সালে প্রথম মেয়াদে নির্বাচনের পর থেকেই যে অবিশ্বাস্য দ্রুততায় বিশ্বের ক্ষমতাধর নেতাদের মধ্যে জায়গা করে নিয়েছেন। তাতে অনেকের ধারণা, তিনি ব্রিটেনের মার্গারেট থ্যাচারকেও ছাড়িয়ে গেছেন। ২০০৯ এবং ২০১৩ সালের নির্বাচনেও জার্মান মানুষ তার পক্ষেই রায় দিয়েছিল। তিনি ২০১০ সালের ১০ এপ্রিল জার্মানির মেকলেনবার্গ-ভোরপোমার্ন প্রদেশ থেকে জার্মান সংসদে সর্বাধিক সংখ্যক আসন জয়ের মাধ্যমে চ্যান্সেলর নির্বাচিত হন। ক্ষমতা হস্তান্তরের ঠিক আগে তিনি জার্মানির চ্যান্সেলর হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নিলেন। যথাযোগ্য সামরিক মর্যাদার সঙ্গে বার্লিনে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দপ্তরে সেই অনুষ্ঠানে কুচকাওয়াজ ও সৈন্যদের অর্কেস্ট্রায় বাজনা শোনানো হয়। মেরকেলের সম্ভাব্য উত্তরসূরি ওলাফ শলৎস বিদায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। মেরকেল তাকে ও তার ভবিষ্যৎ প্রশাসনকে আন্তরিক শুভকামনা জানান। প্রেসিডেন্ট ফ্রাংক-ভাল্টার স্টাইনমায়ারও মেরকেলকে বিদায় জানাতে উপস্থিত ছিলেন। করোনা সংকটের কারণে অনুষ্ঠানে বেশি সংখ্যক অতিথিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। তবে চরম দক্ষিণপন্থি এএফডি দল ছাড়া জার্মানির অন্য সব রাজনৈতিক শক্তির প্রতিনিধিরা মেরকেলের বিদায়ী অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত ছিলেন। আনুষ্ঠানিক বিদায়ের পরও মেরকেলকে কয়েকদিন কার্যনির্বাহী চ্যান্সেলর হিসেবে কাজ চালিয়ে যেতে হবে। বিশেষ করে করোনা সংকটের কারণে জার্মানিতে এই মুহূর্তে বিদায়ী সরকারের পক্ষেও নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকা সম্ভব নয়। ভবিষ্যৎ সরকারের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে করোনা সংকট মোকাবিলায় ইতোমধ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়েছে।

প্রায় ১৬ বছর সরকারপ্রধান হিসেবে বিদায় নেয়ার আগে নিজের ভাষণে মেরকেল গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষার প্রতিজ্ঞা করেন। তার মতে, যখনই কোথাও ঘৃণা ও সহিংসতাকে নিজস্ব স্বার্থ রক্ষার বৈধ হাতিয়ার হিসেবে গণ্য করা হয়, তখনই গণতন্ত্রকামী হিসেবে আমাদের সহিষ্ণুতার সীমা শেষ হওয়া উচিত। তিনি জার্মানির মানুষের উদ্দেশে ঘৃণার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। তিনি সবসময়ে অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি থেকেও জগতকে দেখার পরামর্শ দেন। তিনি নিজের কার্যকালে বিভিন্ন সংকটের উল্লেখ করেন। তিনি জলবায়ু পরিবর্তন, করোনা মহামারি, ডিজিটালাইজেশন, শরণার্থী সংকটের মতো বিশাল চ্যালঞ্জে সামলাতে নিজের অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন। এ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও বহুপাক্ষিক কাঠামোগুলোকে মেরকেল অপরিহার্য বলে বর্ণনা করেন।

আসলে অ্যাঙ্গেলা মেরকেল ১৬ বছর ধরে জার্মান রাজনীতিতে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী নাম। ২০১৮ সালের ৭ ডিসেম্বর ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাট দলের প্রধানের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে এক আবেগময়ী ভাষণে তিনি দেশের ভেতরে ও বাইরে ‘জার্মানির উদার মূল্যবোধ’কে বাঁচিয়ে রাখার আহ্বান জানিয়ে ছিলেন। তাকে একজন বিচক্ষণ ও বাস্তববাদী নেতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এক সময় বলা হতো তিনিই ‘জার্মানির রানি’। বাস্তবিক অর্থেই অ্যাঙ্গেলা মেরকেল বিশ্বের একজন ক্ষমতাধর নারী। তাকে তুলনা করা হয় ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থেচারের সঙ্গে। অনেকে বলেন, আসলে তিনি থেচারকেও ছাড়িয়ে গেছেন। মার্গারেট থ্যাচার একযুগ ব্রিটেনের ক্ষমতায় ছিলেন কিন্তু অ্যাঙ্গেলা ম্যার্কেল ১৬ বছর ধরে জার্মান রাজনীতিতে চ্যান্সেলর হিসেবে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন এবং জার্মানিকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন।

এজন্য অনেকেই যেন তার মধ্যে ব্রিটেনের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের ছায়া দেখতে পান। মার্গারেট থ্যাচার ৪ মে, ১৯৭৯ থেকে ২৮ নভেম্বর, ১৯৯০ পর্যন্ত ব্রিটেনের ইতিহাসে একমাত্র নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কনজারভেটিভ পার্টি থেকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ব্রিটেনের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হয়েও যেভাবে শক্ত হাতে, বিভিন্ন বাধা অগ্রাহ্য করে তিনি ব্রিটেনের অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক সংস্কার এনেছিলেন, তার জন্য তিনি আয়রন লেডি হিসেবে সুখ্যাতি পেয়েছিলেন। অন্যদিকে অ্যাঙ্গেলা মেরকেলকে বলা হয় ইউরোপের রানি।

অ্যাঙ্গেলা মেরকেল ১৯৫৪ সালের ১৭ জুলাই পশ্চিম জার্মানির হ্যামবুর্গে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পুরো নাম আঙ্গেলা ডোরোটেয়া মেরকেল। তার পিতার নাম হোর্স্ট কাসনার এবং মাতার নাম হারলিন। মেরকেলের মা ছিলেন ল্যাটিন এবং ইংরেজির শিক্ষক। তিনি একসময় সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির সদস্য ছিলেন। মেরকেলের মায়ের পূর্বপুরুষরা পোল্যান্ডের অধিবাসী ছিলেন। তার এক ছোট ভাই এবং ছোট বোন আছে কিন্তু অ্যাঙ্গেলা মেরকেল দম্পতি নিঃসন্তান, তবে তারা শিশুদের অনেক ভালোবাসেন এবং শিশুদের জন্য নানা সামাজিক কাজের সঙ্গে যুক্ত। আঙ্গেলা মেরকেল টেম্পলিন শহরের একটি স্কুলে পড়ালেখা করেন। এরপর তিনি লাইপৎসিশ বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত পদার্থবিজ্ঞান পড়েন। শিক্ষার্থী থাকাকালে মেরকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে সহশিক্ষামূলক কার্যক্রম চালুর দাবিতে অংশগ্রহণ করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে মেরকেল বার্লিনে অবস্থিত বিখ্যাত জার্মান বিজ্ঞান একাডেমিতে ভৌত রসায়ন বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষা নেন এবং এখানেই তার কর্মজীবন শুরু করেন। সে সময় তিনি রুশ ভাষা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলতে শিখেছিলেন। কোয়ান্টাম রসায়নের ওপর গবেষণার জন্য তাকে ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করা হয়। এরপর তিনি এখানে গবেষক হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৭৭ সালে তারই সহকর্মী ও পদার্থবিজ্ঞানের গবেষক উলরিচ মেরকেলকে বিয়ে করেন কিন্তু ৫ বছর পর তাদের বিয়ে ভেঙে যায়। বিবাহবিচ্ছেদের পরও তার প্রথম স্বামীর রেখে দেয়া মেরকেল নামটি ফিরিয়ে দেয়ার পরিবর্তে ব্যবহার করেন। এরপর রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ইওয়াখিম সাউয়ারের সঙ্গে পরিচয় এবং পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। এ দম্পতির নিজেদের কোনো সন্তান নেই, তবে তার স্বামীর পূর্ববর্তী বিবাহ থেকে দুই ছেলে আছে।

তখনকার দিনে পূর্ব জার্মানিতে যেকোনো বিষয়ে পিএইচডি পেতে হলে মার্কস-লেনিনের তত্ত্বের ওপর দখল থাকার পাশাপাশি একটি কোর্সও করতে হতো। মেরকেল সেই সুবাদে রাজনীতির হাতেখড়িটা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে পেয়ে যান। পূর্ব জার্মানির ক্ষমতাসীন ‘সোশ্যালিস্ট ইউনিটি পার্টি’র যুব সংগঠন ফ্রি জার্মান ইয়ুথের সঙ্গে যোগ দিলেন। তবে গবেষণাও পুরোদমে চলছিল, ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তিনি কোয়ান্টাম ফিজিক্স আর কেমিস্ট্রির মতো কাটখোট্টা সব বিষয় নিয়ে ৭টি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন।

অ্যাঙ্গেলা মেরকেলের বাস্তববুদ্ধি অনেক সময় ইউরোপিয়ান ইউনিয়নকে বহু সংকট পার হয়ে আসতে সহায়তা করেছে; যা কখনও কখনও ইইউর অস্তিত্বকে বিপন্ন করতে পারত। ২০১৫ সালের ইউরোজোনের সংকটের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এমনকি গ্রিসের ত্যাজী অর্থমন্ত্রী ইয়ানিম ভারুফাকিসও স্বীকার করেন, তার দেশের আর্থিক দুরবস্থা সত্ত্বেও গ্রিসকে ইউরোজোনের ভেতরে রেখে মিসেস মেরকেল আসলে ইউরো মুদ্রাকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, এটা সত্যি যে শেষ পর্যন্ত অ্যাঙ্গেলা মেরকেলের জন্যই ইউরোজোন টিকে গেছে; কারণ গ্রিস যদি এখান থেকে বেরিয়ে যেত তাহলে ইউরোজোনকে একসঙ্গে রাখা অসম্ভব ছিল। কিন্তু তিনি যে নীতি অনুসরণ করেছেন তা নিয়ে আমার গুরুতর ভিন্নমত থাকলেও ইউরোজোন নিয়ে বা একে রক্ষা করার পর এটাকে নিয়ে কী করতে হবে; তার ব্যাপারে আমার কোনো রূপকল্প ছিল না। তিনি যেভাবে এটাকে রক্ষা করেছেন, তা জার্মানির ভেতরে এবং গ্রিসের ভেতরেও অনেক বিভক্তি সৃষ্টি করেছে। এ সময় গ্রিসের কৃচ্ছ সাধনের কর্মসূচি চাপিয়ে দেয়ার পেছনে জার্মানিরই প্রধান ভূমিকা ছিল এবং এটাই তাদের রক্ষা করেছে। অর্থনৈতিক কৃচ্ছ  বা ব্যয় সংকোচন কর্মসূচি স্পেন আর ইতালির ওপরও চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল এবং তারাও এর সুফল পেয়েছিল।

অ্যাঙ্গেলা মেরকেল যখন ২০১৫ সালের গ্রীষ্মে জার্মানির সীমান্ত খুলে দিয়ে ১০ লাখেরও বেশি শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীকে সেদেশে ঢুকতে দিয়েছিলেনÑতখন তিনি প্রশংসিত ও নিন্দিত দুটোই হয়েছিলেন। জার্মানির মানুষের একাংশ অন্যদের স্বাগত জানানোর সংস্কৃতিকে তুলে ধরার জন্য মিসেস মেরকেলের প্রশংসা করেন। কিন্তু অন্যরা এত অভিবাসীর আগমন দেখে ক্ষিপ্ত হন। তারা দলে দলে যোগ দেন উগ্র-দক্ষিণপন্থি এএফডির সঙ্গে। ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথমবারের মতো ফেডারেল পার্লামেন্টে কোনো উগ্র-দক্ষিণপন্থি দল আসন জিততে সক্ষম হয়। তবে মেরকেলের পদক্ষেপের ফলে মানবাধিকারের রক্ষক হিসেবে ইইউর যে সুনাম ছিল তা পুনরুজ্জীবিত হয়। এতে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও। ২০১৬ সালের শেষ দিকে ওবামার মনে হয়েছিল অ্যাঙ্গেলা মেরকেলের জার্মানিই হতে যাচ্ছে উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু।

তাছাড়া ইউরোপজুড়ে শরণার্থী সংকটে বিশ্ব দেখেছে এক মমতাময়ী মেরকেলকে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বেশিরভাগ দেশ যেখানে শরণার্থী নিতে অনাগ্রহী, সেখানে নিজে শুধু শরণার্থীদের জায়গা দিয়েই সীমাবদ্ধ থাকেননি, মেরকেল বিশ্বব্যাপী শরণার্থী সমস্যার মুখপাত্র হয়ে উঠেছিলেন। তার এই মমতাময়ী আচরণের কারণে জার্মানিতে তাকে অনেকেই ডাকে ‘মমতাময়ী মা’ নামে। তবে রাজনীতিতে আর কূটনীতির ময়দানে তার অসামান্য দক্ষতা তাকে নিয়ে গেছে বিশ্বের সবচেয়ে দক্ষ রাষ্ট্রনেতাদের কাতারে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন জার্মানির শক্ত অবস্থান প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে ফ্রান্স, রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক সুসংহত করেছেন এই নেত্রী। ইউরোপজুড়ে প্রবল অর্থনৈতিক মন্দা আর এর ফলে তৈরি হওয়া ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের কালো থাবা মেরকেল জার্মানের নাগরিকদের ওপর পড়তেই দেননি। বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাবান নারীদের তালিকার প্রথম স্থানটি তার দখলে টানা ছয় বছর ধরে। বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর এই নারী শুধু নারীদের মধ্যেই নয়, ফোর্বসের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের সব ক্ষমতাধর নেতাদের মধ্যেও তিনি তিন নম্বর আছেন। তিনি ২০১৫ সালে টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে জায়গা করে নিয়েছিলেন।

বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর এই নারী খুবই সাধারণ ও সাদামাটা জীবনযাপনে অভ্যস্ত। তিনি নিজেই সুপার মার্কেটে বাজার করেন, নাপিতের দোকানে অন্যদের পাশে বসে অপেক্ষা করেন, এমনকি সরকারি ভবন নয়, নিজের বাড়িতে থাকাই তার পছন্দ। অ্যাঙ্গেলা মেরকেল অন্যান্য রাজনীতিকদের মতো বিলাসিতা একদম পছন্দ করেন না। বরং সাধারণ জীবনযাপনেই তিনি বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তাই স্বামীকে নিয়ে তিনি যতটা সম্ভব সেভাবেই চলার চেষ্টা করেন। তিনি চ্যান্সেলর হওয়ার আগেও যেভাবে সেলুনে বসে অন্যদের সঙ্গে চুল কাটতেন, এখনও তাই করেন। তাকে কোনো বিশেষ ছাড়ও দেয়া হয় না।

২০১১ সালের ৪ নভেম্বর জার্মান উগ্র ডানপন্থি দল এনএসইউ’র কর্মকাণ্ড ধরা পড়ার পর চ্যান্সেলর আঙ্গেলা মেরকেল এদের বিরুদ্ধে চিরুনি তদন্ত চালানোর প্রতিশ্রুতি দেন। তারা নয়, অভিবাসী ও এক জার্মান নারী পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যা করে। তাদের বোমা হামলা থেকে অনেকে প্রাণে বেঁচে গেলেও শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ২০১৮ সালে ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট আন্ডারগ্রাউন্ড (এনএসইউ) নামের সন্ত্রাসী দলটির একমাত্র জীবিত সদস্য বিয়াটে শেপেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অন্যান্য দণ্ড দেয়া হয়। এরকম অনেক উগ্রবাদীকে তিনি কঠোরভাবে দমন করেন।

টাইম ম্যাগাজিন অ্যাঙ্গেলা মেরকেলকে ২০১৫ সালে ‘সেরা ব্যক্তিত্ব’ নির্বাচিত করেছে এবং অভিবাসন সংকট ও ঋণ সমস্যা মোকাবিলায় তার নেতৃত্বের ব্যাপক প্রশংসা করে। টাইম সম্পাদক ন্যান্সি গিবস বলেন, ‘অ্যাঙ্গেলা মেরকেল নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে যেভাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন, আজকের দুনিয়ায় তা সত্যিই বিরল।’ স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে তার কঠোর অবস্থান এবং নৈতিকতাকে ভিত্তি করে নেতৃত্ব দেয়া তার একটি বিরল গুণ। এ জন্যই তিনি সেরা ব্যক্তিত্ব। জাতিসংঘও মেরকেলের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির ভূয়সী প্রশংসা করেছে। বিশ্বখ্যাত ‘ফোর্বস’ সাময়িকীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারীদের তালিকার শীর্ষে তার নাম চারবার উঠে আসে।

দায়িত্ব ছাড়ার পর তিনি কী করবেন, গত কয়েক মেরকেলকে এই প্রশ্নটি অনেকবার শুনতে হয়েছে। গত জুলাইতে যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় তাকে আবারও এই প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, প্রথমে একটা ‘ব্রেক’ নেবেন এবং কোনো ধরনের আমন্ত্রণ গ্রহণ করবেন না। তার একটা সুন্দর বিশ্রাম দরকার এবং সময় পেলে প্রাণভরে ঘুমাবেন ও অবসরে ভালো ভালো বই পড়বেন। তার কাজগুলো ‘এখন অন্যজন সামলাবে’এটা তাকে মেনে নিতে হবে বলে জানিয়ে মেরকেল বলেন, ‘আমার মনে হয় এটা আমার খুবই ভালো লাগবে।’ স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছেড়ে অবসর নেয়ার কারণেও ইউরোপের রানি খ্যাত এ নারী ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

ব্যাংক কর্মকর্তা ও মুক্ত কলাম

[email protected]