প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানি হচ্ছে শ্রীপুরের কাঁঠাল

আব্দুল খালেক, শ্রীপুর (গাজীপুর): গাজীপুরকে বলা হয় কাঁঠালের রাজধানী। স্বাদ, মিষ্টি, ঘ্রাণ ও আকারের দিক থেকে এ জেলার কাঁঠালের খ্যাতি রয়েছে দেশ-বিদেশে। বলা যায়, ধানের পর এটি এ জেলার প্রধান অর্থকরী ফসল। কাঁঠাল উৎপাদনে জেলায় শ্রীপুর প্রথম। গাজীপুরের শ্রীপুরে প্রতিটি বাড়িতে এখন পাকা কাঁঠালের মিষ্টি ঘ্রাণ। এ কাঁঠাল বিক্রির হাট শ্রীপুরের জৈনাবাজার। এটিই দেশের সর্ববৃহৎ কাঁঠালের হাট। তাই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন পাইকাররা আসেন কাঁঠাল কিনতে এ বাজারে। দেশের বিভিন্ন শহরের পাশাপাশি এখানকার কাঁঠাল রপ্তানি হচ্ছে বিদেশেও।

শ্রীপুর উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, প্রতিবছর এই অঞ্চলে গড়ে প্রায় ৭৮ হাজার মেট্রিক টন কাঁঠাল উৎপাদিত হয়। খাজা, গালা ও দুরসাÑএ তিন জাতের কাঁঠাল এখানে উৎপাদিত হয় প্রচুর পরিমাণে। এ বছর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে ‘খাজা’ জাতের কাঁঠাল রপ্তানি করা হয়েছে।

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক-সংলগ্ন জৈনাবাজার। প্রতিবছরের মতো এবারও বাজারে জমে উঠেছে কাঁঠালের হাট। সপ্তাহের প্রায় প্রতিদিন বিক্রেতারা বাইসাইকেল, অটো, ঘোড়ার গাড়ি, রিকশাভ্যান ও ট্রাক রিজার্ভ করে কাঁঠালসহ অন্য মৌসুমি ফল আনেন এ হাটে বিক্রি করার জন্য। এ বাজার থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার কাঁঠাল চলে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলার বাজারে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পশ্চিম পাশে বিশাল জায়গাজুড়ে কাঁঠালের পাইকারি বাজার বসেছে। বাজারে বড় বড় আড়তদারের কাছ থেকে পাইকারি দরে কাঁঠাল কিনে সেগুলো ট্রাকে তুলছেন ক্রেতারা।

অপর দিকে সড়কের পাশে শত শত ভ্যানগাড়িতে কাঁঠাল ভর্তি করে বিক্রির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন ছোট ব্যবসায়ীরা। তারা মূলত স্থানীয় পাইকার। একেকটি ভ্যানগাড়িতে মাঝারি আকারের ২০ থেকে ৫০টি কাঁঠাল ধরে। বড় পাইকাররা ভ্যানগাড়িতে থাকা কাঁঠালগুলোর আনুমানিক মূল্য নির্ধারণ করে দর কষাকষি করছেন। তবে ক্রেতাদের অভিযোগ, অতিরিক্ত খাজনা দিতে হয় তাদের। প্রতি কাঁঠালে লেবার খরচসহ ছয় টাকা নেন ইজারাদার।

নোয়াখালী থেকে কাঁঠাল কিনতে এসেছেন হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘৪০ বছর ধরে এ হাট থেকে কাঁঠাল নিই আমি। আমি একজন ব্যবসায়ী, দেশের বিভিন্ন হাট থেকে কাঁঠাল কিনে থাকি। কিন্তু গাজীপুরের কাঁঠাল বেশি সুস্বাদু এবং চাহিদা বেশি। এটিই দেশের সবচেয়ে বড় কাঁঠালের হাট। এখানে কাঁঠালের দামও কম, কিন্তু খাজনা, লেবার ও পরিবহন খরচ মিলিয়ে দাম বেড়ে যায়।’

উপজেলার গ্রামের এলাকার বাসিন্দা জহির বলেন, আমাদের প্রত্যেকের বাড়িতে কাঁঠাল গাছ আছে। এ কাঁঠাল গাছ আমরা কিনে ফেলি। পরে গাছের কাঁঠাল হাটে এনে পাইকারি দরে বিক্রি করি।

স্থানীয় আড়তদার মোফাজ্জল সরকার বলেন, গত দুই বছরের তুলনায় এবার কাঁঠালের বেচাকেনা ভালো জমে উঠেছে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা পাইকাররাও খুব খুশি।

চাঁদপুর থেকে কাঁঠাল কিনতে আসা ব্যবসায়ী আলম মিয়া বলেন, ‘প্রতি সপ্তাহে দুদিন আসি কাঁঠাল কিনতে। এখানকার কাঁঠাল সবচেয়ে ভালো, চাহিদাও বেশি। এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৫০০টি কাঁঠাল কিনে ট্রাকে করে নিয়ে যাই। এখানকার কাঁঠালের দাম সাইজ অনুযায়ী ১০ টাকা থেকে শুরু করে ৩০০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে।’

জৈনাবাজারের আড়তদার নাঈম বলেন, ‘কাঁঠালের এ পাইকারি বাজারকে কেন্দ্র করে চার মাস ধরে ২০০ থেকে ২৫০ মানুষের কর্মসংস্থান হয়। কাঁঠাল ওঠানো-নামানোর কাজ করেন তারা। এ হাটের সুনাম সারাদেশে। এজন্য দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে কাঁঠাল কিনতে এখানে ছুটে আসেন ক্রেতারা।’

জৈনাবাজারের ব্যবসায়ী মোজাম্মেল হক বলেন, আমি ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি আমাদের এ বাজারে নোয়াখালী, চিটাগং, ফেনী, চাঁদপুর, সিলেট, বরিশালসহ বিভিন্ন জেলা থেকে কাঁঠালের জন্য পাইকাররা আসেন। কম দামে ভালো মানের কাঁঠাল পাওয়া যায় এই ঐতিহ্যবাহী আমাদের জৈনাবাজারে।

শ্রীপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এএসএম মূয়ীদুল হাসান বলেন, এ বছর প্রচুর কাঁঠাল বিক্রি হচ্ছে। সরকারি উদ্যোগে শ্রীপুরের কাঁঠাল বিদেশেও পাঠানো হচ্ছে। তিনি জানান, প্রতিদিন জৈনাবাজার থেকে পাইকারদের হাত হয়ে শ্রীপুরের কাঁঠাল যাচ্ছে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্তে।