আজকের পত্রিকা পুঁজিবাজার মত-বিশ্লেষণ

ইচ্ছা করে খেলাপিদের টাকা আদায়ে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিন

ইচ্ছা করে যারা ঋণখেলাপি হয়েছেন, তাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করার বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রীর কাছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সাবেক সভাপতি মো. রকিবুর রহমান।

মাননীয় অর্থমন্ত্রী, এখনই আপনাকে এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে আসতে হবে। যারা ইচ্ছা করে ঋণখেলাপি হয়েছেন, যারা ব্যাংকের টাকা লুট করেছেন, জনগণের টাকা লুট করেছেন—তাদের বিরুদ্ধে দেউলিয়া আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে হবে এবং তাদের লাইফস্টাইলে হাত দিতে হবে।

মাননীয় অর্থমন্ত্রী, আপনি সরকারিভাবে একটি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি করে সেই কোম্পানির মাধ্যমে তাদের সব সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে বাজারে বিক্রি করে টাকা আদায়ের যে পরিকল্পনা করেছেন, আমি মনে করি তা সফল হওয়ার নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ার মধ্যে পড়ে যাবে।  

এর ফলে তারা ঋণ পরিশোধ না করার সুযোগ পেয়ে যাবে। তার চেয়ে বড় কথা হলো তারা যে জমি বন্ধক রেখেছেন, যার বাজারমূল্য পাঁচ কোটি টাকা, সেটা তারা দেখিয়েছেন ২০০ কোটি থেকে ৩০০ কোটি টাকা। এর সঙ্গে তারা যে পার্সোনাল গ্যারান্টি দিয়েছেন, বা করপোরেট গ্যারান্টি দিয়েছেন, তার কোনো মূল্য নেই। তাদের বন্ধকি জমি বিক্রি করতে গেলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখবেন, এই জমিগুলো আরও অনেক জায়গায় বন্ধক দেওয়া আছে।

অতএব মাননীয় অর্থমন্ত্রী, মহান পার্লামেন্টে আপনি বলেছেন, এক ব্যাংকের পরিচালকের সঙ্গে অন্য ব্যাংকের পরিচালকের যোগসাজশে এবং অনুগত এমডি ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সহায়তায় তারা গ্রাহকের টাকা নিজের নামে-বেনামে বা আত্মীয়স্বজনের নামে আত্মসাৎ করে বিদেশে শত শত কোটি টাকা পাচার করেছেন এবং বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন। কানাডা, দুবাই ও সিঙ্গাপুরে তারা বিশাল সম্পদ গড়ে তুলেছেন।

মাননীয় অর্থমন্ত্রী, ব্যাংক পরিচালকরা যারা ইচ্ছা করে টাকা ফেরত দিচ্ছেন না, তাদের ব্যাংকের পরিচালক থাকার অধিকার নেই। তাদের খুঁজে বের করতে হবে, মাননীয় অর্থমন্ত্রী। ব্যাংকের প্রকৃত মালিক হলেন হাজার হাজার শেয়ারহোল্ডার, তাদের স্বার্থ আপনাকে দেখতে হবে।

ব্যাংক পরিচালকদের সর্বোচ্চ শেয়ারসংখ্যা হলো মাত্র ৩০ শতাংশ, ক্ষেত্রবিশেষে ৩৫ শতাংশ, কিন্তু প্রকৃত বিনিয়োগকারী যারা তারা ৭০ শতাংশেরও বেশি শেয়ার ধারণ করেন। যারা ইচ্ছা করে ঋণখেলাপি হয়েছেন, তাদের ছেড়ে দেওয়া যায় না, মাননীয় অর্থমন্ত্রী। আপনাকে কঠোর হতে হবে। আপনি অত্যন্ত অভিজ্ঞ এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যার বিশেষ স্নেহভাজন ও অনুগত ব্যক্তি। তিনি আপনার ওপর আস্থা রেখেছেন।

মাননীয় অর্থমন্ত্রী, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ দেউলিয়া আইনের কঠোর প্রয়োগ করে এ ধরনের ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে সফলতার সঙ্গে ঋণ আদায় করেছে। দেউলিয়া আইনের কঠোর প্রয়োগ বলতে বোঝায়, যারা ইচ্ছা করে জনগণের টাকা লুটপাট করেছেন, তাদের লাইফস্টাইলে হাত দিতে হবে।

যেমন চীনে যারা দেউলিয়া আইনের আওতায় পড়েছেন, তাদের গাড়ি-বাড়ি থাকবে না, তাদের সন্তানেরা দামি স্কুলে পড়ালেখা করতে পারবে না, প্লেনে চড়তে পারবে না, এমনকি বুলেট ট্রেনেও চড়তে পারবে না। এই আইনের কঠোর প্রয়োগের ফলে তিন বছরের মধ্যে এ ধরনের ৮০ শতাংশ ঋণখেলাপির কাছ থেকে টাকা আদায় করা সম্ভব হয়েছে। একইভাবে মালয়েশিয়া, কোরিয়া, থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইন সরকারও দেউলিয়া আইনের কঠোর প্রয়োগ করে এ ধরনের ঋণখেলাপির কাছ থেকে টাকা আদায় করতে সক্ষম হয়েছে।

অন্যদিকে ভারতের অর্থমন্ত্রী নিরমলা সিতারাম এক বছর আগে একই পদ্ধতিতে দেউলিয়া আইনের কঠোর প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং আইন প্রয়োগ করতে শুরু করেছেন। তাতে তিনি বড় ধরনের সাফল্য পেয়েছেন এবং প্রায় দুই লাখ কোটি টাকার ওপর আদায় করতে সক্ষম হয়েছেন। কারণ কেউই নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করতে চান না।

মাননীয় অর্থমন্ত্রী, যখন অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তখন অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে এ ধরনের প্রত্যেক ঋণখেলাপির কাছ থেকে দুই শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে একটি বড় ধরনের রিশিডিউল করে তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো চালু করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু আমরা বাস্তবে কী দেখলাম—মাত্র অল্পসংখ্যক ঋণখেলাপি ডাউন পেমেন্ট দিয়ে তাদের খেলাপি ঋণ রিশিডিউল করেছেন। ইন্টারেস্টিং বিষয় হলো তারা তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো রি-অরগানাইজ করে চালু করার জন্য ব্যাংকের কাছে টাকা চেয়েছেন।

আমার প্রশ্ন, যেসব প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর বন্ধ হয়ে আছে, তারা যেসব পণ্য উৎপাদন করত অথবা ব্যবসা করত, তাদের পক্ষে কি এখন সম্ভব নতুন করে ইন্ডাস্ট্রি চালু করে বর্তমানে যারা ব্যবসা করে অনেক এগিয়ে আছে তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা? যারা ইচ্ছা করে ঋণখেলাপি হয়েছিলেন, তাদের কোনো পরিকল্পনা ছিল না, তাদের কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না, তাদের কোনো অনেস্টি ছিল না।

ব্যাংক ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের দুর্বল মনিটরিংয়ের সুযোগ নিয়ে নিজস্ব ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সহযোগিতায় এবং বিভিন্ন সরকারি ব্যাংকগুলোর সরকার মনোনীত পরিচালক ও ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় তারা ব্যাংক ও জনগণের অর্থ লুটপাট করেছেন। মাননীয় অর্থমন্ত্রী, তারা জেলে যেতে প্রস্তুত, কিন্তু টাকা ফেরত দেওয়ার ইচ্ছা তাদের একেবারেই নেই। অতএব তাদের বিরুদ্ধে বাস্তবসম্মত আইন প্রয়োগ করে টাকা আদায়ের জন্য অনুরোধ করছি।

অন্যদিকে যেসব শিল্পপতি বিশেষ করে যাদের পুঁজিবাজারে লিস্টেড কোম্পানি আছে, ওই কোম্পানিগুলোয় হাজার হাজার শ্রমিক কাজ করে এবং সেই কোম্পানিগুলোয় হাজার হাজার বিনিয়োগকারী বিনিয়োগ করেছেন। ওই প্রতিষ্ঠানের শিল্পোদ্যোক্তারা উচ্চ সুদের কারণে অথবা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে যদি ঋণখেলাপি হয়ে পড়েন, তাদের প্রতি আপনাকে সদয় হতে হবে।

কীভাবে তাদের সহযোগিতা করা যায়, তাদের ইন্ডাস্ট্রি চালিয়ে রাখা যায়, সে ব্যাপারে আপনাকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কোনো অবস্থাতেই যাতে এই প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ না হয়ে যায়, সে ব্যবস্থাও আপনাকে নিতে হবে। কোনো শ্রমিক যাতে চাকরি না হারায়, কোনো বিনিয়োগকারী যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে দিকটা দেখে অনিচ্ছাকৃতভাবে যারা ঋণখেলাপি হয়েছেন, তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন। দেশ ও জাতি আপনার দিকে তাকিয়ে আছে।

করোনাভাইরাসের কারণে অর্থনীতি বিপদগ্রস্ত। সব শিল্পপতি তাদের ইন্ডাস্ট্রি একপ্রকার বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন। এর ফলে উৎপাদনও বন্ধ। এসব উদ্যোক্তা ও শিল্পপতি সব সময় ব্যাংকের টাকা সময়মতো পরিশোধ করেছেন। তাদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা আর্থিক প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা এসব সফল শিল্পপতি এবং তাদের শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে বাঁচিয়ে রাখতে চান। যারা নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করেন না, তারা যদি এ সুযোগে মিথ্যা তথ্য দিয়ে ব্যাংকের টাকা পেয়ে যান, তাহলে তা হবে জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক। মাননীয় অর্থমন্ত্রী, যারা নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করেননি, তারা যেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যার এই অর্থ সহযোগিতা না পান, সেদিকে সব সময় খেয়াল রাখতে হবে। 

আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আপনার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে কারও প্রতি অনুরাগ-বিরাগের বশবর্তী না হয়ে কঠোরভাবে দেউলিয়া আইন প্রয়োগ করে ইচ্ছাকৃতভাবে যারা ঋণখেলাপি হয়েছেন, তাদের লাইফস্টাইলে হাত দিয়ে টাকা আদায় করতে সক্ষম হবেন। আপনার ওপর আস্থা রেখে আপনার সফলতা কামনা করছি।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..