মত-বিশ্লেষণ

ইনসেনটিভ বোনাসের জন্য ব্যাংককর্মীদের আন্দোলন কেন?

মোশারফ হোসেন: গত ২৮ জুলাই একটি বিজনেস নিউজ পোর্টালের একটি সংবাদের শিরোনাম ছিল ‘বোনাসের দাবিতে জনতা ব্যাংক উত্তাল’। পরদিন একটি জাতীয় দৈনিকেও সংবাদ হয়েছে এটি। নিজে ব্যাংকার হওয়ায় সুবাদে ‘বোনাস’, ‘ইনসেনটিভ’ শব্দগুলো শুনলে সব সময়ই পুলকিত বোধ করি। তাই একটু বাড়তি আগ্রহ নিয়েই সংবাদটি পড়েছি। পড়া শেষে কিছুটা শঙ্কিত বোধ করলাম। দুশ্চিন্তা হলো, পোশাক খাতের শ্রমিকদের মতো ব্যাংককর্মীদেরও কি বোনাস পাওয়া-না পাওয়ার দোলাচলে দিনাতিপাতের সময় আসন্ন? পরক্ষণেই নিজেকে আশ্বস্ত করলাম, ব্যাংককর্মীদের ক্ষেত্রে হয়তো এমন ঘটবে না এ পেশার সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্বীকৃতি, মর্যাদাগত অবস্থান, বিশেষত্ব ও গুরুত্বের কারণেই। তবে কিছু একটা অনুমান করলাম। তা হচ্ছে, বেসরকারি ব্যাংককর্মীদের মতো সরকারি ব্যাংককর্মীদেরও হয়তো আর্থিক সুবিধায় লাগাম টানা হচ্ছে। তবে লাগাম টানাই যদি হবে, কেন এই লাগাম? আর এটা যদি লাগাম না-ই হয়ে থাকে, তাহলে ২০১৮ সালের পারফরম্যান্সভিত্তিক ইনসেনটিভ বোনাস ছাড় করতে ২০১৯ সালের সাত মাস পেরিয়ে যাবে কেন? ২০১৮ সাল শেষে ২০১৯ সালের বিজনেস টার্গেট নির্ধারণে এবং সেটি সংশ্লিষ্ট শাখাগুলোয় বণ্টন করে দেওয়ার ক্ষেত্রে নিশ্চয় জানুয়ারি মাস পার হয়নি। তাহলে নতুন বছরের লক্ষ্য অর্জনে কর্মীদের কর্মোদ্দীপনা বাড়াতে প্রত্যাশিত ইনসেনটিভ বোনাস ছাড় করতে এত বিলম্ব কেন?
ইনসেনটিভ বোনাসের প্রচলিত বাংলা অর্থ ‘উৎসাহ বোনাস’। কর্মীদের কর্মোদ্যোগ ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি দায়িত্ব ও দরদ বাড়ানোই হচ্ছে এই বোনাসের উদ্দেশ্য। এছাড়া আউটপারফরমিং কর্মীদের কর্মের স্বীকৃতিস্বরূপও এই প্রণোদনা দেওয়া হয়। এতে একজন কর্মী নিজেকে মূল্যায়িত এবং প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ মনে করেন। এই স্বীকৃতি ও আর্থিক পুরস্কারের ফলে কর্মী নিজেকে পুরস্কৃত ও সম্মানিত বোধ করেন, ফলে প্রতিষ্ঠানের জন্য বাড়তি উৎসাহ ও উদ্দীপনা নিয়ে কাজ করেন। তাই একজন কর্মী এক দিন আগে উৎসাহিত হওয়ার অর্থ হচ্ছে, এক দিন আগে থেকেই তার উৎপাদনশীলতা (প্রডাক্টিভিটি) বেড়ে যাওয়া। আর এক্ষেত্রে বিলম্ব করা মানে কর্মীর কর্মস্পৃহা হ্রাস করা; পরিণামে প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক অর্জনে ভাটা পড়া। এ কথাগুলো আমার নিজের নয়। ব্যবস্থাপনা ও প্রেষণা তত্ত্বের অনেক বড় বিশারদরাই এসব তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় বড় ডিগ্রি প্রদানেও পড়ানো হয় এসব তত্ত্ব। ডগলাস ম্যাকগ্রেগর তার ব্যবস্থাপনার ‘ওয়াই তত্ত্বে’ কর্মী প্রেষণার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন। বিশ্বের নামিদামি প্রতিষ্ঠানগুলোতে চর্চা করা হয় এই তত্ত্ব। আমাদের দেশের ব্যাংকগুলোও ম্যাকগ্রেগরের ‘ওয়াই তত্ত্ব’ মতেই পরিচালিত হয় বলেই আমরা বিশ্বাস করি। কিন্তু ‘ওয়াই তত্ত্ব’ মতেই যদি চলে, তাহলে ইনসেনটিভ বোনাস আদায়ে ব্যাংককর্মীদের আন্দোলন করতে হবে কেন?
বেতন-ভাতা ছাড়াও একটি প্রতিষ্ঠানকে নানাধর্মী ব্যয় করতে হয়, যার স্বল্পকালীন প্রত্যক্ষ সুফল না মিললেও দীর্ঘমেয়াদে পরোক্ষ সুফল মিলে। সিএসআর তেমনি একটি খরচ, যা প্রতিষ্ঠানের বাহ্যিক ইমেজ, পাবলিসিটি ও পজিশনিংয়ের উন্নয়ন ঘটায়। প্রতিষ্ঠানের এই খরচে কর্মীদের কোনো আর্থিক অর্জন যদিও নেই, এটি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের গর্বিত করে। ইনসেনটিভ বোনাসও বেতন-ভাতাবহির্ভূত আরেকটি খরচ, যা কর্মীদের বাড়তি আর্থিক সুবিধা এনে দেয়। এই বোনাস প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ইমেজ ও পজিশনিং সুদৃঢ় করে। এই খরচ প্রতিষ্ঠানকে ‘কর্মিবান্ধব’ স্বীকৃতি এনে দেয়। বৈপরীত্যে প্রতিষ্ঠান কর্তৃক কর্মিবঞ্চনা প্রতিষ্ঠানকে কর্মীদের মাঝে সংকীর্ণ ও অন্যায়পরায়ণ করে উপস্থাপন করে। এ বঞ্চনার ফলে কর্মীদের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের দূরত্ব তৈরি হয়। কর্মীদের কাছ থেকে প্রতিষ্ঠানের প্রচার কমে আসে; আর প্রচার করলেও সুনামের বদলে দুর্নামই প্রচার করে। এমন প্রতিষ্ঠানের কর্ম ছেড়ে দিতে কর্মীরা ব্যাকুল থাকে, ফলে টার্নওভারের হার অনেক বেশি হয়। একইভাবে কর্মদুর্নামের কারণে নতুন কেউ এই প্রতিষ্ঠানে কর্মগ্রহণ করতে চায় না। মূলত কর্মীরাই হচ্ছে প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় প্রচারক, সবচেয়ে বড় দূত। তবে এ অ্যাম্বাসেডররা মানসিক বা আর্থিকভাবে পীড়িত থাকলে তাদের দ্বারা যথাযথভাবে প্রচার কার্যক্রম আশা করা যায় না। কারণ কোনো কর্মী যদি তার নিজের ভারই বহন করতে না পারে, তাহলে সে প্রতিষ্ঠানের ভারও ধারণ করতে পারবে না। এই সত্যগুলো আমার মতো নগণ্য একজন ব্যাংকার বিশ্বাস করলেও যারা ব্যাংকের কর্ণধার তারা কি বিশ্বাস করেন না? নিশ্চয়ই করেন। তাহলে ইনসেনটিভ বোনাস আদায় করতে কর্মীদের আন্দোলনে যেতে হচ্ছে কেন? এটা কি জোরজবরদস্তির বিষয়, নাকি কর্মীদের পারফরম্যান্স মূল্যায়নে প্রতিষ্ঠানের স্বপ্রণোদিত হয়েই দেওয়ার কথা?
তবে এটিও সত্য যে, ইনসেনটিভ বোনাস প্রদানে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সামর্থ্য জড়িত। তাহলে কি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকটির আর্থিক সামর্থ্য আগের বছরের চেয়ে কমে গেছে? কিন্তু পত্রিকার খবর তো বলছে ভিন্ন কথা। ইনসেনটিভ বোনাস প্রদানের জন্য ২০১৮ সালের অপারেটিং প্রফিটের একটি অংশ প্রভিশন হিসেবে ইতোমধ্যে রিজার্ভে রাখা আছে। আর আর্থিক সামর্থ্যে ভাটা পড়েছে বললেও তো যুক্তি দিয়ে তা মানানো কঠিন। কারণ আমাদের বাংলাদেশ গত বছরের মার্চেই প্রাথমিকভাবে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার তালিকায় স্থান পেয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবমতে, ২০১৮-১৯ অর্থবছর শেষে আমাদের মাথাপিছু আয় বেড়ে এক হাজার ৯০৯ ডলার এখন। ২০৩০ সালে এই মাথাপিছু আয়ে আমরা ভারতের মতো বৃহৎ অর্থনীতির দেশকেও ছাড়িয়ে যাব। ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় হবে পাঁচ হাজার ৭০০ মার্কিন ডলার! তাছাড়া বর্তমান সরকারের ভিশনমতে, ২০৪১ সালে আমরা উন্নত দেশে উন্নীত হব। আর উন্নত দেশে উন্নীত হওয়া মানে হচ্ছে, মাথাপিছু আয় কমপক্ষে ১২ হাজার ৪৭৬ ডলার হওয়া, টাকার অঙ্কে যা প্রায় ১১ লাখ টাকা। অর্থাৎ বর্তমান মাথাপিছু আয় বেড়ে প্রায় সাড়ে ছয়গুণ হতে হবে তখন। মাথাপিছু আয় বাড়ার অর্থ হচ্ছে, জাতীয় আয় বৃদ্ধি পাওয়া। আর এই জাতীয় আয় হিসাবায়নে ব্যাংককর্মীরাও অন্তর্ভুক্ত নিশ্চয়। প্রতি বছরই যেখানে আমাদের জাতীয় আয় বাড়ছে, সেখানে অনেক বাণিজ্যিক ব্যাংকে বর্তমান বছরে এবং নিকট অতীত বছরে ইনসেনটিভ বোনাস না দেওয়াটা কি জাতীয় ও মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পাওয়া নির্দেশ করে? আর যদি ব্যাংককর্মীদের আয়ও জাতীয় আয়েরই অংশ হয়, তাহলে ব্যাংককর্মীদের বেতন-ভাতা কমিয়ে জাতীয় আয় বাড়ছে কীভাবে? হ্যাঁ, ব্যাংককর্মীদের আয় কমা সত্ত্বেও জাতীয় আয় বাড়তে পারে। তবে কমন সেন্স কী বলে? দেশের সব নাগরিকের অর্থনীতি এক পথে এগুচ্ছে, আর ব্যাংককর্মীদের অর্থনীতি আরেক পথে?
অনেক পেশাজীবীর সঙ্গেই ব্যাংককর্মীদের অর্থনীতি মেলে না এখন। তাই এক ব্যাংকারকে বলতে শুনেছি, মাসের ২০ তারিখের মধ্যেই হাত খালি হয়ে যায়, বড় টানাটানিতে মাস শেষ করতে হয়। টাই-স্যুট পরে চাইলেই কারও কাছে হাত পাতা যায় না, আর হাত পাতলেও বিশ্বাস করানো যায় না। উল্টো প্রতি মাসেই টাকা ধার চেয়ে একাধিক জনের ফোন আসে। যদি পার্ট-টাইম কিছু একটা করতে পারতাম, তাহলেও হয়তো কোনো রকমে চালিয়ে নিতে পারতাম, কিন্তু ড্রাইভিং পারি না বলে পার্ট-টাইম উবার-পাঠাও চালাতে পারছি না। ব্যাংকার সহকর্মীর এ হতাশাব্যঞ্জক বাণীটি একান্তই তার ব্যক্তিগত হলেও ব্যাংক খাতের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কর্মীদের জন্য কোনো সুখবর জানান দেয় না। আর এটাও সত্যি, বর্তমানে অনেক উবার-পাঠাও চালকের আয়ও অনেক প্রথম শ্রেণির ব্যাংকারদের চেয়ে বেশি। অর্থের কারবারি যারা, তাদের অর্থনীতি মন্দায় থাকলে জাতীয় অর্থনীতি চাঙা হবে কেমন করে? এ বিষয়টি বুঝতে যত দ্রুত সবার বোধোদয় হবে, সার্বিক অর্থনীতির মঙ্গল ততটাই সন্নিকটে হবে।
ইনসেনটিভ বোনাস কোনো উটকো বিষয় নয়। এটি একজন চাকরিজীবীর স্বাভাবিক অধিকার। তবে হ্যাঁ, এখানে প্রতিষ্ঠানেরও দেওয়া-না দেওয়ার সুযোগ আছে এক. প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনায়, এবং দুই. কর্মীর পারফরম্যান্স বিবেচনায়। তবে একটি প্রতিষ্ঠানে সব কর্মীই যেমন আউট-পারফরমিং নয়, ঠিক তেমনই সবাই নন-পারফরমিংও নয়। তাই আয়ের উদ্বৃত্ত থাকলে ইনসেনটিভ বোনাস সব কর্মীরই পাওয়া উচিত। এতে প্রতিষ্ঠানের প্রতি কর্মীর কৃতজ্ঞতা বাড়ে এবং তিনি অনুভব করেন যে, তিনি আয় ও সম্পদে বৃহৎ একটি প্রতিষ্ঠানের অংশ। তাই আয়ের অতি-উদ্বৃত্তি না থাকলেও পারফরমিং কর্মীর যোগ্য পারফরম্যান্সকে স্বীকৃতি ও মূল্যায়নে অবশ্যই এই ইনসেনটিভ বোনাস চালু রাখা উচিত। এতে ভালো কর্মীরা আরও উদ্যমী হবে এবং পিছিয়ে পড়া ও ফাঁকিবাজ কর্মীদের মাঝেও নিজের পারফরম্যান্সকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রয়াস ও উৎকৃষ্ট কর্মীদের জায়গায় নিজেকে নিয়ে যেতে একটি সুস্থ প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হবে।
তবে কর্মীদের পারফরম্যান্স মূল্যায়নে ব্যাংককে মানবিক ও যৌক্তিক হতে হবে। ২০১৮ সালের পারফরম্যান্সভিত্তিক ইনসেনটিভ বোনাস ডিসবার্স করার প্রিকন্ডিশন হিসেবে ২০১৯ সালের জুনের পারফরম্যান্স বিচার্য হতে পারে না। কিন্তু বর্তমানে কর্মীদের বোনাস না দেওয়ার অজুহাতে কিংবা বোনাস প্রথা বিলুপ্ত করে দেওয়ার জন্য এমন শর্তও আরোপ করা হচ্ছে কোনো কোনো ব্যাংকে। আবার যে ক্যাশ কর্মকর্তাটি সারা দিন গ্রাহকদের টাকা রিসিভ আর পেমেন্ট করতে ব্যতিব্যস্ত, তার পারফরম্যান্স মূল্যায়নে তার রিসিভ বা পেমেন্ট ভাউচার সংখ্যা বা টাকার অঙ্ক বিবেচনা না করে কত টাকার আমানত আনতে পেরেছেন, সেটা বিবেচ্য হওয়া উচিত নয়। একইভাবে যে কর্মকর্তা সারা দিন নতুন গ্রাহকদের হিসাব খুলতে খুলতে ক্লান্ত, তার পারফরম্যান্স মূল্যায়নে তিনি কতটা ঋণ গ্রাহক ম্যানেজ করতে পেরেছেন, তা হওয়া অনুচিত। যে কর্মকর্তা সারাদিন ফরেন রেমিট্যান্স প্রদান করে সঠিক সময়ে লাঞ্চ করতেই পারেন না, ঠিকাদারদের শত শত পে-অর্ডার ইস্যু করে যার প্রাণ ওষ্ঠাগত তার পারফরম্যান্স মূল্যায়নে তিনি কতটি ক্রেডিট কার্ড সেল করেছেন, সে হিসাব করা কতটা যুক্তিসংগত? আবার যে ক্রেডিট অফিসার সারা দিন ঋণ প্রস্তাব তৈরি, পুরোনো ঋণ নবায়ন, ঋণের কিস্তি আদায়, খেলাপি ঋণের তাগাদায় ডিফল্টার গ্রাহকের পেছনে দৌড়ে ঘর্মাক্ত তার পারফরম্যান্স মূল্যায়ন হবে কি মাসে তিনি কয়টা আমানত হিসাব খুলতে পেরেছেন, তার ভিত্তিতে? কিন্তু বাস্তবে হচ্ছেও তো তা-ই। তাই ইনসেনটিভ বোনাস পাওয়ার সমীকরণ এখন অনেক কঠিন হয়ে গেছে। যারা পাচ্ছেন তাদের পারফরম্যান্স মূল্যায়নের অপ্রাসঙ্গিক এসব চলকের কারণে কাক্সিক্ষত বোনাস পাওয়াটা এখন আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মতোই হয়ে গেছে।
একজন ফায়ারফাইটার যেভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অগ্নিনির্বাপণ করেন এবং অগ্নিঝুঁকিতে পড়া মানুষকে উদ্ধার করেন, তা অনেক বড় ও মহৎ কর্ম। এমন কর্মের বড়ত্বের সঙ্গে ব্যাংকিংয়ের তুলনা চলে না। তবুও একজন সরকারি ব্যাংকার সারা দিন গড়ে যে কাজ করেন, সরকারি ফায়ার স্টেশনের একজন কর্মকর্তাও কি তার কর্মে সেই একই পরিমাণ শ্রম ও সময় ব্যয় করেন? একজন ফায়ারফাইটার দিনে কয়জন ভিকটিমকে সেবা প্রদান করেন, আর একজন সরকারি ব্যাংকার দিনে কয়জন গ্রাহককে সেবা প্রদান করেন? সরকারি ব্যাংকে সেবাপ্রত্যাশী মানুষের যে দীর্ঘ সারি দৃশ্যমান হয়, এ রকম সেবাপ্রত্যাশী মানুষের সারি আর অন্য কয়টি অফিসে দেখা যায়? বেসরকারি ব্যাংকের মতো প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ না থাকা সত্ত্বেও সরকারি ব্যাংকাররা এমন কোটি কোটি গ্রাহককে ল্যাভারাস সেবা প্রদান করে যাচ্ছে। আমি কোনো সরকারি কর্মকর্তা কিংবা সরকারি কর্মকে ছোট করার জন্য বলছি না, তবে আমার মতে কাজের ভলিউম ও প্রকৃতি বিবেচনায় সরকারি ব্যাংকারদের অবশ্যই একটু ভিন্নভাবেই মূল্যায়ন করা উচিত। আর এ ন্যায্য কারণেই সরকারি ব্যাংকারদের স্বতন্ত্র বেতন কাঠামোর দাবিও উঠেছিল একসময়। জানি, অনেকে হয়তো সরকারি ব্যাংকের নানা অনিয়ম ও ঋণ কেলেঙ্কারির অভিযোগে আমার মতামতের বিরুদ্ধে উষ্মা প্রকাশ করবেন; কিন্তু আমি সংখ্যালঘু দুর্নীতিবাজদের পক্ষে বলছি না, আমি সংখ্যাগরিষ্ঠ ভালো ব্যাংকারদের কথা বলছি।
এবার আসি বেসরকারি ব্যাংক প্রসঙ্গে। সরকারি ব্যাংকারদের সঙ্গে বেসরকারি ব্যাংকারদের তুলনা আসলে অযৌক্তিক। কারণ সরকারি চাকুরেরা সম্মান, সম্মানী, ভাতা, চাকরির নিরাপত্তার মতো যত সুবিধা পান, বর্তমান সময়ে বেসরকারি ব্যাংকাররা এসবের ধারেকাছেও নেই। তারা নিয়মিতভাবে বেতন-ভাতা ছাড়াও বৈশাখী ভাতা, চিকিৎসা ভাতা, নামমাত্র সুদে গৃহঋণের মতো নানা ধরনের সুবিধা পেয়ে আসছেন। এছাড়া প্রতি বছরান্তে তিন থেকে চারটি করে ইনসেনটিভ বোনাস বা উৎসাহ বোনাস পাচ্ছেন। ব্যাংকগুলোর গত কয়েক বছরের আর্থিক প্রতিবেদনমতে, একাধিক বেসরকারি ব্যাংক সরকারি ব্যাংকের চেয়ে বেশি অপারেটিং প্রফিট করেছে। কিন্তু কর্মীদের আর্থিক সুবিধা প্রদানে বেসরকারি ব্যাংকগুলো সরকারি ব্যাংকগুলোর পেছনে পড়ে গেছে। এনবিআরের চেয়ারম্যানও সম্প্রতি বলেছেন, ‘অধিকাংশ বেসরকারি কর্মীই নিম্ন বেতনভুক্ত।’ কিন্তু দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগামিতায় বেসরকারি খাত তথা বেসরকারি ব্যাংকের অনেক বড় ভূমিকা রয়েছে। দেশের অর্থনীতিতে ব্যাংক খাতের যে অবদান, তার ৭০ শতাংশই বেসরকারি ব্যাংকের। তাই অর্থনীতির উন্নয়নচাকা গতিশীল রাখতে কর্মিবান্ধব বেসরকারি ব্যাংক খাতেরও বিকল্প নেই।
বোনাস নিয়ে জনতা ব্যাংককর্মীদের আন্দোলনের সংবাদ যদিও ব্যাংক খাতের সার্বিক চিত্র নির্দেশ করে না, তথাপি এ আন্দোলনকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। অন্যান্য ব্যাংকের অদেখা-অজানা কর্মী অসন্তোষ গবেষণাপূর্বক বিবেচনায় নিয়ে তা উপশমে যথাযথ কর্মিবান্ধব পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। তবে একটি সহজ নীতি মানলে প্রতিষ্ঠানে কোনো কর্মী অসন্তোষ থাকার কথা নয় ‘একটি ব্যাংক যদি আমানত, বিনিয়োগ ও মুনাফায় দেশের শীর্ষ ব্যাংক হতে চায়, তাহলে তার কর্মীরাও নিশ্চয় এই খাতের সর্বোচ্চ বেতন ও সুবিধাপ্রাপ্ত হবে।’

ব্যাংক কর্মকর্তা
কিশোরগঞ্জ
[email protected]

সর্বশেষ..