প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

ইন্টারনেট সেবা নিয়ে হয়রানি বাড়ছে গ্রাহকদের

হামিদুর রহমান: দেশে ফোরজি সেবা চালু হলেও কাক্সিক্ষত সেবা পাওয়া যাচ্ছে না। কল ড্রপ, নেটওয়ার্ক জটিলতাসহ ভয়েস কলে নানা ভোগান্তি আছে। এর সঙ্গে ডেটা সেবায় ভোগান্তি তো আছেই। বলা হচ্ছে ফোরজি, কিন্তু আমরা কি সত্যিকার অর্থেই ফোরজি সেবা পাচ্ছি? ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী শিফাত আহম্মেদ এভাবেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শেয়ার বিজের কাছে।
এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ফয়েজ উদ্দিন রাহাত। তিনি বলেন, ‘প্রায় তিন বছর ধরে গ্রামীণফোন ও এয়ারটেল সিম ব্যবহার করছি। অপারেটরগুলো মানসম্মত সেবা প্রদানে ব্যর্থ। বেশিরভাগ সময় ফোরজি ফ্রিকোয়েন্সি নেমে থ্রিজি চলে আসছে, নেটের গতি স্লো হয়ে যাচ্ছে। আবার গ্রামীণফোনের ক্ষেত্রেও বেশ কিছুদিন ধরেই এমবি (ডেটা ভলিউম) দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। আগে ৪৪ টাকায় দুই জিবি ইন্টারনেট প্যাকেজ ব্যবহার করতাম, মেয়াদ তিন দিন। কয়েক দিন হলো প্যাকেজটি মূল্য বাড়িয়ে ৪৮ টাকা করা হয়েছে। তবে দুই জিবি ইন্টারপ্যাক ৭২ ঘণ্টা ব্যবহার করলেও শেষ হতো না, অথচ বেশ কিছুদিন ধরে ৭২ ঘণ্টার আগেই ডেটা ভলিউম শেষ হয়ে যাচ্ছে। যদিও ইন্টারনেট ব্যবহার আগের মতোই রয়েছে।’
সেবার তুলনায় মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোর ব্যয় বেশি, ভোগান্তিও বেশি। ফোরজি আসার পরে ইন্টারনেটের গতি কিছুটা বাড়লেও প্রকৃত ফোরজি সেবা পাওয়া যাচ্ছে না। প্রায়ই ইন্টারনেটের গতি কমে যাচ্ছে। এছাড়া নির্ধারিত সময়ের আগেই ডেটা শেষ হয়ে যাচ্ছে। মূলত প্রযুক্তিতে উন্নত মনিটরিং ব্যবস্থা না থাকায় মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো কৌশলে গ্রাহকদের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন ই-কমার্স ব্যবসায়ী রাব্বী চৌধুরী।
সম্প্রতি মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোর সেবার মান নিয়ে রাজধানীসহ দেশের ১৮টি জেলায় নিরীক্ষা চালায় বিটিআরসি। কোয়ালিটি অব সার্ভিসের বেঞ্চমার্ক অনুযায়ী, থ্রিজিতে ডাউনলোডের সর্বনিন্ম গতি দুই মেগাবাইট (এমবিপিএস) প্রতি সেকেন্ড। আর ফোরজিতে ডাউনলোডের সর্বনিন্ম গতি হওয়ার কথা সাত মেগাবাইট (এমবিপিএস) প্রতি সেকেন্ডে। থ্রিজিতে টেলিটক ছাড়া অন্য তিন অপারেটরের গতি তিন এমবিপিএসের ওপরে হলেও টেলিটকের গতি এক দশমিক ৬৩ এমবিপিএস। তবে ফোরজিতে নির্ধারিত মান পূরণ করতে পারেনি কোনো মোবাইল ফোন অপারেটরই। রাজধানীতে গ্রামীণফোনের ফোরজিতে ডাউনলোড স্পিড পাঁচ দশমিক ৮৮ এমবিপিএস, রবির পাঁচ দশমিক ৯১ এমবিপিএস ও বাংলালিংকের পাঁচ দশমিক ১৮ এমবিপিএস। তবে ফোরজিতে আপলোড গতি জিপির দুই দশমিক ৫৫, রবির দুই দশমিক ৫০ এবং বাংলালিংকের দুই দশমিক ৩৩ এমবিপিএস। অর্থাৎ ফোরজির মানসম্মত সেবা প্রদানে ব্যর্থ মোবাইল ফোন অপারেটরগুলো।
রাজধানী ছাড়াও খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৮টি জেলায় মোবাইল ফোন অপারেটরদের সেবার মান নিয়ে ড্রাইভ টেস্ট করে বিটিআরসি। সেখানে দেখা যায়, বাংলালিংক ফোরজিতে তিন দশমিক ৫৬ এমবিপিএস গতির ইন্টারনেট সেবা দিচ্ছে। বাকি দুই অপারেটর গ্রামীণফোনের ফোরজি ইন্টারনেটের গতি পাঁচ দশমিক এক এমবিপিএস এবং রবির আছে চার দশমিক ৮৯ এমবিপিএস গতি। এছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত অপারেটর টেলিটক যেহেতু ঢাকার বাইরে এখনও ফোরজি নিয়ে যেতে পারেনি, তাই ড্রাইভ টেস্টের এই অংশটিতে তারা হিসাবের মধ্যে আসেনি।
সূত্রমতে, মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিনিয়তই গ্রাহকদের নানা রকম অভিযোগ জমা পড়ছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থায় (বিটিআরসি)। এর পরিপ্রেক্ষিতে ডেটা স্প্রিড ও ভলিউম নিয়ে গত এক বছরে অপারেটরগুলোর বিরুদ্ধে গ্রাহকদের অভিযোগ জমা পড়েছে প্রায় ৩০০টি।
বিটিআরসির প্রাপ্ত তথ্যমতে, গত বছরের ১ মে থেকে চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত বিভিন্ন অপারেটরের বিরুদ্ধে গ্রাহকদের এসব অভিযোগ জমা পড়ে। এর মধ্যে ডেটা স্পিড ও ডেটা ভলিউম নিয়ে গ্রাহকদের ভোগান্তির শীর্ষে রয়েছে রবি আজিয়াটা। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে গ্রাহকদের অভিযোগ জমা পড়েছে প্রায় ১৫৬টি। এর মধ্যে ডেটা স্পিড নিয়ে অভিযোগ রয়েছে ৩১টি ও ভলিউম নিয়ে অভিযোগ রয়েছে ৪৬টি। এছাড়া গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধে ডেটা স্পিড নিয়ে রয়েছে ৩১টি অভিযোগ এবং ডেটা ভলিউম নিয়ে রয়েছে ৪৬টি অভিযোগ।
অন্যদিকে বাংলালিংকের বিরুদ্ধে ডেটা স্পিড নিয়ে ১৪টি ও ডেটা ভলিউম নিয়ে ২১টি অভিযোগ জমা পড়ে। আর টেলিটকের বিরুদ্ধে ডেটা স্পিড নিয়ে ১৮টি ও ডেটা ভলিউম নিয়ে আটটি অভিযোগ জমা পড়ে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিটিআরসিতে মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোর বিরুদ্ধে যে পরিমাণ অভিযোগ করছে, প্রকৃত অর্থে অভিযোগকারী অনেক বেশি। শুধু যে গ্রাহকরা খুব বেশি সচেতন বা শহরে বাস করে কেবল তাদের মধ্যে থেকে কিছু গ্রাহক অভিযোগ করে থাকেন। মফস্বলে বিপুলসংখ্যক গ্রাহক নানাভাবে হয়রানি ও প্রতারণার শিকার হচ্ছেন, যারা প্রতারণা বা হয়রানির শিকার হলে অভিযোগ করতে পারছেন না। কেননা ভোগান্তির শিকার হলে সংশ্লিষ্ট জায়গায় অভিযোগ করার কথাও অনেক গ্রাহক জানেন না।
তারা আরও জানান, দেশে উন্নত প্রযুক্তির ফোরজি সেবা চালু হলেও মানসম্মত সেবা পাওয়া যাচ্ছে না। বরং নেটওয়ার্ক অসক্ষমতা ও কল ড্রপ বাড়ছে। ঢাকার বাইরে অনেক এলাকায় এখন নিরবচ্ছিন্ন নেটওয়ার্ক থাকে না। গ্রামের অনেক গ্রাহক প্রযুক্তির সম্পর্কে জ্ঞানহীন, তারা প্রতারণার শিকার হলেও বুঝতে পারেন না। আবার কেউ বুঝলেও সংশ্লিষ্ট জায়গায় অভিযোগ করতে পারেন না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলালিংকের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ইন্টারনেটে ধীরগতি ও ডেটা ভলিউম সাধারণত গ্রাহকদের ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে। হাইরেজুলেশনের ভিডিও’র ক্ষেত্রে ডেটা দ্রুত শেষ হয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। কেননা রেজুলেশনের ওপরেই ডেটার ব্যবহার নির্ভর করে। অন্যদিকে একই সাইট থেকে একাধিক গ্রাহক নেট ব্রাউজ করলে অনেক সময় ইন্টারনেটের গতি কমে যায়। অর্থাৎ ক্যাপাসিটির তুলনায় গ্রাহক বেশি হলে সাধারণত এ ধরনের সমস্যা দেখা যায়।’

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..