মত-বিশ্লেষণ

ইন্টারেস্ট রেট ক্যাপ ও ক্রেডিট রেটিং অবকাঠামো

ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব: ঋণ বরাদ্দ ব্যবস্থাপনা, কিস্তি সংগ্রহ, মন্দ ও খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং ঋণ জালিয়াতি নিয়ন্ত্রণে ব্যক্তিগত ও কোম্পানি গ্রাহকের ঋণ প্রোফাইল তৈরি বর্তমান বিশ্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একটি বিধিবদ্ধ ক্রেডিট রেটিং ডেটাবেইজ এবং ক্রেডিট রেটিং এপ্লিকেশন সফটওয়্যার দরকার হয়ে পড়েছে বাংলাদেশেরও। ব্যাংকিং, নন-ব্যাংকিং আর্থিক ও বিমা খাতের যাবতীয় ব্যক্তি এবং কোম্পানি গ্রাহক, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, করদাতা, ব্যাংক অ্যাকাউন্টধারীর ক্রেডিট রেটিংয়ের জন্য একটি ডেটাবেইজভিত্তিক সফটওয়্যার টুল ডেভেলপ করা সময়ের দাবি। এর মাধ্যমে সবার আয়ের বিপরীতে ঋণ ও মাসিক কিস্তির খরচ আমলে নিয়ে নতুন ঋণ বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে। এখানে পেমেন্ট সিস্টেম ব্যবহার করেও ইউনিক অ্যাকাউন্ট নং, সিটিজেন নম্বর ও এড্রেস ম্যাপিং করে তার বিপরীতে মাসিক আয় এবং ঋণের তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা যায়। এ দুই পদ্ধতির সমন্বয়ে ব্যক্তি গ্রাহক, কোম্পানির জন্য আলাদা আলাদা ক্রেডিট রেটিং প্রসেস, ফর্মুলা ও স্কোরিং ব্যবস্থা ডেভেলপ করতে হবে। এতে ঋণ বরাদ্দ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আসবে।

সরকার খেলাপি ঋণ কমাতে বহু ঋণখেলাপিকে বহু সুবিধা দিয়েছে; তথাপি খেলাপি ঋণ বাড়ছে। যেসব ব্যক্তি ও ব্যবসায়ী ঋণ শোধ করতে না পারার ‘যৌক্তিক’ কারণ ব্যাখ্যা করতে পারবেন, তাদের মোট ঋণের দুই শতাংশ ডাউন পেমেন্টে সাত শতাংশ সুদে ১২ বছরে ঋণের টাকা পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এরপরও দেখা গেছে, যারা ঋণখেলাপি ছিলেন না, তারাও ইচ্ছাকৃতভাবে খেলাপি হয়েছেন। নভেম্বর ২০১৯ পর্যন্ত মোট ঋণখেলাপির পরিমাণ এক লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। কিন্তু আইএমএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আদালতের স্থগিতাদেশকৃত অংশ প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ হিসাবের চেয়ে দ্বিগুণ, দুই লাখ ৪০ হাজার ১৬৭ কোটি টাকাÑযা মোট ঋণের প্রায় ২৬ শতাংশ। সঙ্গে বাড়ছে অর্থ পাচার। বারবার পুনঃতফসিল করার পরও অতি উচ্চ খেলাপি ঋণের বোঝা থেকেই যাচ্ছে। ঋণ ফেরত না দেওয়া প্রভাবশালী ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতাবানদের একটি ব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি সামাজিক, রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক মিলে সম্মিলিত দুর্বৃত্তায়িত এক বোঝা। এ থেকে বেরিয়ে আসতে চাইলে ডেটাবেইজভিত্তিক দুর্নীতিমুক্ত আধুনিক কারিগরি সমাধানের বিকল্প নেই।

অন্যদিকে, সবকিছুকে সমন্বিত করার ক্রেডিট রেটিং ব্যবস্থা চালু করা গেলে বিভিন্ন ধরনের ফিনটেক সেবা চালু করা সহজতর হবে, তেমনি করে ব্যাংকের ঋণদান কর্মসূচিও ঝুঁকিমুক্ত হবে। ব্যাংকের ঋণদান কর্মসূচিকে ঝুঁকিমুক্ত করা কারিগরি অবকাঠামো না থাকায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগে গতি আসছে না। বহু ঠিক-বেঠিক কাগজনির্ভর ডকুমেন্টের ওপর নির্ভরতা ব্যাংক খাতকে দক্ষ ও ঝুঁকিমুক্ত করছে না। এ পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক দুর্বৃত্তরা। ব্যক্তিগত আয়, ব্যবসার আয় ব্যয়, ঠিকানা, উপার্জন, সম্পদ প্রভৃতির মিথ্যা তথ্য সংবলিত কাগজ তৈরি করে, মিথ্যা দলিলপত্র ও সার্টিফিকেট বানিয়ে, মিথ্যা আইডি দিয়ে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রভাবে ব্যাংকঋণ নিয়ে গায়েব হয়ে যাচ্ছে অনেকেই। এরা আবার অর্থপাচারেও লিপ্ত। তাই দরকার হয়ে পড়েছে যাবতীয় তথ্যকে বিভিন্নভাবে শ্রেণিবিন্যাস করে একটি তথ্যশালায় নিয়ে আসা। এই তথ্যগুলোকে গ্রাহক, ব্যবসা ও রেগুলেটরÑএই ত্রয়ীর চুক্তির মাধ্যমে গোপনীয়তা ও নিরাপদ ব্যবহার চুক্তির মাধ্যমে তথ্য নিরাপত্তার চাদরে আনা হবে। সুউচ্চ তথ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ফ্রেমওয়ার্ক ও একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়ে গেলে নিরাপদ তথ্য ব্যবহারে গতি আসবে। এতে করে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের আর্থিক প্রযুক্তিগুলোসহ বেশকিছু ফিনটেক পণ্য বহু ধারায় বিকশিত হওয়ার অবকাঠামো তৈরি হবে।

বাংলাদেশে ফাইন্যান্সিয়াল করেসপন্ডেন্সগুলো কোম্পানির ঠিকানাকেন্দ্রিক, অনেক আর্থিক সেবা চাকরির পে-সিøপভিত্তিক, যেহেতু এড্রেস এখনও ট্রাস্টেড নয়, তাই বিজনেস এখানে সরাসরি সিটিজেন ডিলিংসকে ট্রাস্ট করে না। এ কারণেও এখানে বহু ছোট ব্যবসা বিকশিত হচ্ছে না, বহু উদ্যোক্তা আগাতে পারছেন না, এন্টারপ্রেনিউরশিপ মুখ থুবড়ে পড়ছে ঋণের অভাবে, কাজ করেও পেমেন্ট না পাওয়ার জটিলতায়। পেমেন্ট প্রাপ্তির জটিলতাও রয়েছে এখানে; তদুপরি অর্থ লেনদেনেও বাংলাদেশে ফি দিতে হয়। আবার ঋণ নেওয়ার জটিলতায় অনেকে ব্যাংকিং চ্যানেলে না গিয়ে অপ্রাতিষ্ঠানিক সুদি কারবারে জড়িয়ে পড়ছেন। অর্থাৎ, বিস্তৃত মধ্যবিত্ত ও নি¤œবিত্ত উদ্যোক্তা কৃষি ও শ্রমজীবীকে বিজনেস ফাইন্যান্সিয়ালি ট্রাস্ট করে না। ফলে ভাসমান শ্রমিক, শিল্প শ্রমিক, কৃষক বা রিকশাওয়ালাকে আমাদের কমার্শিয়াল ব্যাংকে কমই দেখা যায়, ঋণদান তো পরের কথা। বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণ প্রসার পাওয়ার ভিত্তি এটাই। মোবাইল ব্যাংকিংয়ে গতি আসার ভিত্তিও এটি, যদিও ফ্রি আর্থিক লেনদেনের মাধ্যম তৈরির দায়িত্ব রাষ্ট্রের ছিল। কিন্তু শ্রম, পণ্য ও সেবা বিনিময় করার পরও আজকের বাংলাদেশে এর বিনিময়ে ট্রান্সফার কস্ট গোনা লাগে। এর ব্যাপক প্রভাব পেমেন্ট সার্ভিসে, এমনকি অর্থনীতিতে পড়ছে। এই নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিতে সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা বিকাশের পরিবেশ নেই।

এখানে সুস্পষ্ট যে, সমন্বিত ক্রেডিট রেটিং ব্যবস্থা না থাকায়, এড্রেস অথেনটিক না হওয়ায় ক্ষুদ্র ব্যবসায় ঋণ বিতরণ কঠিন। অন্যদিকে বাণিজ্যিক ব্যাংকিং ঋণ বরাদ্দ প্রক্রিয়ায় ব্যাংক মালিকপক্ষের সংযোগ ও রাজনৈতিক প্রভাব বেশ প্রবল। আবার দুর্বৃত্তায়িত পথে নিম্ন আদালতের মাধ্যমে ঋণখেলাপি হওয়ার প্রক্রিয়ায়ও ইচ্ছাকৃত প্রভাব ফেলা যায়। সমন্বিত ক্রেডিট রেটিং ও এড্রেস বিশ্বাসযোগ্য হলে ব্যাংকঋণ তো বটেই, এমনকি ক্ষুদ্রঋণের সুদও কমে আসবে। কারণ, ঋণদানে তখন ঝুঁকি কমে আসবে। কেননা, ঠিকানা, আয়-ব্যয়, বিমা ও বিলভিত্তিক ক্রেডিট রেটিং স্কোরিং ব্যবস্থায় ব্যক্তি ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ক্রেডিট প্রোফাইলের ভিত্তিতেই গাণিতিক সমীকরণে ঋণ পাওয়ার যোগ্যতা এবং ঋণ পরিমাণের সংখ্যাও নির্ণীত হবে।

ব্যক্তিগত ও কোম্পানির সমন্বিত ক্রেডিট রেটিং অটোমেইট না করা গেলে, অর্থিক ডেটা সুরক্ষা বা কনফিডেন্সিয়ালিটি না দেওয়া গেলে, ডেটা আদান-প্রদানের সুরক্ষিত ফ্রেমওয়ার্ক, ডেটা অপব্যবহার থামানো না গেলে এবং একই সঙ্গে নাগরিক অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারি-বেসরকারি ডেটা উম্মুক্ত না করা হলে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব-সংশ্লিষ্ট নতুন নতুন আর্থিক প্রযুক্তির বিকাশ ঘটানো মুশকিল হয়ে যাবে। অর্থাৎ, ব্যবসা ও সেবা খাতগুলোর নতুন নতুন পণ্য এবং সেবা তৈরির রোবো-অ্যাডভাইজিং, কাস্টমাইজড বিপণন, অটোমেটেড সার্চ ইঞ্জিন কাস্টমাইজেশন, ফাইন্যান্সিয়াল টেকনোলজি (ফিনটেক), প্রপার্টি টেকনোলজি (প্রপটেক), লিগ্যাল টেকনোলজি (লিগ্যালটেক), লজিস্টিকস টেকনোলজি, এমনকি রেগুলেটরি টেকনোলজি (রেগটেক) প্রভৃতিকে এগিয়ে নেওয়া যাবে না। অর্থাৎ, এ খাতগুলোয় নতুন বিনিয়োগ, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়বে।

ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক মামুন রশীদ একটি জাতীয় দৈনিকে গত ২০ জানুয়ারি এক প্রবন্ধে লেখেন, ‘ঋণ সাধারণত মন্দ হয় যেসব কারণে, তা হলো: (ক) ঋণ প্রদানে প্রয়োজনীয়তার দুর্বল মূল্যায়ন, (খ) ঋণের কাঠামো বিবেচনায় দুর্বলতা, (গ) নিরাপত্তা বা জামানতের ঘাটতি, (ঘ) ব্যবসায় অভ্যন্তরীণ নগদ অর্থের অপর্যাপ্ততা, (ঙ) ব্যবসার ভিত্তি, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা অথবা ধারাবাহিকতার দিকে না তাকিয়ে শুধু ঋণগ্রহীতার নামের ওপর ভর করে ঋণ প্রদান, (চ) চলমান প্রতিযোগিতা অথবা উদীয়মান প্রতিযোগিতা সম্পর্কে ঋণ কর্মকর্তার অজ্ঞতা বা ভুল মূল্যায়ন, (ছ) অর্থনৈতিক মন্দা অথবা মূল ব্যবসার বাইরে অন্যান্য ব্যবসায় বিনিয়োগ বা ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা বিবেচনায় না নেওয়া, (জ) দুর্বল ঋণ মূল্যায়ন, বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়ের ঝুঁকি বুঝতে না পারার ব্যর্থতা, ঋণ কর্মকর্তাদের দুর্নীতি বা ব্যর্থতা, জামানতের বা চুক্তির শর্ত পূরণ করতে না পারলেও ঋণ দেওয়া অথবা যথাযথ নজরদারির অভাব।’ মন্দঋণ মোকাবিলার এ কারণগুলোকে আমলে নিয়ে ঋণ বরাদ্দ প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয় করতে চাইলে দরকার ঋণ ও পাওনার সর্বজনীন তথ্যশালা এবং সফটওয়্যার তৈরি। কারণ, এই ব্যাপক কাজ ম্যানুয়ালি প্রায় অসম্ভব। ফলে এখানে আসছে ডিজিটাল ডেটাবেইজভিত্তিক সমাধানের অবকাঠামোগত প্রশ্ন। এর একটি অবকাঠামো হিসেবে আমরা আলোচনা করছি ক্রেডিট রেটিং ডেটাবেজ ও তার রিয়েল টাইম প্রসেসিং সক্ষমতা তৈরি।

বর্তমানে সরকার বড় ব্যবসায়ীদের সুবিধা দিতে এক অঙ্কের সুদের প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। সমন্বিত ক্রেডিট রেটিং ব্যবস্থা ঠিক না করে এক অঙ্কের ঋণ বরং খেলাপি ঋণ ও পাচার বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে! রাজনৈতিক প্রভাবশালী, ব্যাংক মালিক, পরিচালক ও ব্যবসায়ীÑএ চার পক্ষ বোঝাপড়ার মাধ্যমে একে অন্যকে নামে-বেনামে ঋণ বরাদ্দ করে তা খেলাপি করে ফেলার সুযোগ তৈরি করছে। এদের সবার উদ্দেশ্যই ছিল ব্যক্তি, পরিবার কিংবা দলীয়ভাবে লাভবান হওয়া। ব্যাংকিং কিংবা ব্যবসা করা এদের কারও সৎ উদ্দেশ্য ন বলেই প্রতীয়মান। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে অবকাঠামোগত দুর্বলতা। সেটা হচ্ছে ক্রেডিট রেটিং ডেটাবেইজ। অর্থাৎ ব্যক্তি, ব্যবসা ও কোম্পানির আয়, বিধিবদ্ধ ব্যয়, ইউটিলিটি বিল, ঋণ, ঋণের প্রিমিয়াম, স্বাস্থ্য, পরিবহন, জীবন কিংবা ব্যবসায়িক বিমা প্রভৃতির কোনো স্বচ্ছ ও কেন্দ্রীয় তথ্যশালা নেই। বাংলাদেশে দলিল-দস্তাবেজ, বিজনেস করেসপনডেন্স জালিয়াতি খুবই নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। এ অবস্থায় আমাদের পেমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে ভেরিফায়েড আয়, ব্যয় ও ঋণের তথ্য, অর্থাৎ ব্যক্তি ও ব্যবসার উপার্জন এবং ঋণের তথ্য সঠিকতা ও চাহিবা মাত্র তার প্রাপ্তি ঋণ ব্যবস্থাপনায় নৈরাজ্য ও জালিয়াতি থামাতে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে।

ব্যবসা সহজকরণের অনুঘটক হিসেবে বাংলাদেশ কখনোই উৎপাদনের পুরো ইকোসিস্টেমকে আমলে নেয়নি। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও সময়ক্ষেপণ, ভৌত অবকাঠামো অক্ষমতা, যানজট, মানসম্পন্ন ও স্কিল্ড শ্রমিক সরবরাহ, শিক্ষা সংস্কার, সাশ্রয়ী জ্বালানি, শিল্প ও অফিস স্পেসের প্রাপ্তি, পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি বন্ধ প্রভৃতিকে আমলে না নিলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ উৎপাদন মূল্যে টিকতে পারবে না বলেই প্রতীয়মান হয়। এ অবস্থায় কারিগরি অবকাঠামো প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায়, সর্বোপরি কস্ট অব বিজনেসের বোধগম্য উন্নতি না হলে আমরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, ডেবট ক্যাপ পলিসি কাজে আসবে না। অর্থাৎ, কারিগরি অবকাঠামোগতভাবে সক্ষম স্বচ্ছ ক্রেডিট ব্যবস্থা প্রবর্তিত না হলে, রাজনৈতিক ও ব্যাংক পরিচালনাগত দুর্বৃত্তায়ন না থামলে, উৎপাদনের পুরো ইকোসিস্টেমকে ব্যবসাবান্ধব না করলে শুধু এক অঙ্কের সুদ প্রবর্তনের পেছনে সৎ উদ্দেশ্য থাকলেও তা কাক্সিক্ষত ফল এনে দিতে ব্যর্থ হতে পারে।”

গ্রহণযোগ্য আর স্বচ্ছ কোনো ক্রেডিট রেটিং ডেটাবেইজ আর সর্বজনীন সফটওয়্যার না থাকায় ব্যক্তি ও ব্যবসায় কে কি পরিমাণ ঋণ পাওয়ার যোগ্য, কে অযোগ্য, কে কোথায় কীভাবে ডিফল্টার, কার বর্তমান ঋণ কোথায় কত, কে কোথায় কোন প্রিমিয়ামে বর্তমানে ঋণের কিস্তি দিচ্ছেন বা দিতে ব্যর্থ হচ্ছেনÑতার কোনো স্বচ্ছ তথ্যশালা ও সফটওয়্যারকেন্দ্রিক নিয়ন্ত্রণ এবং যাচাই ব্যবস্থা নেই। ফলে ঋণদান বৈধ-অবৈধ, সঠিক ও জাল সনদ এবং ব্যাংক পরিচালকদের ইচ্ছানির্ভর, যা সচরাচর বিভিন্ন ক্ষমতাকে কেন্দ্র দিয়ে প্রভাবিত হয়। কারিগরি অবকাঠামোগতভাবে সক্ষম স্বচ্ছ ক্রেডিট ব্যবস্থা প্রবর্তিত না হলে, রাজনৈতিক ও ব্যাংক পরিচালনাগত দুর্বৃত্তায়ন না থামলে, উৎপাদনের পুরো ইকোসিস্টেমকে ব্যবসাবান্ধব না করলে শুধু এক অঙ্কের সুদ প্রবর্তনের পেছনে সৎ উদ্দেশ্য থাকলেও তা কাক্সিক্ষত ফল এনে দিতে ব্যর্থ হতে পারে। কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ত্রুটি, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ব্যাংক পরিচালনার অক্ষমতাগুলো ঠিক হয়ে গেলেও শুধু ঋণ প্রদানের প্রাক-যোগ্যতা যাচাইয়ের অবকাঠামোগত প্রস্তুতি ঠিক না হলে নয়-ছয় সুদ বিন্যাসের অর্থনীতি কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হতে পারে। অবকাঠামোগত প্রস্তুতি না নিয়ে ইন্টারেস্ট রেট ক্যাপিং করে বহু দেশ লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থতা দেখিয়েছে। বাংলাদেশ সরকারকে তাই ব্যাংক খাতে সুশাসন ফেরাতে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহ দিই; সঙ্গে সঙ্গে অবকাঠামোগত প্রস্তুতি তৈরির পরামর্শও দিচ্ছি। আমাদের ঋণব্যবস্থাপনা সেন্সিবল হোক, অর্থনীতি টেকসই হোক, বাংলাদেশ এগিয়ে যাক।

টেকসই উন্নয়নবিষয়ক লেখক ও গবেষক

[email protected]

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..