এফ আই মাসউদ ও নুরুন্নাহার চৌধুরী কলি : যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে পাল্টা প্রতিশোধমূলক হামলা চালাচ্ছে ইরান। দেশটি কাতার, কুয়েত, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। এসব হামলার পরিপ্রেক্ষিতে নিরাপত্তাজনিত কারণে কয়েকটি দেশে বিমান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ বা স্থগিত করা হয়েছে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে চলমান হামলার ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৪ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন এবং ২৩ জন প্রবাসী বাংলাদেশি আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। তবে শেয়ার বিজ খুঁজে পেল ১৯ জনের নাম।
আর এই সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি করছে। কারণ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতেই অবস্থিত। ফলে যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে সেখানে কর্মরত বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশির নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ইরান ও ইসরায়েল ছাড়াও সৌদি আরব, আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, জর্ডান, ওমান, ইরাক, লেবানন ও সাইপ্রাসে হামলা হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে আশপাশের দেশগুলোতেও অর্থাৎ প্রায় পুরো মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চলছে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধে নিহত ৪ জন হলেনÑসৌদি আরবের রিয়াদে কিশোরগঞ্জ জালালপুর উপজেলার কটিয়াদীর বাচ্চু মিয়া, টাঙ্গাইল জেলার সখিপুর উপজেলার মো. মোশারফ হোসেন, বাহরাইনে চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপের এসএম তারেক এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার সালেহ আহম্মেদ।
ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় আহত ২৩ জন হলেনÑময়মনসিংহের আব্দুল্লাহ আল মামুন, নরসিংদীর অনিক মিয়া, আব্দুল জলিল ও রেজাউল করিম রাব্বী, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মোবারক হোসাইন, কামরুল মিয়া, নারায়ণগঞ্জের সাকিবুল হাসান, গাইবান্ধার শফিক হাসান, টাঙ্গাইলের সবুজ মিয়া ও কামরুল ইসলাম, কুমিল্লার মোহাম্মদ রাসেল মিয়া, লক্ষ্মীপুরের আবু ইউসুফ, বাহ্মণবাড়িয়ার আমিনুল ইসলাম, রাকিবুল ইসলাম, মাসুদুর রহমান, দুলাল মিয়া, চট্টগ্রামের মো. নাজিম উদ্দীন, ঢাকার মিরপুরের হাবিবুর রহমান, ফেনীর মোহাম্মদ আবু নাসের।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিহত সালেহ আহমেদের পরিবার শেয়ার বিজকে জানায়, মরদেহ দেশে আনতে সরকারের কাছে এখনও আবেদন করিনি। তবে দ্রুত করব। আমাদের অবস্থা এখন ভালো না। সবাই শোকাহত।
চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের এসএম তারেক মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল ও ইরানের হামলায় নিহত হয়েছেন। তার মেয়ে শেয়ার বিজকে বলেন, আমার বাবার মৃত্যুর ঘটনায় সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ফ্লাইট চলাচল শুরু হলে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হবে।
আতঙ্ক ও উদ্বেগ নিয়ে দিন কাটছে বলে জানান কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও কুয়েতে অবস্থানরত কয়েকজন প্রবাসী। তারা জানান, তাদের অনেকের কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। এ পরিস্থিতিতে দেশে থাকা পরিবারের সদস্যরাও দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন।
ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় এখন পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি নিহতের ঘটনায় পরিবারগুলোয় শোকের ছায়া নেমেছে। তেমনি আহতের ঘটনায় আতঙ্কিত সময় পার করছেন পরিবারগুলো। এমন ঘটনার পর কাজে বের হচ্ছেন না অনেকে।
সবসময় নিজের স্বজনদের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ রাখছেন মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসীরা। কাতারে দীর্ঘদিন থাকেন ওমর ফারুক। তিনি রাজধানীর দোহায় গাড়ি চালান। দেশে তার স্ত্রী ও দুই সন্তান দেশে থাকেন। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ায় চরম আতঙ্কে আছেন প্রবাসী ওমর ফারুক। তিনি শেয়ার বিজকে জানান, কাতারে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার পর থেকে আমরা চরম আতঙ্কের মধ্য আছি। ভয়ে কয়েকদিন কাজেও যাইনি। বাসায় থাকতেও ভয় লাগছে। মনে হচ্ছে কখন যে বাসার ওপর হামলা হয়। রাতে ভয়ে ঘুম আসে না।
বাহরাইনে ছোটখাটো ব্যবসা করা প্রবাসী মো. রুবেল শেয়ার বিজকে বলেন, বাহরাইনের নাগরিকরা খুব বেশি প্রয়োজন না হলে বাসা থেকে বের হচ্ছেন না। যার কারণে আগের মতো ক্রেতাও নেই। বাংলাদেশিরা অনেকটা বাধ্য হয়ে কাজে বের হচ্ছেন। বাংলাদেশি প্রবাসীরা চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন।
কুয়েতে থাকেন আবদুল মালেক। তিনি বলেন, খানে মানুষ কাজেই বের হতে ভয় পাচ্ছেন। অবস্থাটা এমন হয়েছে, বাসায় থাকলেও ভয় লাগে, আবার বাইরে যেতেও ভয় লাগে। চরম ঝুঁকিতে বাংলাদেশি প্রবাসীরা।
সৌদি আরবের দাম্মাম শহরে থাকেন এমরানুল হক। তিনি শেয়ার বিজকে জানান, চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছি। এখানে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা ভয়ে কাজে যেতে পারছি না। ভয়ে আমি মক্কাতে চলে আসছি ওমরাহ করতে।
বর্তমান এই পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত প্রবাসীদের জীবন-নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তীব্র হারে বাড়ছে। পাশাপাশি যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অনেক জায়গায় কাজের সময় কমে যাওয়ায় তাদের আয় হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। এর ফলে ভবিষ্যতে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রবাসীদের আয়ের ওপর নির্ভরশীল সন্দ্বীপের হাজারো পরিবার এতে আর্থিক সংকটে পড়তে পারে বলেও মনে করা হচ্ছে।
বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও শ্রম কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর বলেছেন, মন্ত্রণালয় দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। শ্রমবাজারে যেন কোনো প্রভাব না পড়ে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংকটে পড়তে না হয়, সেই যোগাযোগ সরকারের পক্ষ থেকে করা হচ্ছে।
মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি অবস্থায় প্রবাসীদের কল্যাণ নিশ্চিতে গত মঙ্গলবার একটি নিয়ন্ত্রণকক্ষ স্থাপন করেছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। রাজধানীর ইস্কাটনে অবস্থিত প্রবাসী কল্যাণ ভবনে প্রবাসী কল সেন্টার কক্ষে এই নিয়ন্ত্রণ কক্ষ স্থাপন করা হয়েছে।
নিয়ন্ত্রণ কক্ষে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তারা মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজনে বিদেশের শ্রমকল্যাণ উইংয়ের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করবেন এবং ছক মোতাবেক তথ্যাদি সংগ্রহপূর্বক ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তার নিকট জমা প্রদান করবেন।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেছেন, প্রবাসীদের সংকট ও সমস্যার পুরো বিষয়টি আমাদের মনিটরিংয়ে আছে। তাছাড়া যারা ভিসার মেয়াদ জটিলতায় ভুগছেন তা নিরসনে দূতাবাসগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের ভিসা সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করব। আশা করি, বিষয়টি দ্রুত সমাধান করা সম্ভব হবে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ছুটিতে এসে আটকে পড়া প্রবাসীদের ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আটকে পড়া প্রবাসী কর্মীদের ভিসার মেয়াদ বাড়াতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। গত সোমবার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে পাঠানো এক বার্তায় বলা হয়েছে, যারা মধ্যপ্রাচ্য থেকে দেশে ছুটিতে এসেছেন, যুদ্ধের কারণে যেতে পারছেন না এবং ভিসার মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে তাদের ভিসার মেয়াদবৃদ্ধির জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার ও জর্ডান তাদের আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ করায় এর প্রভাব পড়ে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সূত্র জানা গেছে, যুদ্ধপরিস্থিতিতে আকাশপথ বন্ধের কারণে ঢাকা থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২৩টি, ১ মার্চ ৪০টি ফ্লাইট, ২ মার্চ ৪৬টি এবং ৩ মার্চ ৩৯টি, ৪ মার্চ ২৮টি, ৫ মার্চ ৩৬টি, ৬ মার্চ ৩৪টি, ৭ মার্চ ২৮টি, ৮ মার্চ ২৮টি এবং ৯ মার্চ ৩৩টি, ১০ মার্চ ৩২টি ফ্লাইট বাতিল হয়।
গতকাল বুধবার বাতিল হওয়া ফ্লাইটগুলোর মধ্যে রয়েছেÑকুয়েত এয়ারের ২টি, এয়ার অ্যারাবিয়ার (শারজাহ, ইউএই) ৪টি, গালফ এয়ারের (বাহরাইন) ২টি, কাতার এয়ারওয়েজের (কাতার) ৪টি, এমিরেটস এয়ারলাইনসের (ইউএই) ৪টি, জাজিরা এয়ারের (কুয়েত) ৪টি, ফ্লাইদুবাইয়ের (ইউএই) ৪টি। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত সর্বমোট বাতিল করা ফ্লাইটের সংখ্যা ৩৯১টি।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে বসবাস করছেন প্রায় ২৮ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক।
দেশভিত্তিক হিসাবে সর্বাধিক শ্রমিক রয়েছেন সৌদি আরবে, যেখানে সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। এর পরেই রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রায় ৪ লাখ বাংলাদেশি। ওমানের শ্রমবাজারে বাংলাদেশি সংখ্যা প্রায় ৬ লাখ ৮০ হাজার, কাতারে ৪ লাখ, কুয়েতে ৩ লাখ ৫০ হাজার, আর বাহরাইনে প্রায় এক লাখ ৮০ হাজার। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের এই ৬টি দেশে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের প্রধান অংশ গড়ে উঠেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি মালয়েশিয়াতেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করছেন। বর্তমানে দেশটিতে প্রায় ৮ লাখ বাংলাদেশি কর্মী রয়েছেন, যারা মূলত বাগান, নির্মাণ, উৎপাদন ও সেবা খাতে কাজ করেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে মালয়েশিয়াই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার।
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post