সাক্ষাৎকার

‘ইসলামী ব্যাংক এখন সর্বজনীন গ্রাহকের ব্যাংক’

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের সার্বিক কর্মকাণ্ড ও পারফরম্যান্স নিয়ে সম্প্রতি শেয়ার বিজের সঙ্গে কথা বলেছেন ব্যাংকটির মুখপাত্র ও উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) আবু রেজা মো. ইয়াহিয়া

শেয়ার বিজ: প্রবাসী রেমিট্যান্স আহরণে ইসলামী ব্যাংক শীর্ষে। এ ধারাবাহিকতা রক্ষায় আপনারা কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন?
আবু রেজা মো. ইয়াহিয়া: প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই ইসলামী ব্যাংক প্রবাসী রেমিট্যান্স আহরণকে গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। দেশে মোট প্রবাসী আয়ের সাড়ে ২১ শতাংশ রেমিট্যান্স আহরণ করে ইসলামী ব্যাংক। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের ২৩ দেশে আমাদের প্রতিনিধি আছেন। এ সংখ্যা আরও বাড়ানোর চিন্তা করছি। প্রবাসে কর্মরত বাংলাদেশিদের বেশিরভাগই স্বল্পশিক্ষিত। ব্যাংকবহির্ভূত চ্যানেলের মাধ্যমে টাকা প্রেরণের একটা সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল। তারা যাতে ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে টাকা পাঠান, সেজন্য সচেতনতা বৃদ্ধি করতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। এর ফলে প্রবাসী রেমিট্যান্স প্রবাহ আগের চেয়ে অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে এ দেশে প্রবাসীদের বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ছে। ফলে প্রবাসী রেমিট্যান্সের পরিমাণ আরও বাড়বে বলে আশা করি।
বর্তমানে তেলের মূল্যের নিম্নহার এক বড় সমস্যা। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে তেলের মূল্য কমে গেছে। রেমিট্যান্স আহরণের ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্য ছাড়াও আফ্রিকা ও এশিয়ার অন্যান্য দেশে নতুন বাজার বাড়ানোর চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

শেয়ার বিজ: আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে ইসলামী ব্যাংক এগিয়ে। সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে বলবেন কী?
আবু রেজা মো. ইয়াহিয়া: টেকসই উন্নয়ন ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষভাবে জোর দিচ্ছে। এজেন্ট ব্যাংকিং, নারীদের বিশেষ জামানতে ঋণদান, স্কুল ব্যাংকিংয়ের মতো কার্যক্রম বৃদ্ধিতে ইসলামী ব্যাংক বিশেষভাবে মনোযোগী। বর্তমানে স্কুল ব্যাংকিংয়ের অ্যাকাউন্ট সাড়ে তিন লাখ। এজেন্ট ব্যাংকিং আমরা অপেক্ষাকৃত দেরিতে শুরু করেছি। ২০১৭ সালের জুলাইয়ে শুরু করে বর্তমানে ৩০৫টি এজেন্ট আউটলেট চালু হয়েছে। আরও ২০০ আউটলেট চালুর অনুমোদন পেয়েছি। ১০ টাকায় অ্যাকাউন্ট খোলার ব্যাপারেও আমরা বিশেষ জোর দিয়ে কাজ করছি।

শেয়ার বিজ: গত বছর ২৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা এসেছে ব্যাংকিং বুথ খোলার জন্য। এ ব্যাপারে কি উদ্যোগ নিয়েছেন?
আবু রেজা মো. ইয়াহিয়া: বুথ ব্যাংকিং অনেকটা এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের মতোই; কিন্তু মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা ব্যাংকের হাতে থাকবে। শহরগুলোয় ব্যাংক বুথ বেশি কার্যকরী। এরই মধ্যে আমরা ব্যাংক বুথ খোলার প্রক্রিয়া শুরু করেছি। আশা করি তিন মাসের মধ্যে কার্যক্রম শুরু করতে পারব।

শেয়ার বিজ: মোবাইল ব্যাংকিং ‘এম-ক্যাশ’ শুরু করেছেন ২০১২ সালে। কিন্তু এটি ততটা সফলতা পায়নি। কেন?
আবু রেজা মো. ইয়াহিয়া: প্রথম থেকে নীতিগতভাবেই সিদ্ধান্ত ছিল আমরা এম-ক্যাশ নিয়ে ধীরগতিতে এগোব। কারণ, মোবাইল ব্যাংকিং নিয়ে নানা সমালোচনা রয়েছে। আমরা চেয়েছি শতভাগ নিয়ম-কানুন পরিপালন করে এগোতে। স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রম বা এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে যে গতিতে এগিয়েছি, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে ততটা এগোইনি। তবে চলতি বছরে পরিকল্পনা আছে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মধ্যে সম্ভাবনাময় কর্মীদের নিয়োগ দিয়ে মোবাইল ব্যাংকিংকে দ্রুত ছড়িয়ে দিতে।

শেয়ার বিজ: শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংকগুলোর সীমাবদ্ধতা কোথায়?
আবু রেজা মো. ইয়াহিয়া: দেশে ৯টি ব্যাংক পুরোপুরি শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংকিং করছে। সঙ্গে আরও ১৭টি আংশিকভাবে শাখাভিত্তিক শরিয়াহ্ ব্যাংকিং করছে। সীমাবদ্ধতার জায়গা হচ্ছে, ইসলামী শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংকের জন্য আলাদা কোনো আইন নেই। অথবা কেন্দ্রীয়ভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকে শরিয়াহ্ বোর্ড নেই। কিন্তু আমি মনে করি না, এগুলো খুব একটা বড় সমস্যা। আমরা ১৯৮৩ সাল থেকে ইসলামী ব্যাংকে কাজ করছি। আইন-কানুনের সীমাবদ্ধতার কারণে আমরা কোথাও আটকে নেই। আলাদা কোম্পানি আইন নেই; তবে শরিয়াহ্ভিত্তিক গাইডলাইন আছে। এছাড়া প্রত্যেকটি ইসলামী ব্যাংকে আলাদা শরিয়াহ্ বোর্ড আছে। তারা অডিট করে ও শরিয়াহ্র ভিত্তিতে পরামর্শ দিয়ে থাকে। সে কারণে শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংক পরিচালনায় আমাদের কোনো সমস্যা হচ্ছে না। এরপরও মনে করি, দেশে মোট ব্যাংকিংয়ের প্রায় ২৪ শতাংশ শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংকিং। সুতরাং শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংকগুলোর জন্য আলাদা আইন হলে সেটা ভালো হবে। তাহলে জনগণের মধ্যে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের প্রতি আকর্ষণ আরও বৃদ্ধি পাবে।

শেয়ার বিজ: পরিচালনা পর্ষদ রদবদলের পর ইসলামী ব্যাংক সমালোচনার মুখে পড়েছিল। এখন পরিস্থিতি কেমন?
আবু রেজা মো. ইয়াহিয়া: পর্ষদ নিয়ে সমালোচনা অনেক আগেই শেষ হয়েছে। বর্তমান পর্ষদ বিচক্ষণ, দক্ষ ও যোগ্য। ব্যবস্থাপনার কাজে পর্ষদের হস্তক্ষেপ নেই। গত বছরের পারফরম্যান্স অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। সুশাসন আছে বলেই সেটা সম্ভব হয়েছে। জনগণের আস্থা আগে যা ছিল, তার চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। আগে মনে করা হতো ব্যাংকটি কোনো বিশেষ দলের। এখন সর্বজনীন ভাবমূর্তি অর্জন করেছে। পাহাড়ি এলাকায় আদিবাসীদের কাছেও আমরা জনপ্রিয়। এখন আমাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যেও অমুসলিম আছে। মেয়েদের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইসলামী ব্যাংক এখন সর্বজনীন গ্রাহকের ব্যাংক।

শেয়ার বিজ: ২০১৯ সালে মোটের ওপর ব্যাংক খাত কেমন যাবে?
আবু রেজা মো. ইয়াহিয়া: ব্যাংক খাত তো দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু না। সারা দেশেই বড় বড় অবকাঠামোগত উন্নয়ন চলছে। বিভিন্ন মেগা প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। দেশের লোকের অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে। ব্যাংকের সঙ্গে বেশি লোক জড়িত হচ্ছে। এ উন্নয়নের কারণে যে পরিমাণ ঋণ বা চাহিদা বাড়ছে, সেটা সরবরাহ করা ব্যাংকগুলোর জন্য কিছুটা চ্যালেঞ্জও। সারা দেশেই তো উন্নয়নের কাজ একসঙ্গে চলছে। সরকারে যেহেতু স্থিতিশীলতা আছে, সেহেতু বেসরকারি বিনিয়োগও বৃদ্ধি পাবে। আমাদের দেশের একটা সীমাবদ্ধতা হচ্ছে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ড বা শেয়ারবাজারে যায় না। অন্যান্য দেশে ক্যাপিটাল মেশিনারিজে বিনিয়োগ করে না। কিন্তু আমাদের দেশে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য বিনিয়োগ নেয়। যে কারণে চাহিদা বেশি। এ চাহিদা পূরণ করাও এক চ্যালেঞ্জ। এ জন্য ব্যাংকগুলো বেশি মানুষকে ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে জড়িত করতে চেষ্টা করছে।
শেয়ার বিজ: ধন্যবাদ অপনাকে।
আবু রেজা মো. ইয়াহিয়া:
আপনাকেও ধন্যবাদ।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তানিয়া আফরোজ।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..