মত-বিশ্লেষণ

ই-কমার্স ব্যবসায় নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা বাড়ছে

অখিল পোদ্দার: ইলেকট্রনিক নেটওয়ার্ক বা ইন্টারনেট ব্যবহার করে পণ্য ক্রয়-বিক্রয়, অর্থ লেনদেন ও ডেটা আদান-প্রদানই হচ্ছে ই-কমার্স বা ই-বাণিজ্য। ই-মেইল, অনলাইন ক্যাটালগ, ইলেকট্রনিক ডেটা ইন্টারচেঞ্জ, ওয়েব বা অনলাইন সার্ভিসেস প্রভৃতির মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। সাধারণত ই-কমার্স সম্পন্ন হয় এক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এবং ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ও ভোক্তার মধ্যে। প্রায় স্বয়ংক্রিয় আদান-প্রদানের এই বিপণন প্রক্রিয়ার নাম হচ্ছে ই-কমার্স।

বিশ শতকের শেষ ভাগে উন্নত দেশগুলোতে ডিজিটাল বিপ্লব শুরু হলেও একুশ শতকে এসে তা উন্নয়নশীল দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। তথ্য ও যোগযোগ প্রযুক্তির বিস্ময়কর এই সম্প্রসারণ বিশ্বে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আধুনিকতা ও নতুন মাত্রা যোগ করেছে, যা ই-কমার্স নামে সমধিক পরিচিত। বাংলাদেশে ২০০৯ সালের পর থেকে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের অভিযাত্রায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সুবিধা শহর ও গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ায় ই-কমার্স সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তৃণমূলের মানুষও ধীরে ধীরে এতে সম্পৃক্ত হতে শুরু করে। সারা দেশে সরকার ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার (ইউডিসি) স্থাপন করেছে। ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে খুব সহজেই গ্রাম ও শহরের মানুষকে সম্পৃক্ত করে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে ই-কমার্স পরিচালনা করা যায়। বর্তমানে বহু নারী ই-কমার্স পরিচালনা করে বাড়তি আয়ও করছেন। গ্রামের কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য নিয়ে প্রতিদিন কষ্ট করে বাজারে যেতে হয় না। তাদের এসব পণ্য ইউডিসি’র ই-শপ সেন্টারে বিক্রি করে তারা লাভবান হচ্ছেন। ই-শপ সেন্টারে ক্রেতা ও বিক্রেতার মাঝে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী থাকে না।

চাকরির পেছনে না ছুটে নিজের প্রচেষ্টায় উদ্যেক্তা হয়েছেন রুমানা। পরিবার চেয়েছিল রুমানা ভালো চাকরি করবে, কিন্তু তিনি হয়েছেন উদ্যোক্তা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স করার পর অনলাইন ব্যবসা শুরু করেন তিনি। প্রথমে নিজের বাসাতেই ছোট পরিসরে ব্যবসা শুরু করেন। ২০১৫ সালে অনলাইনে নিজের ডিজাইন করা থ্রিপিস, শাড়ি, শার্ট, বেডশিট, কুশন ইত্যাদি পণ্য ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দিতে ব্যবসা প্রসারিত করেন। সততা আর অক্লান্ত পরিশ্রম দিয়ে তিনি কয়েক বছরেই পুরোপুরি উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

বর্তমান যান্ত্রিক কর্মব্যস্ত দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র আজ প্রযুক্তিনির্ভর। গৃহের নারীরাও আজ এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। নারীও এখন প্রযুক্তিবান্ধব। অনলাইন ফ্যাশন হাউস, জুয়েলারি হাউস, গাড়ি এবং বৃহৎ ও ক্ষুদ্র সব ধরনের নিত্যপণ্যের সম্ভার এখন অনলাইনে। ঘরে বসে, কল করে, কিংবা ম্যাসেজ পাঠিয়ে পছন্দের পণ্যটি ক্রেতাদের হাতে পৌঁছে দিচ্ছেন অনলাইন উদ্যোক্তারা।

বহু অনলাইন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার নারী। এ ধরনের ব্যবসায় জড়িত নারীরা ঘরে বসেই যেমন উপার্জনের সুযোগ পাচ্ছেন, তেমনি ক্রেতারাও ঘরে বসে তাদের পণ্যটি বুঝে নিচ্ছেন। ই-কমার্সে নারী উদ্যোক্তাদের আগ্রহ বাড়ছে, যা বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক বলে মনে করেন ই-কমার্স-সংশ্লিষ্টরা। নারীদের ঘরে বসে কাজ করার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে ই-কমার্স। অনলাইনভিত্তিক ক্রেতা হিসেবেও সংখ্যার দিক দিয়ে এগিয়ে আছেন নারীরা। সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয় ও ইন্টারনেটসেবার সহজলভ্যতা নারীদের উদোক্তা হিসেবে গড়ে উঠতে সহায়তা করছে।

একজন উদ্যোক্তা নিজের জীবিকার পাশাপাশি কয়েকজনের জীবিকার ব্যবস্থা করতে পারেন, কিন্তু উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য প্রয়োজন অর্থের। এ অর্থের জোগান দিচ্ছে এখন সরকারি ব্যাংকগুলো। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ, গ্রামীণ পর্যায়ে শিল্পের বিকাশ, উদ্যোক্তা শ্রেণি গড়ে তোলা, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সরকারি ব্যাংক থেকে বিনা জামানতে ও সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া হচ্ছে। এসব ঋণের সুবিধা কাজে লাগিয়ে গ্রামীণ নারীরা ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছেন এবং উদোক্তা হিসেবে নিজেরা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছেন। ২০১৮ সালে দেশের তৃণমূল পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ নারী উদ্যোক্তার পুরস্কার পান ঠাকুরগাঁওয়ের মোকসেদা আর ২০১৯ সালে সেরা উদ্যোক্তার পুরস্কার পান ফারজানা হাসিন। প্রধানমন্ত্রী তাদের এ পুরস্কার তুলে দেন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নারী উদ্যোক্তাদের উপস্থিতি বাড়ছে। ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) তথ্যমতে, এখন দেশে প্রায় ২০ হাজার ফেসবুক পেজে কেনাকাটা চলছে। এর মধ্যে ১২ হাজার পেজ পরিচালনা করছেন নারীরা। ফেসবুককে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে স্বল্প পুঁজিতেই উদ্যোক্তা হয়ে উঠছেন নারীরা। গত এক বছরে ই-কমার্স খাতে লেনদেন হয়েছে দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি। ঈদ, পূজা, নববর্ষসহ বিভিন্ন উৎসবে নারী উদ্যোক্তাদের তৈরি পণ্যের চাহিদা বাড়ে কয়েক গুণ।

তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে ব্যবসা কার্যক্রম চলছে ডিজিটাল পদ্ধতিতে। পছন্দের পণ্যটিতে ক্লিক করে অর্ডার করলেই তা পৌঁছে যাচ্ছে ক্রেতাদের ঘরে ঘরে। তাই নগরজীবনের ব্যস্ততা, যানজট আর নানা ঝামেলা এড়াতে অনলাইন কেনাকাটাতেই ঝুঁকছে মানুষ। ই-কমার্স সাইটগুলো থেকে কেনাকাটা করেন এমন মানুষের সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের পাশাপাশি কর্মব্যস্ত মানুষের জন্য এখন কেনাকাটার অন্যতম ভরসাস্থল হয়ে উঠছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের কাছে অনলাইন শপিং হয়ে উঠেছে জনপ্রিয়।

আগে শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক অনলাইন শপিং থাকলেও এখন দেশের বড় বড় শহরে বাড়ছে অনলাইন কেনাবেচা। ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশনের মতে, বাংলাদেশে ই-কমার্স খাতে ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এ খাতের মূল চালিকাশক্তি তরুণ-তরুণীরা। তারা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন নিজেকে, দেশকে। তৈরি হচ্ছে নতুন স্টার্টআপ। ই-কমার্স খাতের প্রতিষ্ঠান চাল-ডাল ডটকমের প্রধান নির্বাহী বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে তৈরি হতে পারে পরবর্তী আলিবাবা ও আমাজানের মতো বড় বড় অনলাইন প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশের তরুণ মেধাবীরা এগিয়ে নেবে তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে। বর্তমানে বাংলাদেশে ই-কমার্সের বিকাশমান সময় চলছে। এ সময়ে যদি সঠিক লক্ষ্য ও পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাওয়া যায়, তবে এটি দেশের উল্লেখযোগ্য বাণিজ্য খাত হিসেবে দাঁড়িয়ে যাবে।’

বাংলাদেশে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা ব্যাপক হারে বাড়ছে বিশেষ করে শহরগুলোয়। অফিস করে সংসার সামলানো সেইসঙ্গে শিশুদের দেখাশোনার পর বাড়তি সময় বের করা কঠিন। তাই শপিংয়ের জন্য অনেক কর্মজীবী নারী এখন পুরোপুরি নির্ভরশীল অনলাইন শপিং সাইটগুলোর ওপর। ফেসবুকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে বেছে নেওয়া যায় পছন্দের পণ্যটি। কর্মজীবী নারীদের সময় বের করে রাস্তায় যানজট আর ভিড় ঠেলে মার্কেটে যেতে অনেকেই আগ্রহী নয়। তাই অনলাইন শপিং কর্মজীবী মায়েদের ভরসার জায়গা। ওয়েবসাইটগুলোতে ফোন নম্বর দেওয়া থাকে। ফোনে তাদের সঙ্গে কথা বলে পণ্য সম্পর্কে আরও বিস্তারিত ধারণা নিয়ে অর্ডার দেওয়ার পর কোনো ঝামেলা ছাড়াই বাসায় পৌঁছে যায় পছন্দের পণ্যটি। শুধু অতিরিক্ত সার্ভিসিং চার্জ দিতে হয়। গত কয়েক বছর ধরেই অনলাইনে কেনাকাটার প্রতি আস্থা বেড়েছে ক্রেতাদের।

গত এক বছরে বিশ্বব্যাপী অনলাইনে পণ্য বিক্রি হয়েছে প্রায় অড়াই হাজার ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিশ্বজুড়ে থাকা খুচরা বাজারের একটি বড় অংশ দখল নিতে চলেছে অনলাইন বিজনেস। ধারণা করা হচ্ছে এ বছর বিশ্বব্যাপী মোট জনসংখ্যার ৪৭ দশমিক তিন ভাগ মানুষ অনলাইনে পণ্য কিনবে।

বাংলাদেশে রকমারি ডট কম, ক্লিকবিডি ডট কম, বিক্রয় ডট কম, প্রিয়শপ ডট কম, উপহারবিডি ডট কম, আমাজন, ইজিটিকেট ডট কম, আইটিবাজার২৪ ডট কম, বাগডুম ডট কম, পিকাবু ডট কম, দারাজ অনলাইন, কিকসা ডট কম, অথবা ডট কম, চাল-ডাল ডট কমসহ অসংখ্য অনলাইন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ভোক্তাদের পছন্দমতো দ্রব্যসামগ্রী দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয় অনলাইন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো। মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে অর্ডার দেওয়া যায় খুব সহজে। গ্রাহকের প্রয়োজন মেটাতে অনলাইন প্রতিষ্ঠানগুলো নানারকম প্রণোদনা দিয়ে থাকে।

অনলাইনে কেনাকাটা করার সুবিধা অনেক। সেখানে নিজের পছন্দমতো জিনিস নিজেই বেছে নিতে পারবেন। কাউকে পণ্যসমগ্রী কিনতে বাধ্য করা হয় না। কেনাকাটায় ঝামেলামুক্ত ও সহজ এই মাধ্যমে ঝুঁকছে নতুন প্রজন্ম। ই-কমার্স জীবনকে সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করছে বলে মনে করেন কর্মজীবী নারীরা। নারী-পুরুষ উভয়ের কাছেই ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে অনলাইনে শপিং। সরকার তথ্যপ্রযুক্তি সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছে বলেই মানুষ এর সুফল ভোগ করছে।

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ ➧

সর্বশেষ..