প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

ই-টিআইএন নিয়ে রিটার্ন না দিলে জরিমানা

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশে প্রায় ৪০ লাখ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ইলেকট্রনিক করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (ই-টিআইএন) নিয়েছে। এর মধ্যে রিটার্ন দাখিল করে প্রায় ১৮ লাখ। ই-টিআইএন নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে করযোগ্য থাকলেও রিটার্ন দাখিল করে না অনেকে। তাদের এনবিআর কোনোভাবেই শনাক্ত করতে পারে না। ফলে বিপুলসংখ্যক করযোগ্য ব্যক্তি বছরের পর বছর কর আওতার বাইরে থেকে যায়। আগামী অর্থবছরের বাজেটে রিটার্ন দাখিল না করা ব্যক্তিদের চিহ্নিত ও জরিমানা আরোপের বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া।
গতকাল এনবিআর সম্মেলন কক্ষে প্রাক-বাজেট আলোচনায় গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি এ কথা জানান। সভায় সিপিডি ছাড়াও বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি ও প্রাইস ওয়াটারহাউজ কুপাস (পিডব্লিউসি) প্রতিনিধিরা অংশ নেন। একই দিন বিকালে ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বারের (এফআইসিসিআই বা ফিকি) সঙ্গেও আলাচনায় বসে এনবিআর।
সভায় সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, এনবিআর বলছে এবারের বাজেট ব্যবসাবান্ধব হবে। সিপিডিও মনে করে, বাজেটটা যাতে ব্যবসায়ীবান্ধব না হয়। কারণ ব্যবসা ও ব্যবসায়ীবান্ধব এক কথা নয়। ব্যবসাবান্ধব বাজেট হলে শুধু ব্যবসায়ী নয়, চাকরিজীবী এবং সাধারণ মানুষ এটার ফল ভোগ করতে পারবে। ব্যবসায়ীবান্ধব হলে কিছুসংখ্যক পুঁজি নিয়ন্ত্রণকারীর পকেট ভারী হবে। ধীরে ধীরে বৈষম্য আরও বাড়বে। জুলাই থেকে বাস্তবায়ন হতে যাওয়া ভ্যাট আইনে কী ধরনের পরিবর্তন আসছে, তা এখনও পরিষ্কার নয় বলে উল্লেখ করে বাজেটের আগেই এর একটি পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা দেওয়ার প্রস্তাব দেন তিনি।
শেষ সময়ে তড়িঘড়ি করে আইনি সংস্কার করতে গিয়ে ভুল হলে তাতে এনবিআরের ঘাড়ে দায় চাপবে বলেও মনে করেন তৌফিকুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, যাদের ই-টিআইএন আছে তারা ঠিকমতো রিটার্ন দিচ্ছেন কি না তা এনবিআর খতিয়ে দেখতে পারে। রিটার্ন জমা না দেওয়া ই-টিআইএনধারীদের খুঁজে বের করার সুযোগ এনবিআরের হাতে রয়েছে। মোবাইল ফোনে কল দিয়ে এবং এসএমএ, ই-মেইল কিংবা ডিজিটাল ব্যবস্থায় এটি করা সম্ভব। তাদের ওপর সামাজিক ও নৈতিক চাপ তৈরি করা যায়। প্রতিবছর কী পরিমাণ বাজেটে ইনসেনটিভ দেওয়া হয়, তা প্রকাশ করার দাবি জানান তিনি।
বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি ড. আবুল বারকাত বলেন, শুল্ক ও ভ্যাট হ্রাস-বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সরকারের বিবেচ্য হতে হবে। অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস, ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন, দারিদ্র্য নিরসন ও জনকল্যাণ নিশ্চিত করতে হবে। তিনি রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতার পদক্ষেপ গ্রহণ এবং আয়বৈষম্য হ্রাসে পরোক্ষ করের তুলনায় প্রত্যক্ষ করহার বেশি করার পরামর্শ দেন। অর্থনীতি সমিতি কর অব্যাহতির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার প্রস্তাব করেন। একই সঙ্গে তারা করজাল সম্প্রসারণে ইউনিয়ন পর্যায়ে কর প্রশাসনের কার্যক্রম বিস্তৃত করার পরামর্শ দেন।
তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে সাত লাখ কোটি টাকার বেশি কালোটাকা আছে, যা সরকারের দুটি অর্থবছরের বাজেটের সমান। অর্থাৎ এ টাকা দিয়ে সরকার দুটি অর্থবছরের বাজেট পরিচালনা করতে পারবে। সব কালোটাকা উদ্ধার করে একসঙ্গে অর্থনীতির মূল স্রোতে আনা সম্ভব নয়; তবে কীভাবে অর্থনীতিতে আনা যায়, বাজেটে তার একটি পরিকল্পনা থাকা দরকার। আসছে বাজেটে অন্তত ২৫-৩০ হাজার কোটি টাকা যাতে উদ্ধার করা যায়, সেই লক্ষ্যমাত্রা থাকা উচিত বলে মত দেন তিনি। বারকাত বলেন, প্রতি বছর ৭০-৮০ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হচ্ছে, তা রোধ করারও সুস্পষ্ট উদ্যোগ বাজেটে রাখা দরকার।
পিডব্লিউসি বাংলাদেশের ম্যানেজিং পার্টনার মামুন রশিদ বলেন, কনসালট্যান্সি ফার্মসহ বড় বড় প্রকল্পে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা করপোরেট করের পাশাপাশি উইথহোল্ডিং ট্যাক্সের কারণে আগ্রহ হারাচ্ছেন। বিনিয়োগ উৎসাহে বিষয়টি ভাবা উচিত। টোব্যাকো ও নিম্নস্তরের সিগারেটের ওপর কর তুলনামূলকভাবে বৃদ্ধি না করায় বাজার সয়লাব হয়ে গেছে, চোরাচালান বেড়ে গেছে। এ খাতে দাম বাড়ালে কর আদায় বাড়বে।
সংগঠনটির পার্টনার সুস্মিতা বসু বলেন, বিদেশি বিনিয়োগের করকাঠামো ঠিক করে দেওয়া হলে বিনিয়োগ বাড়বে। অনলাইন বিজ্ঞাপন (ফেসবুক, গুগল, ইউটিউব, আমাজন) ট্যাক্স বিষয়ে গাইডলাইন হলে ট্যাক্স আসবে। অন্য দেশ কীভাবে এ খাত থেকে ট্যাক্স আদায় করে, তা আমরা জানি। এনবিআর সহযোগিতা চাইলে আমরা দেব। বিদেশি কর্মীরা কর দিতে চায়, কিন্তু ই-টিআইএন নিতে পারে না। তাদের ই-টিআইএন দিলে এনবিআর ট্যাক্স আদায় করতে পারবে।
নতুন ভ্যাট আইন-সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রস্তাবনার বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, আমরা চাচ্ছি ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন শুরু হোক। এরপর সব পর্যায়ের স্টেকহোল্ডারদের পরামর্শ নিয়ে কোথাও সংশোধনের প্রয়োজন হলে সেটা করা যাবে। আগামীতে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধের ব্যাপারে এনবিআর কঠোর হবে বলে তিনি জানান।
চেয়ারম্যান বলেন, আমরা গতবছর যদিও বলেছি ফেসবুক, গুগল, ইউটিউবের বিজ্ঞাপনে কর বসাব, কিন্তু আমরা সঠিকভাবে মনোযোগ দিতে পারেনি। আমাদের যে জনবল সক্ষমতা তাতে আমরা কর আদায় করতে পারব না। আমরা আউটসোর্সিং করলে এ খাত থেকে ভালো ফল পেতাম, আমরা আউটসোর্সিং করব। বিদেশিদের জন্য ই-টিআইএন সমস্যা সমাধান করা হবে। এছাড়া সংগঠনের পক্ষ থেকে নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা তুলে ধরা হয়।
অপরদিকে জুলাই থেকে কার্যকর হতে যাওয়া ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের বিষয়ে ব্যবসায়ীদের কাছে পরিষ্কার ধারণা না থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ফিকি। আইনটি কার্যকর হওয়ার পর সফটওয়্যারসহ নিজেদের প্রস্তুত করার জন্য সময় দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন ফিকি সভাপতি শেহজাদ মুনিম। তিনি বলেন, আইনটি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে বাজারে গুজব রয়েছে। এজন্য সঠিক পরিকল্পনা দরকার।
এ সময় তিনি বলেন, বাজেটে যেসব পরিবর্তন আনা হয়, এর কী ধরনের প্রভাব পড়ে, তার বিশ্লেষণ করে তা প্রকাশ করা দরকার। ফিকির পক্ষ থেকে বলা হয়, বাংলাদেশে করহার অন্যান্য প্রতিযোগী দেশের চেয়ে বেশি। এক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি কর পরিকল্পনা থাকা দরকার।

সর্বশেষ..