প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

ঈদের পর বাজারে সয়াবিন তেলের সংকটের আশঙ্কা

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: চলমান ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে বাড়তে থাকে সয়াবিন তেলের দাম। বর্তমানে গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ দামে বিকিকিনি হচ্ছে এটি। আর আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির প্রবণতা থাকায় আমদানিকারকরা ঋণপত্র খোলার (এলসি) হারও কমিয়ে দিয়েছেন। এর মধ্যে খুচরা ও পাইকারি বাজারে পণ্যটির সরবরাহ কমায় প্রতিনিয়ত দাম বাড়ছে। এ অবস্থায় দ্রুত আমদানি করা না হলে দেশে ঈদের পর সয়াবিন তেলের সরবরাহে সংকট দেখা দিতে পারে। এতে বাজারের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।

কয়েকজন সয়াবিন তেল আমদানিকারক বলেন, গত বছর সয়াবিন তেলের বার্ষিক গড় দাম আগের বছরের তুলনায় ৬৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল। প্রতি মেট্রিক টনের মূল্য ৮৩৮ ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১ হাজার ৩৮৫ ডলারে উন্নীত হয়। আর চলতি বছরের মার্চে এক হাজার ৯৬৫ ডলার পর্যন্ত উঠে যায়। যদিও দাম কিছুটা হ্রাস পেয়ে গতকাল এক হাজার ৯৫০ ডলারের লেনদেন হয়। এ দাম বৃদ্ধির সর্বশেষ প্রভাবক হিসেবে ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যকার যুদ্ধ বড় ভূমিকা রেখেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। যদিও প্রথম দিকে দাম বৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রভাবকের ভূমিকা পালন করেছিল দক্ষিণ আমেরিকা। এ অঞ্চলে বৈরী আবহাওয়াজনিত কারণে উৎপাদন ঘাটতি দেখা দেয়। ফলে শীর্ষ ব্যবহারকারী দেশগুলো সরবরাহ নিশ্চিত করতে গিয়ে বিপাকে পড়ে। আবার বড় বড় আমদানিকারক দেশগুলোর চাহিদা আগের তুলনায় বেড়ে যাওয়ায় দাম লাগামহীনভাবে বাড়তে থাকে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা যায়, গত ২০২০-২১ অর্থবছরে অপরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানি হয়েছে ৭ লাখ ৮৫ হাজার টন। আর সয়াবিন বীজ আমদানি হয় প্রায় ২৪ লাখ টন। এসব বীজ থেকে পাওয়া যায় ৪ লাখ ৫০ হাজার টন তেল। অর্থাৎ সবমিলিয়ে প্রায় ১২ লাখ টন সয়াবিন। এতে প্রায় ২৪ লাখ টন আমদানি হয়েছে। গত বছর জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে বাজারজাত হয়েছিল ১ লাখ ২১ হাজার টন সয়াবিন তেল। এ বছর একই সময়ে গতবারের চেয়ে ৪৮ হাজার টন বেশি তেল আমদানি হয়েছে। আবার গত বছরের চেয়ে এবার জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে সয়াবিন বীজ আমদানি বেশি হয়েছে ৪০ হাজার টন। তাতে বীজ থেকে সয়াবিন তেল উৎপাদনও আগের তুলনায় বেড়েছে। কিন্তু গত মার্চে মাত্র ১৪ হাজার টন সয়াবিন তেল আমদানির ঋণপত্র খোলা হয়েছে, যা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক কম।

অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত ভোজতেল আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে ৮৮০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের। এর মধ্যে ৬৮২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে, গত অর্থবছরের একই সময়ে এলসি খোলা হয়েছিল ৪৫১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের।

আর এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে ৪৩৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের। অর্থাৎ, গত বছরের তুলনায় ২৪৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি তেল আমদানি হয়।

দেশে সয়াবিন তেলের বাজারে সিটি গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ, টিকে গ্রুপ, বাংলাদেশ এডিবয়েল, এস আলম গ্রুপ ও বসুন্ধরা গ্রুপ বড় সরবরাহকারী। এসব গ্রুপের বিপণন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িতরা বলেন, বাজারে সয়াবিনের চাহিদা কম। বিশেষ করে বড় পাইকারদের চাহিদাপত্র কম পাওয়া যাচ্ছে। কারণ ক্রেতারা আগেই তেল কিনে রেখেছে। আর আন্তর্জাতিক বাজরে তেলে দাম বেশি হওয়ায় তেল আমদানির জন্য এলসি খোলার হার কম। কারণ সবাই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। এর মধ্যে যুদ্ধ বিরতির একটা ঘোষণা কিংবা সমঝোতার আভাস ছিল। এটা হলে দাম অনেকটা কমার সম্ভাবনা ছিল ছিল। কিন্তু যুদ্ধ বিরতি হয়নি।

অন্যদিকে চট্টগ্রামের পাইকারি ও খুচরা দোকানদাররা বলেন, বোতলজাত সয়াবিনের সরবরাহ থাকলেও তা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক কম। ১০ কার্টন পণ্য বুকিংয়ের বিপরীতে দুই কার্টন মাল পাওয়া যাচ্ছে। এভাবে হলে ঈদের আগে কিংবা পরে একটা সংকট তৈরি হবে। তখন বড় কোম্পানিগুলো দাম বাড়িয়ে পণ্য বিক্রি করবে। আমাদের ধারণা, সরকার মিলগেটে খোলা সয়াবিন তেলের লিটারপ্রতি দাম বেঁধে দিয়েছে ১৩৬ টাকা। এখন সয়াবিন তেল আমদানি করে বাজারজাত করলে লিটারে খরচ দাঁড়াচ্ছে ১৬৫ থেকে ১৭৫ টাকা। ব্যবসায়ীরা স্বীকার না করলেও লোকসানের কথা ভেবেই তারা সয়াবিন তেল আমদানির ঋণপত্র খোলার হার কমিয়ে দিয়েছেন। যার প্রভাবে দুই সপ্তাহের ব্যবধানে খাতুনগঞ্জ পাইকারি বাজারগুলোতে খোলা পাম তেলের দাম প্রতি মণে (৩৭ দশমিক ৩২ লিটার) ৭০০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে পাঁচ হাজার ১০০ টাকায়। আর খোলা সয়াবিন ৮০০ টাকা বেড়ে প্রতিমণ বিক্রি হচ্ছে পাঁচ হাজার ৯০০ টাকায়।

একাধিক ব্যবসায়ী নেতা ও ভোক্তা অধিকার আন্দোলন কর্মীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, বাংলাদেশে মাত্র কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ভোজ্যতেল আমদানি করে। অথচ মুক্তবাজার অর্থনীতিতে যে কেউ আমদানি করতে পারে। আর আমদানিকৃত ভোজ্যতেলের বেশির ভাগই অপরিশোধিত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পরিশোধিত ভোজ্যতেল আমদানি করা হলে দেশের বাজার স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হতো। আবার পরিশোধিত ভোজ্যতেল আমদানির সুযোগ দিয়ে বাজার উš§ুক্ত করে দেয়া হলে মুষ্টিমেয় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ওপর একক নির্ভরশীলতা কমবে এবং বাজার স্থিতিশীল থাকত। এছাড়া বাংলাদেশ ট্রেডিং করপোরেশনও সরাসরি আমদানি করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গত সোমবার টিকে গ্রুপের পরিচালক তারিক আহমেদ শেয়ার বিজকে বলেন, ‘এখন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি মেট্রিক টন সয়াবিন তেল এক হাজার ৯৫০ ডলার এবং পাম্প অয়েল এক হাজার ৭৫০ ডলারে বুকিং হচ্ছে। আর আমরা এতদিন বাজারে যেসব তেল সরবরাহ করেছি তা মূলত এক হাজার ৩০০ ডলারে কেনা তেল। মূলত রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বাজারের অস্থিরতা তৈরি হয়। আর যুদ্ধের কারণে ৭০ লাখ টন সূর্যমুখী তেল সরবরাহ কমে গেছে। এ ধারা অব্যাহত থাকবে। এজন্য আমরা সরকারের কাছে মূসক ও ভ্যাট প্রত্যাহার চেয়েছিলাম। সরকারও কমিয়েছিল। আগামী দিনে বাজার পরিস্থিতি বুঝে সরকার পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে বলে আশা করছি।’

ভোজ্যতেলের আমদানিতে জড়িত নাম প্রকাশে অনচ্ছিুক একটি শিল্পগ্রুপের চেয়ারম্যান শেয়ার বিজকে বলেন, বর্তমান বুকিং রেট অনুসারে তেল বাজারজাত করতে হলে লিটারে খরচ পড়বে ১৭৬ টাকা। কিন্তু সরকার তো ১৬০ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে। ফলে লোকসানের বিষয় জড়িত থাকায় ঋণপত্র কম খোলা হচ্ছে। এটা স্বাভাবিক। আর ব্যবসা চলে চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে। এখানে দাম নির্দিষ্ট করে দিলে হয়তো সাময়িক সুবিধা পাওয়া যায়। কিন্তু এর নেতিবাচক প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী হয়।