মত-বিশ্লেষণ

ঈদে মিলাদুন্নবী: উৎপত্তি ও কারণ

শাহ আলম বাদশা : ঈদে মিলাদুন্নবী বা সিরাতুন্নবী (সা.) ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের কাছে জনপ্রিয় একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান, যদিও এটি কোনো ইবাদত নয়। তাই আরবি বা হিজরি সনের রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ ‘নবীদিবস’ হিসেবে জাঁকজমকপূর্ণভাবে ও যথাযথ মর্যাদায় পালিত হয়ে থাকে। দিবসটি পালনের সঙ্গে মুসলমানদের রাসুলপ্রেম ও ইসলামি আবেগ জড়িত। দিবসটি বিশ্বের সব মুসলিম দেশ বা মুসলিম সম্প্রদায় পালন না করলেও অনেক দেশে সরকারি-বেসরকারিভাবে তা পালিত হয়। দিনটি বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত হওয়ায় এদিন সরকারি সাধারণ ছুটিও ঘোষিত হয়ে থাকে। আর ‘মিলাদুন্নবী’ শব্দটির ব্যাপারে অনেকের আপত্তি থাকায় এদেশে কেউ কেউ একে ‘সিরাতুন্নবী’ নামেও পালন করে।

উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, ঈদে মিলাদুন্নবী (আরবি: মাওলিদু এন-নাবী, আরবি: মাওলিদ আন-নাবী, কখনও কখনও সহজভাবে বলা হয়  মাওলিদ, মেভলিদ, মেভলিট, মুলুদ-সহ আরও অসংখ্য উচ্চারণ; কখনও কখনও মিলাদ হচ্ছে শেষনবীর জš§দিন হিসেবে মুসলমানদের মাঝে পালিত একটি উৎসব। মুসলমানদের মাঝে দিনটি বেশ উৎসবের সঙ্গে পালিত হতে দেখা যায়। তবে উৎসব নিয়ে ইসলামি পণ্ডিতদের মাঝে অনেক বিতর্ক রয়েছে। হিজরি বর্ষের তৃতীয় মাস রবিউল আউয়ালের ১২ তারিখে এ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশি মুসলমানরা এই দিনকে ঈদে মিলাদুন্নবী বলে অভিহিত করেন। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের কাছে এই দিন ‘নবীদিবস’ নামে পরিচিত।

মূলত মুসলিম সম্প্রদায়ের সর্বশেষ নবী ও রাসুল মুহাম্মদের (সা.) একই দিনে জন্ম ও মৃত্যু হওয়ার বিশ্বাস থেকেই ঈদে মিলাদুন্নবীর উৎপত্তি, যদিও তাঁর জন্মের বছর, মাস ও তারিখ সম্পর্কে ঐতিহাসিকভাবে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য নেই এবং থাকার কথাও নয়। কারণ তিনি রাসুল বা নবী হিসেবে মনোনীত হবেন, এ ব্যাপারটি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও জানার বাইরে থাকায় তা লিপিবদ্ধ হওয়ার কারণ ঘটেনি। তাই তিনি অবিখ্যাত বা একটি সাধারণ শিশু হিসেবেই ৫৭০ বা ৫৭১ খ্রিষ্টাব্দে মক্কার সম্ভ্রান্ত কুরাইশ বংশে জন্মগ্রহণ করেন। সে সময় কুরাইশ বংশের হাতে পবিত্র কাবাঘরের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব থাকায় তাঁর সম্ভ্রান্ত ও উচ্চবংশীয় হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহ নেই। মুহাম্মদের (সা.) জন্মতারিখের ব্যাপারে পারিবারিক কিংবা নির্ভরযোগ্য তথ্য না থাকলেও অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে, তাঁর জš§ হয়েছিল পবিত্র কাবা শরিফ ধ্বংসের জন্য বাদশাহ আবরাহার নেতৃত্বে হস্তীবাহিনীর আগমন ঘটেছিল যে বছর। তবে নবী হিসেবে ব্যাপক প্রভাব-প্রতিপত্তি ও জনপ্রিয়তার কারণে ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দের ৮ জুন বা ১২ রবিউল আউয়াল তাঁর মৃত্যুর ব্যাপারটি ঐতিহাসিক ও সন্দেহাতীতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং সম্পূর্ণ বিতর্কহীন। ঐতিহাসিকদের মতে, ৫৭০ কিংবা ৫৭১ খ্রিষ্টাব্দে রবিউল আউয়াল মাসের ৯ তারিখ সোমবারই হচ্ছে তাঁর জন্মদিবস। কেননা ক্যালেন্ডারের হিসাবে ১২ রবিউল আউয়ালে কখনওই সোমবার ছিল না বলে গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে। নিজের জন্মসন ও তারিখের উল্লেখ ব্যতীত স্বয়ং রাসুলও নিজের জš§দিবসের ব্যাপারটা হাদিসে বর্ণনা করেছেন আবু কাতাদা আনসারি (রাদিআল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহকে (সা.) সোমবারে রোজা রাখার কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। তিনি বলেন, এদিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এদিন আমাকে নবুওয়াত প্রদান করা হয়েছে, অথবা এদিন আমার ওপর (অহি) নাজিল হয়েছে। (সহিহ মুসলিম: ১১৬২)” উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, ‘হিজরি চতুর্থ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে ঈদে মিলাদুন্নবীর প্রচলন শুরু হয়। রাসুল, আলী, ফাতেমা, হাসান ও হুসাইনের জন্মদিন এসবের মূল প্রর্বতক ছিল খলিফা আল মুয়িজ্জু লি-দিনিল্লাহ।

উল্লেখ্য, মিসরের এসব অনুষ্ঠান তখনও মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েনি। পরবর্তী সময়ে যিনি ঈদে মিলাদুন্নবীকে মুসলিম বিশ্বের অন্যতম উৎসব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন, তিনি ইরাক অঞ্চলের ইরবিল প্রদেশের আবু সাঈদ কুকবুরী। সে হিসাবে জানা যায়, সপ্তম হিজরি থেকে আনুষ্ঠানিক মিলাদ উদ্যাপন শুরু হয়। মিলাদের ওপর সর্বপ্রথম গ্রন্থ রচনা করেন আবুল খাত্তাব ওমর ইবনে হাসান ইবনে দেহিয়া আল কালবি।

রাসুল ও সাহাবাদের কেউই নিজেদের জš§দিন ও মৃত্যুদিন পালন না করলেও কিংবা পালন করতে না বললেও প্রচলিত ঈদে মিলাদুন্নবীর (সা.) লক্ষ্য হচ্ছে, রাসুলপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ ঘটানো এবং তাঁর জীবনের মিশন-ভিশনকে জনসাধারণ্যে ব্যাপকভাবে প্রচার করা। আর উদ্দেশ্য হচ্ছে, নিজেদের জীবনে তাঁর আদর্শ প্রতিষ্ঠার অনুপ্রেরণাকে জাগরূক রাখা।

আইয়ামে জাহেলিয়াত বা আরবের অন্ধকার যুগের অবসান ঘটিয়ে তৌহিদের মহান বাণী অর্থাৎ শিরকমুক্ত ইমান ও আমলের মিশন-ভিশন নিয়ে এসেছিলেন এ মহামানব। তিনি তাঁর ও তাঁর সঙ্গীদের নিষ্কলুষ চরিত্রমাধুর্য দিয়ে প্রচার করেছেন শান্তিময় জীবনব্যবস্থা ইসলামকে। তাঁর আবির্ভাব ও আল্লাহকে পাওয়ার জন্য বিভিন্ন মিডিয়া কিংবা দেব-দেবী ও মূর্তির কাছে ধরনা, অর্থাৎ বহুত্ববাদের স্থলে একত্ববাদভিত্তিক ইসলামের শান্তি ও সাম্যের বাণীর প্রচার এবং মদিনাসহ বিভিন্ন দেশে ইসলামি খিলাফত বা রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় তাঁর কালজয়ী নেতৃত্ব ও আন্দোলন সারা বিশ্বেই আলোড়ন সৃষ্টি করে। আরব বিশ্ব যখন বহুত্ববাদসহ ব্যাপক অন্যায়-অত্যাচার, পাপাচার, নারী নির্যাতন, বৈষম্য, বর্ণভেদ প্রভৃতি অপকর্মে ডুবে গিয়েছিল, তখন  পূর্বসিদ্ধান্ত অনুযায়ী মহান আল্লাহ তাঁর মনোনীত বিশ্বনবীকে (সা.) বিশ্বজগতের রহমতস্বরূপ পাঠিয়েছিলেন। আল্লাহ বলেন, (হে নবী!) আমরা তো তোমাকে বিশ্বজগতের জন্য কেবলই রহমত বা অনুগ্রহস্বরূপ পাঠিয়েছি।’ (সুরা আম্বিয়া: ১০৭)। এর অর্থই হলো, তাঁর আগের লক্ষাধিক নবী-রাসুল অঞ্চলভিত্তিক ইসলাম প্রচার করলেও মুহাম্মদকে (সা.) আঞ্চলিক বার্তাবাহক হিসেবে নয়, বিশ্বনবী করেই পাঠানো হয়েছে। নবুয়তপ্রাপ্তির  আগেও বিবেকবান ও মানবতাবাদী এ মহাপুরুষ মাত্র ১৭ বছর বয়সে সমমনা বন্ধুদের নিয়ে আরবের যুদ্ধবিগ্রহ ও অন্যায়-পাপাচারের মূলোৎপাটনে ‘হিলফুল ফুজুল’ নামক একটি আর্থসামাজিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে মানুষের কল্যাণসাধনায় আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর কাছে আল্লাহর পথনির্দেশ না থাকলেও তিনি নিজেদের মনগড়া পন্থায় একটানা ২৩ বছর হিলফুল ফুজুলের মাধ্যমে আর্তমানবতার সেবায় যে ব্যাপক কল্যাণমূলক কাজ করেছেন, তারই ফলে আরবের খারাপ মানুষেরাও তাঁকে ‘আল-আমিন’ বা বিশ্বস্ত কিংবা ‘আস-সাদিক’ বা সত্যবাদী বলে উপাধি দেয়। 

এরপর তিনি ৪০ বছর বয়সে নবুয়ত লাভ করে শুধু আরব নয়, বিশ্ববাসীর কল্যাণের জন্য আল্লাহপ্রদত্ত ‘পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা’ (ঈড়সঢ়ষবঃব ঈড়ফব ড়ভ খরভব) ইসলামের পথে কাফির-মুশরিকদের মুক্তি ও শান্তির পথে আহ্বান জানান। ফলে মহানবী (সা.) ও ইসলাম গ্রহণকারী সাহাবাদের দীর্ঘ ২৩ বছরের আন্দোলনের ফলে মক্কা-মদিনাসহ অর্ধ দুনিয়ায় ইসলামি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং জঘন্য চরিত্রের মানুষগুলো সোনার মানুষে রূপান্তরিত হয়ে যায়। তাদের মধ্য থেকে নির্বাচিত চার খলিফা বা ‘খেলাফতে রাশিদা’ কর্তৃক আরও ৩২ বছর পর্যন্ত বিশ্বে মানবিক ও জনকল্যাণমূলক ইসলামি শাসনের অভূতপূর্ব নজির স্থাপিত হয়। এভাবে রাসুল (সা.) নবুয়তপ্রাপ্তির পর আবার সেই ২৩ বছরেই আল্লাহর বিধান দ্বারা বিশ্বে একটি নতুন জাতি গঠন ছাড়াও কল্যাণমূলক ইসলামি শাসনের বাস্তবায়ন করে দেখিয়ে গেছেন যে, মানুষের সীমাবদ্ধ জ্ঞানবুদ্ধি ও মস্তিষ্কপ্রসূত মনগড়া জীবনব্যবস্থায় কখনও নিরপেক্ষ, সার্বিক ও ভারসাম্যপূর্ণ কল্যাণসাধন হতে পারে না। অবশেষে আল্লাহপ্রদত্ত দায়িত্ব-কর্তব্য অর্থাৎ রিসালতের মিশন সফল করে মহানবী (সা.) ৬৩ বছর বয়সে পরলোকগমন করেন।  

বাংলাদেশে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে যেমন মিডিয়ায় শুভেচ্ছাবাণী প্রচার করা হয়, তেমনই ধর্ম মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন নানা কর্মসূচি পালন করে থাকে। এসব কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে মহানবীর (সা.) ওপর আলোচনা সভা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল প্রভৃতি। এছাড়া সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি ভবন এবং সশস্ত্র বাহিনীর সব স্থাপনায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন, জাতীয় পতাকা ও ‘কালিমা তায়্যিবা’ লেখা-সংবলিত ব্যানার-ফেস্টুন ঢাকা মহানগরসহ সারা দেশের গুরুত্বপূর্ণ সড়কদ্বীপ ও লাইটপোস্টে প্রদর্শনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে। এ উপলক্ষে ইসলামিক ফাউন্ডেশন পক্ষকালব্যাপী নবীজীবনের (সা.) ওপর আলোচনা সভা, মাহফিলসহ বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করে থাকে। বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতারসহ বেসরকারি মিডিয়াও যথাযোগ্য গুরুত্বসহ বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করে। এমনকি এ উপলক্ষে দেশের সব হাসপাতাল, কারাগার, সরকারি শিশুসদন, প্রবীণনিবাস ও মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে উন্নত খাবার পরিবেশনের ব্যবস্থাও নেওয়া হয়ে থাকে।

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..