মত-বিশ্লেষণ

ঈদ উৎসবে টাকা সতর্কতা সমাচার

রিয়াজুল হক: ঈদুল ফিতর দেশের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। কভিডকালেও বাজারে যে ভিড় দেখা যাচ্ছে, তাতে উৎসবের এই সময় কেনাকাটা উপলক্ষে বাজারে টাকার প্রবাহ কম হওয়ার কথা নয়। প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করে ব্যাংকও খোলা আছে। ঈদের সময়ে বাজার, শোরুম ও ব্যাংকে ভিড় বেশি থাকে এবং সবখানেই টাকার প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা রয়েছে, তাই সতর্কতা অবশ্যই জরুরি। কারণ বিভিন্ন ধরনের অপরাধীরা ঈদের এই ব্যস্ত সময়টাকে বেছে নেয়।

ঈদের আগে অতিরিক্ত সতর্কতা যেমন জরুরি, তেমনি বাজারে জাল টাকার বিষয়ে সতর্কতা, বড় নোটের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ধারণা রাখা এবং ব্যাংক থেকে টাকা তোলার পর গন্তব্যে যাওয়া পর্যন্ত সতর্ক থাকা জরুরি।

অনেকেই কেনাকাটার জন্য দোকানগুলোয় ভিড় করছেন। উৎসবের এই সময়ে জাল টাকার কারবারিরা অনেক তৎপর থাকে। ভুক্তভোগী হয় সাধারণ মানুষ। দু-তিন দিন আগেও ঢাকায় ভাড়া বাসা থেকে জাল টাকা এবং জাল টাকা তৈরির সরঞ্জামসহ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। অর্থাৎ সাবধান হওয়া ছাড়া উপায় নেই। বিশেষ করে বাজারে নতুন নোট দেখলে একটু বেশি সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। সাধারণত জাল টাকার নোটগুলো নতুন হয়ে থাকে, কারণ জাল টাকার নোটগুলো সাধারণ কাগজের তৈরি, তাই পুরনো হয়ে গেলে সেই নোট অনেকটা নষ্ট হয়ে যায়, যা অতি সহজেই বোঝা যায়। পুরনো জাল টাকার নোট ঝাপসা দেখায়, আসল নোটের মতো ঝকঝকে থাকে না সেটা নতুন হোক আর পুরনো হোক এবং এ ধরনের নোট কিছুটা পাতলা বা হালকা ধরনের হয়, যা একজন আরেকজনের কাছ থেকে টাকা লেনদেন করার সময় একটু মনোযোগসহ দেখলেই বোঝা যায়। জাল নোট হাতের মধ্যে নিয়ে মুষ্টিবদ্ধ করে কিছুক্ষণ পর ছেড়ে দিলে তা সাধারণ কাগজের মতো ভাঁজ হয়ে যাবে, আর আসল নোট ভাঁজ হবে না। যদিও সামান্য ভাঁজ হবে, তবুও তা জাল নোটের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি দেখা যাবে। টাকা সবসময় দুটি অংশ দিয়ে তৈরি হয়। টাকার দুই পাশে দুটো নোট জোড়া লাগানো থাকে এবং এটা হরিণের চামড়া দিয়ে তৈরি বলে পানিতে ভেজালেও খুব তাড়াতাড়ি ভেঙে যাবে না। আর জাল নোট পানিতে ভেজানোর সঙ্গে সঙ্গেই তা ভেঙে যাবে। আসল নোট সবসময় খসখসে হবে।

অনেক দেশের মুদ্রাবাজার জাল নোটে ভরপুর। জাল ও কালোটাকা বেশ কিছু দেশের মুদ্রাবাজারে এমনভাবে ছড়িয়ে রয়েছে যে সরকার পর্যন্ত সেটা নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খাচ্ছে। এই সমস্যা দূরীকরণসহ মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরার জন্য ভেনিজুয়েলা দেশটির বহুল ব্যবহƒত ১০০ বলিভার নোট বাতিল করেছিল। ভারত তার মুদ্রাবাজারের সর্বোচ্চ দুটি মানের রুপিও বাতিল করেছিল। মূলত যেসব কারণে ভেনিজুয়েলা কিংবা ভারত নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তার একটি হচ্ছে বাজার থেকে জাল নোট মুক্ত করা। জাল নোট আমাদের দেশের জন্যও হুমকিস্বরূপ। জাল টাকা যেহেতু ছড়িয়ে রয়েছে, তাই আমাদের জানা উচিত আসল টাকার কিছু বৈশিষ্ট্য। অন্যথায় কষ্টের উপার্জিত টাকা কখন যে জাল টাকায় রূপ নেবে, তা আদৌ বলা যায় না। সাধারণ মানুষের কিছুটা সচেতনতার অভাব এবং জাল নোট কারবারিদের নিত্যনতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবনের সমস্যা সবাইকেই ভাবিয়ে তুলেছে। প্রত্যেকেরই জানা উচিত আসল নোটের বৈশিষ্ট্যগুলো। বড় নোটের ক্ষেত্রে জাল করার বিষয় জড়িত থাকে। এজন্যই বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নির্ধারিত ৫০০ ও ১০০০ টাকা মূল্যমানের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি-সংবলিত আসল ব্যাংক নোটের কিছু সহজ বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা খালি চোখে দ্রুত বোঝা যায়।

কাগজ: নোটটি সিনথেটিক ফাইবার-মিশ্রিত অধিক টেকসই কাগজে মুদ্রিত হবে।

ইন্টাগ্লিও লাইন: নোটের ডানদিকে আড়াআড়িভাবে ইন্টাগ্লিও কালিতে সাতটি সমান্তরাল লাইন আছে।

অসমতল ছায়া: নোটের সামনের দিকে ইন্টাগ্লিও কালিতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি মুদ্রিত আছে।

অন্ধদের জন্য বিন্দু: ১০০০ টাকার নোটের ডানদিকে অন্ধদের জন্য পাঁচটি ছোট বিন্দু এবং ৫০০ টাকার নোটের ডানদিকে অন্ধদের জন্য চারটি ছোট বিন্দু রয়েছে, যা হাতের স্পর্শে উঁচু-নিচু অনুভূত হবে।

রং পরিবর্তনশীল হলোগ্রাফিক সুতা: নোটের বাঁ পাশে চার মিলিমিটার চওড়া নিরাপত্তা সুতা, যাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের লোগো ও ৫০০, ১০০০ টাকা লেখা আছে; সরাসরি দেখলে লোগো ও ৫০০, ১০০০ টাকা সাদা দেখাবে; কিন্তু পাশ থেকে দেখলে বা ৯০ ডিগ্রিতে নোটটি ঘোরালে তা কালো দেখাবে।

জলছাপ: কাগজে জলছাপ হিসেবে ব্যবহƒত হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি; প্রতিকৃতির নিচে অতি উজ্জ্বল ইলেক্ট্রোটাইপ জলছাপে ৫০০, ১০০০ লেখা আছে এবং জলছাপের বাঁপাশে বাংলাদেশ ব্যাংকের উজ্জ্বলতর ইলেক্ট্রোটাইপ জলছাপ রয়েছে।

ব্যাকগ্রাউন্ড মুদ্রণ: ৫০০, ১০০০ টাকার নোটের সামনের দিকে পটভূমি বা ব্যাকগ্রাউন্ডে হালকা অফসেটে জাতীয় স্মৃতিসৌধ রয়েছে।

নোটের পেছন ভাগ: ১০০০ টাকার নোটের পেছনের দিকে ইন্টাগ্লিও কালিতে জাতীয় সংসদ ভবন মুদ্রিত আছে, যা হাতের আঙুলের স্পর্শে অসমতল অনুভূত হবে। ৫০০ টাকার নোটের পেছনের দিকে ইন্টাগ্লিও কালিতে বাংলাদেশের কৃষিকাজের দৃশ্য মুদ্রিত আছে, যা হাতের আঙুলের স্পর্শে অসমতল অনুভূত হবে।

রং পরিবর্তনশীল কালি: ১০০০ টাকার ডানদিকের কোনায় ১০০০ লেখাটি সরাসরি তাকালে সোনালি এবং তির্যকভাবে তাকালে সবুজ রং দেখা যাবে। ৫০০ টাকার ডানদিকের কোনায় সরাসরি তাকালে ৫০০ লেখাটি লালচে এবং তির্যকভাবে তাকালে সবুজ রং দেখা যাবে।

এই সময়ে ব্যাংকে অনেক ভিড় থাকে, তাই ব্যাংক থেকে টাকা ওঠানোর পর গন্তব্যে যাওয়া পর্যন্ত বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। ভিড়ের মধ্যে সবাই হয়তো ব্যাংকের গ্রাহক নয়। কেউ ছিনতাইকারীও থাকতে পারে।

আমার এক বন্ধুর আত্মীয় স্কুলশিক্ষক। তিনি ব্যাংক থেকে তিন লাখ টাকা তুলে হাতব্যাগে টাকা নিয়ে তার মেয়ের বাসায় যেতে বাসে উঠলেন। পথে সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হলে দুই ব্যক্তি তাকে হাসপাতালে ভর্তি করেন। তিনি প্রায় অজ্ঞান অবস্থায় ছিলেন। ডাক্তার হাঁটুতে, হাতে ও মাথায় ব্যান্ডেজ করা করে দেয়ার কিছু সময় পর তিনি ব্যাগের ভেতরে দেখলেন। সব ঠিক আছে। শুধু তিন লাখ টাকা নেই। বুঝতে পারলেন, যারা তাকে হাসপাতালে নিয়ে এনেছে, তারাই টাকা সরিয়ে ফেলেছে। কারণ হাসপাতালে আনার সময় তাদের কাছেই ব্যাগটি ছিল। সঙ্গে নিজের কেউ থাকলে হয়তো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটত না। ব্যাংক থেকে টাকা ওঠানোর পর কিছু সাবধানতা অবলম্বন করা যেতে পারে।

১. ব্যাংক থেকে টাকা ওঠানোর পর কাউকে সঙ্গে রাখতে হবে, তবে শিশু কিংবা বৃদ্ধ মানুষ নয়। ২. টাকা ওঠানোর পর অহেতুক আড্ডা ও তর্ক করা থেকে বিরত থাকুন। অপরিচিত কারও খাবার খাওয়া যাবে না। ৩. টাকা নেয়ার পর প্রয়োজনে কাউন্টারের সামনেই টাকা গুনে নিন, অন্যত্র গোনার দরকার নেই। ক্যাশ কর্মকর্তারা সামনেই একবার হাতে টাকা গুনে দেখার পর কাউন্টার মেশিন দিয়ে টাকা চেক করে নেন। ৪. টাকা গুনে দেখার পর কাউন্টারে গিয়ে ‘৫০০ টাকার নোট খুচরা করে দেন’, ‘এই নোটটি পরিবর্তন করে দেন’ প্রভৃতি সমস্যা নিয়ে কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকেন। এতে প্রতারক চক্রের চোখে পড়তে পারেন। কারণ প্রতারক চক্র দ্বিধাগ্রস্ত কিংবা বয়স্ক মানুষকে বেশি টার্গেট করে। ৫. ভিড়ের মধ্যে থাকবেন না। কেউ খেয়াল করছে কি না, কিংবা নিজে থেকে কেউ এসে পরিচিত হতে চাচ্ছে কি না, লক্ষ রাখুন। অস্বাভাবিক কিছু মনে হলে দ্রুত অবস্থান পরিবর্তন করুন, পরিচিত মানুষকে ফোন করে জানান। ৬. ব্যাংকের ভেতরেই সিসিটিভি ক্যামেরা থাকে। টাকা-পয়সা নিয়ে ব্যাংকের ভেতর ক্যামেরার সামনে থাকার চেষ্টা করুন। এতে যারা নজর রাখছে, কিংবা ব্যাংকে আপনার সঙ্গে যারা কথা বলেছে, তাদের মধ্যে কেউ অপরাধী হলে পরে তাদের শনাক্ত করা সহজ হবে। ৭. টাকা ওঠানোর পর গন্তব্যে পৌঁছার জন্য আগে থেকে পরিবহনের ব্যবস্থা করে রাখতে পারেন। ৮. টাকার পরিমাণ বেশি হলে, পুলিশের সহায়তা নিতে পারেন। যে কোনো অনাকাক্সিক্ষত সমস্যা এড়ানোর জন্য ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে সহায়তা নিন।

মনে রাখা উচিত, নোট জাল করা ও জাল নোট লেনদেন করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে জাল নোট কারবারির বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান করা হয়েছিল। পরে ১৯৮৭ সালে আইন সংশোধন করা হয়। বর্তমানে আরও সময়োপযোগী আইন করা হচ্ছে। তথ্যমতে, মামলা হলেই আসামি অ-আপসযোগ্য ও অজামিনযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবে। আর মামলা তদন্ত ৬০ কার্যদিবসের পরিবর্তে ৯০ কার্যদিবস এবং অনধিক ৩০ কার্যদিবসের পরিবর্তে ৪৫ কার্যদিবস পর্যন্ত সময় দেয়া হবে। খসড়া আইনে শাস্তির বিষয়ে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে যত বেশি নকল মুদ্রা তৈরি বা সরবরাহের অভিযোগ প্রমাণিত হবে, তার দণ্ড তত বেশি হবে। আইনের খসড়া অনুযায়ী, যে কোনো মূল্যের ১০০টির কম জাল মুদ্রা পাওয়া গেলে দুই বছর কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব এক লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে। জাল মুদ্রার সংখ্যা ১০০টির বেশি কিংবা ৫০০টির কম হলে পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে। কোনো ব্যক্তি ওই আইনে দ্বিতীয়বার অপরাধ করলে দণ্ড বেড়ে যাবে। সেক্ষেত্রে ১০০টির কম জাল মুদ্রার জন্য পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে। জাল মুদ্রার সংখ্যা ১০০টির বেশি কিংবা ৫০০টির কম হলে সাত বছর কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব ১০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে। আর ৫০০টির বেশি হলে ১২ বছর কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব ২০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে। কোনো ব্যক্তি আইনের ধারায় তৃতীয়বার বা তার চেয়ে বেশিবার অপরাধী প্রমাণিত হলে শাস্তি আরও বেড়ে যাবে। সেক্ষেত্রে ১০০টির কম জাল নোটের জন্য ১০ বছর কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব ২০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে। জাল নোটের সংখ্যা ১০০টির বেশি কিংবা ৫০০টির মধ্যে থাকলে ১২ বছর কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব ৫০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে। আর ৫০০টির বেশি জাল মুদ্রার জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব এক কোটি টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি ব্যক্তিপর্যায়েও আমাদের সচেতন হতে হবে।

যুগ্ম পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..