সম্পাদকীয়

উচ্চ আদালতের সতর্কতা আমলে নিন

বিচারবহির্ভূত হত্যা আমাদের দেশে নতুন নয়। সন্ত্রাস হোক, আর মাদক হোক তা দমনে বন্দুকযুদ্ধ, এনকাউন্টার বা ক্রসফায়ার কোনোটিই সমাধান নয়। এনকাউন্টারের ঘটনার পর গণমাধ্যমে যে বিজ্ঞপ্তি পাঠানো হয়, সেটির ভাষা প্রায় অভিন্ন। যেভাবেই বলা হোক না কেন এনকাউন্টার নিয়ে জনমনে সন্দেহ-সংশয় আছেই। গণমাধ্যমগুলোও ‘বন্দুকযুদ্ধ’ শব্দটিকে উদ্ধরণ চিহ্নভুক্ত করে কিংবা শব্দটির আগে কথিত শব্দ ব্যবহার করে। কিছু ক্ষেত্রে বিচারের দীর্ঘসূত্রতায় বিচারহীনতার আশঙ্কায় এবং অতিষ্ঠ হয়ে সাধারণ মানুষ এনকাউন্টারকে স্বাগত জানায়। কিন্তু সব সময়ই এমনটি ঘটে না।
এনকাউন্টার কখনও প্রকৃত সমাধান নয়। এটির পক্ষে থাকা মানে বিচার বিভাগের প্রতি অনাস্থা বিচারে কিছুই হবে না। সাধারণ মানুষের ধারণা যাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়ে কেউ সমাজের ‘অনাকাক্সিক্ষত বোঝা’য় পরিণত হয়েছে, বিচার হলে তাদের পরিচয় প্রকাশিত হয়ে যাবে। নেপথ্যের ওই অপনায়ক গডফাদারদের রক্ষায় এনকাউন্টার দারুণ মহৌষধ। কিন্তু বাস্তবতা হলো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে কোনো দেশই অপরাধ দমন করতে পারেনি। বরং এতে মূল নেপথ্য নায়করা রেহাই পেয়ে যায়। এর ফলে বর্বরতা ও নৈরাজ্যের স্থায়িত্ব বেড়ে যেতে পারে। আধুনিক সভ্য সমাজে এ অবস্থা কোনোভাবেই স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। তাই মানবাধিকার সংগঠন, সমাজের বিশিষ্টজন ও সচেতন নাগরিকদের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিপক্ষে অবস্থান নিতে দেখা যায়। এ অবস্থায় বৃহস্পতিবার উচ্চ আদালতের একটি বক্তব্য আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে বলেই ধারণা।
বরগুনা শহরের সড়কে প্রকাশ্যে শাহনেওয়াজ রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যা মামলার অগ্রগতি জানার পর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও সতর্ক হতে বলেছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, ‘নয়ন বন্ডরা (রিফাত শরীফকে হত্যার প্রধান আসামি) এক দিনে তৈরি হয় না। একা একা তৈরি হয় না। কেউ না কেউ তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকে। এর পেছনে যারা পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকেন, তাদের কী হবে? আমরা বিচারবহির্ভূত হত্যা পছন্দ করি না।’
আমরা মনে করি আদালতের এ বক্তব্যে সাধারণ মানুষের বক্তব্যই প্রতিফলিত হয়েছে। বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ নতুন নয়। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারেও বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধের অঙ্গীকার ছিল। কিন্তু গত এক দশকে বিচারবহির্ভূত হত্যা আরও বেড়েছে।
যেখানে কোনো দেশ বিচারবহির্ভূত হত্যার মাধ্যমে অপরাধ সম্পূর্ণ নির্মূল করতে পারেনি, সেখানে এটি বন্ধ করা উচিত। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করা গেলে প্রকৃত অপরাধী শাস্তি পাবে। উচ্চ আদালতের বক্তব্য আমলে নিয়ে বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেই আমাদের প্রত্যাশা।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..