দিনের খবর প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

উচ্চ আদালতে ঝুলে আছে ৯ হাজার মামলা

ফের থমকে গেছে এডিআর কার্যক্রম

সাইদ সবুজ, চট্টগ্রাম: বছরের পর বছর উচ্চ আদালত ও আপিলাত ট্রাইব্যুনালে পড়ে থাকা হাজার হাজার মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) প্রক্রিয়া চালু করা হয়। বিশ্বব্যাংকের বেসরকারি খাতে সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনের (আইএফসি) সহযোগিতায় ২০১২ সালের জুলাইয়ে চালু হওয়া এ পদ্ধতিতে আদালতের বাইরে নিরপেক্ষ সহায়তাকারীর মাধ্যমে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির বিধান রয়েছে।

এডিআর চালু হওয়ার পর ২০১৬-১৭ ও ২০১৮-১৯ অর্থবছরের কিছু মামলা নিষ্পত্তি হলেও বাকি অর্থবছরগুলোয় তেমন কোনো কার্যক্রম দেখা যায়নি। ফলে বিদায়ী বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত উচ্চ আদালত ও আপিলাত ট্রাইব্যুনালে প্রায় ৯ হাজার মামলা ঝুলে আছে।

জানা যায়, সাধারণত এডিআরের মাধ্যমে মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে দুই পক্ষেরই ছাড় দেয়ার মানসিকতা থাকতে হয়। যদি এর মধ্যে কোনো এক পক্ষ ছাড় দেয়ার ইচ্ছা পোষণ না করে, সে ক্ষেত্রে মামলা অনিষ্পন্ন থেকে যায়। যেমনটি হয়েছে ২০১৯-২০ অর্থবছরে। ওই অর্থবছরে মাত্র দুটি মামলা এডিআরের মাধ্যমে নিষ্পত্তির জন্য চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে আসে। কিন্তু মূল্যসংক্রান্ত বিষয়ে সমঝোতা না হওয়ায় দুই পক্ষই মামলা অনিষ্পন্ন হিসেবে আদালতে ফিরে যায়।

বর্তমানে আপিলাত ট্রাইব্যুনাল, আপিল কমিশনারেট ও উচ্চ আদালতে রাজস্ব-সংক্রান্ত অনিষ্পন্ন প্রায় ৯ হাজার মামলা রয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম কাস্টমস ও আপিল কমিশনারেটে মামলা আছে প্রায় দেড় হাজার। এছাড়া ঢাকা আপিলাত ট্রাইব্যুনালে মামলা রেকর্ড রয়েছে দুই হাজার ৬০০। পাশাপাশি উচ্চ আদালতে রিট মামলা রয়েছে সাড়ে চার হাজার এবং আপিল বিভাগে ৭২টি মামলা রয়েছে। তবে এসব মামলার মধ্যে সব মামলা আবার এডিআরে নিষ্পত্তির শর্ত পূরণ করে না।

এদিকে কাস্টম হাউসগুলোয় এডিআর কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না হওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করে চিঠি দিয়েছে এনবিআর। সংস্থাটির সদস্য (শুল্ক রপ্তানি, বন্ড ও আইটি) সুলতান মাহমুদ ইকবাল স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে বলা হয়, গত ৮ সেপ্টেম্বর এনবিআরের চেয়ারম্যানের সভাপতিত্বে শুল্ক ও মূসক অনুবিভাগের এডিআর কার্যক্রমের ওপর একটি পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই অনুষ্ঠানে আমদানি পণ্যের শুল্কায়নকালে পণ্যের মূল্য, শুল্ককরের পরিমাণ, অর্থদণ্ড, জরিমানা, আমদানিকারক কর্তৃক স্বয়ংসম্পূর্ণ দলিলাদি দাখিল না করাসহ বিভিন্ন অনিয়মের কারণে কাস্টম হাউসগুলোয় অসংখ্য মামলার জট দেখা দিয়েছে। অধিকাংশ মামলা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগ, আপিলাত ট্রাইব্যুনাল বা আপিল কমিশনারেটে চলমান আছে। এসব মামলার কারণে সরকারের বিশাল অঙ্কের রাজস্ব আটকে পড়ে আছে। এসব মামলার সঙ্গে জড়িত রাজস্ব দ্রুত সরকারের তহবিলে আনার লক্ষ্যে শুল্ক (বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি) বিধিমালা, ২০১২ প্রণয়ন করা হয়।

ওই চিঠিতে আরও বলা হয়, মাঠপর্যায়ে এডিআর-বিষয়ক প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত ২০১১-১২ অর্থবছরে এডিআর প্রথা চালু করার পর থেকে গত জুলাই, ২০২০ পর্যন্ত কাস্টমস অনুবিভাগের আওতাধীন ছয়টি কাস্টম হাউসে এডিআরের মাধ্যমে মামলা নিষ্পত্তির সংখ্যা আশানুরূপ নয়। বর্তমানে কাস্টম হাউস-সংশ্লিষ্ট ১৫ হাজার ৭৭৭টি মামলা বিভিন্ন দপ্তর, আপিলাত কর্তৃপক্ষ ও সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন রয়েছে। মামলার জট কমানো ও সরকারের ন্যায্য রাজস্ব দ্রুততম সময়ের মধ্যে আদায়ে এডিআর সূচনা করা হয়। এছাড়া দি কাস্টমস অ্যাক্ট, ১৯৬৯-এর সেকশন ১৯২-তে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, কোনো বিরোধ বিকল্প উপায়ে সমঝোতার ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করা হলে ওই সমঝোতার বিরুদ্ধে কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল অথবা কর্তৃপক্ষের কাছে আপত্তি উত্থাপন করা যাবে না। দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলার কার্যক্রম গ্রহণ করা যাবে না। এডিআরের মাধ্যমে মামলার নিষ্পত্তির আবেদনকারী, সহায়তাকারী ও বিভাগীয় প্রতিনিধি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ থেকে সততা-বিশ্বস্ততার সঙ্গে সমঝোতার মনোভাব নিয়ে দায়িত্ব পালন করবেন। আইনে সুস্পষ্ট বিধান থাকা সত্ত্বেও এডিআরের মাধ্যমে মামলা নিষ্পত্তিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হচ্ছে না। তাই আইনের বিধানমতে, সংশ্লিষ্ট সবাইকে এডিআর কার্যক্রম জোরদারে আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের পরামর্শ প্রদান করা হয়।

এদিকে চট্টগ্রাম কাস্টমসে এডিআর কার্যক্রমের দৃশ্যমান গতি নেই। তবে ২০১২ সালে এডিআর কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর এ পর্যন্ত নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ১২২টি মামলা। পাঁচ অর্থবছরের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে এডিআরের মাধ্যমে মামলা আসে ১০২টি। এর মধ্যে ওই অর্থবছরে ৯১টি মামলা নিষ্পত্তি করা হয়। তারপর ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এডিআরে কোনো মামলা আসেনি।  এরপর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২৪টি মামলা এডিআরে এলে এর মধ্যে ২১টি নিষ্পত্তি করা হয়। তারপর ২০১৯-২০ অর্থবছরে যেই দুটি মামলা এডিআরে এসেছিল কাস্টমস ছাড় না দেয়ায় মামলা দুটি আবার ফিরে যায় উচ্চ আদালতে। মূলত তার পর থেকে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসে আজ অবধি এডিআরের কোনো মামলা আসেনি।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের আইন শাখার কর্মকর্তারা জানান, এডিআরের মাধ্যমে মামলা নিষ্পত্তির জন্য গত দুই বছরে একটি আবেদনও জমা পড়েনি। অর্থাৎ কোনো আমদানিকারীই আগ্রহ প্রকাশ করেনি। তবে এডিআরের মাধ্যমে মামলা নিষ্পত্তি করতে হলে কোনো এক পক্ষকে ছাড় দিতে হবে। এখানে আসলে কেউ ছাড় দিতে চায় না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এডিআর কার্যক্রম চালু রাখতে হলে কাস্টমস ও আমদানিকারক উভয় পক্ষকে ছাড় দেয়ার মানসিকতা থাকতে হবে। তাহলেই কেবল এডিআর কার্যক্রম গতি পাবে। সহায়তাকারীরা আইনি ব্যাখ্যা দেয়া ছাড়া তাদের হাতে কোনো ক্ষমতা নেই। এছাড়া এডিআরের মাধ্যমে মামলা নিষ্পত্তি হলে কাস্টমস ও আমদানিকারক উভয়পক্ষ লাভবান হবে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের এডিআর শাখার দায়িত্বে থাকা উপকমিশনার মো. আব্দুল আলীম শেয়ার বিজকে বলেন, এনবিআরের নির্দেশে আমরা এডিআরের কার্যক্রম জোরদারে কাজ করে যাচ্ছি। বিরোধপূর্ণ মামলার আমদানিকারকদের তালিকা তৈরি করে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। গত দুই মাসে ৫০ জনের অধিক আমদানিকারককে ফোন করা হয়েছে। তাদের এডিআরের মাধ্যমে মামলা নিষ্পত্তির জন্য উদ্বুব্ধ করার চেষ্টা করছি। এক্ষেত্রে আমদানিকারকদের এগিয়ে আসতে হবে। তারা মামলা নিয়ে এলে আমরা নিষ্পত্তি করার জন্য প্রস্তুত আছি।

উল্লেখ্য, আন্ডার ইনভয়েসের মাধ্যমে চিনি আমদানি করে শুল্ক ফাঁকি দেয়ার অভিযোগে ছয়টি রিট মামলার রেকর্ডপত্র ২০১৬ সালের ১৮ মে দুদক তলব করে। উল্লিখিত ওই ছয়টি রিট মামলার মধ্যে তিনটি উচ্চ আদালতের আদেশে এডিআরের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়। পরে ওই তিনটি মামলার যাবতীয় কাগজপত্র দুদকের তদন্তকারী কর্মকর্তা সরেজমিনে উপস্থিত হয়ে সংগ্রহ করে নিয়ে যান। একই সঙ্গে যেসব কর্মকর্তা স্বাক্ষর প্রদান করেন তাদেরও লিখিত বক্তব্যসহ দুদকের স্থানীয় কার্যালয়ে তলব করা হয়েছিল। মূলত তার পর থেকে কাস্টমস কর্মকর্তারা এডিআরের মাধ্যমে মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে বিব্রত বোধ করেন। এতে ওই সময় উচ্চ আদালত থেকে যেসব মামলা এডিআরের মাধ্যমে নিষ্পত্তির জন্য চট্টগ্রাম কাস্টমসে এসেছিল, সেগুলো নিষ্পত্তি না করে আবার আদালতে ফিরে যায়। পরবর্তী সময়ে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তৎকালীন কাস্টমস কমিশনারের পদক্ষেপে ২৪টি মামলা নিষ্পত্তির জন্য এডিআরে আসে, যার মধ্যে ২১টি নিষ্পত্তি হয়। তারপর ওই কমিশনারের বিদায়ের পর থেকে আজ অবধি কোনো মামলা নিষ্পত্তি হয়নি।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..