প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

উচ্চ মুনাফায়ও বিনিয়োগ বাড়ছে না মিউচুয়াল ফান্ডে

ব্যাংকের সুদহার কমতে থাকায় বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ছে পুঁজিবাজারে। লভ্যাংশের উচ্চ হার দেখে অনেকে প্রভাবিতও হচ্ছেন। তবে এসব শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের প্রকৃত মুনাফার বিষয়ে খোঁজ নিচ্ছেন না অনেকেই। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। তাই বিভিন্ন কোম্পানির প্রকৃত মুনাফাচিত্র তুলে ধরতে ধারাবাহিক আয়োজন। আজ ছাপা হচ্ছে শেষ পর্ব

ইসমাইল আলী ও নাজমুল ইসলাম ফারুক: বিনিয়োগের নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে ধরা হয় মিউচুয়াল ফান্ড। সীমিত মুনাফা দিলেও এতে বিনিয়োগের ঝুঁকি কম। লভ্যাংশের ধারাবাহিকতার জন্য বিভিন্ন দেশের পুঁজিবাজারে এটির জনপ্রিয়তাও ব্যাপক। তবে বাংলাদেশে এ খাতে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা যায়। ১৯ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফা (ইল্ড) দিলেও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত মিউচুয়াল ফান্ডে আগ্রহ নেই বিনিয়োগকারীদের। বেশ কয়েকটি ফান্ড ইউনিটের দর ভেসভ্যালুর নিচে নেমে গেছে।

ইনভেস্টোপিডিয়ার তথ্যমতে, মিউচুয়াল ফান্ড এক ধরনের বিনিয়োগের মাধ্যম। বিভিন্ন বিনিয়োগকারী থেকে সংগৃহীত এ ফান্ড সাধারণ শেয়ার, বন্ড, মুদ্রাবাজারের বিভিন্ন হাতিয়ার ও সমধরনের সম্পদে বিনিয়োগ করা হয়। ফান্ড ম্যানেজাররা এর তহবিল নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। ভারত, জাপান, ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে এ ধরনের ফান্ড খুবই জনপ্রিয়।

বিনিয়োগ গবেষণাকারী এ প্রতিষ্ঠানটির মতে, মিউচুয়াল ফান্ডের প্রধান সুবিধা হলো ক্ষুদ্র বিনিয়োগকে পেশাদারি ও বহুমুখীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। প্রত্যেক বিনিয়োগকারী এর মুনাফা বা  লোকসানের অংশ নেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী বাণিজ্য সাময়িকী ফোর্বসের তথ্যমতে, বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগের সবচেয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ মাধ্যম মিউচুয়াল ফান্ড। ২০০৯ সালের বিশ্বমন্দার মাঝেও যুক্তরাষ্ট্রের মিউচুয়াল ফান্ডগুলো ভালো পারফরম করে। যদিও এ সময় বেশিরভাগ তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ারই খারাপ অবস্থার মধ্যে পড়ে।

তবে বাংলাদেশে এ চিত্র ব্যতিক্রম। কয়েকটি ফান্ড ব্যবস্থাপকের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, পুঁজিবাজারে ২০১০ সালের ধসের সময় মিউচুয়াল ফান্ডেও লোকসান করেছেন বিনিয়োগকারীরা। ওই সময় বেশি দামে শেয়ার কেনেন অনেক ফান্ড ব্যবস্থাপক। তাছাড়া দীর্ঘদিন বাজার মন্দার কারণে ফান্ডের ইউনিটদর অভিহিত মূল্যের নিচে অবস্থান করছে। যদিও এসব ফান্ড উচ্চহারে ডিভিডেন্ড ইল্ড দিচ্ছে।

ডিএসইর তথ্যমতে, ২১টি ফান্ডের প্রকৃত মুনাফা বা ছয় শতাংশের ওপরে। এর মধ্যে সাতটির ইল্ড ১৪-১৯ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে এআইবিএল ফার্স্ট ইসলামিক মিউচুয়াল ফান্ডে ইল্ড ১৯ দশমিক ১২ শতাংশ, আইসিবি এএমসিএল ফার্স্ট এনআরবি মিউচুয়াল ফান্ডে ১৮ দশমিক ৫২, আইএফআইএল ইসলামিক মিউচুয়াল ফান্ড ওয়ানে ১৪ দশমিক ৭১, এলআর গ্লোবাল বাংলাদেশ মিউচুয়াল ফান্ড ওয়ানে ১৮ দশমিক ১৮, এমবিএল ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ডে ১৬ দশমিক ৬৭ এবং প্রাইম ব্যাংক ফার্স্ট আইসিবি এএমসিএল ও ‘রিলায়েন্স ওয়ান’ দি ফার্স্ট স্কিম অব রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্স মিউচুয়াল ফান্ডে ১৪ দশমিক ২৯ শতাংশ।

ইয়াহু ফাইন্যান্সের ভাষ্যমতে, কোনো মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগকারীদের আয়ের যে অংশ দেয়, তা হলো লভ্যাংশ। এটি সাধারণত ফান্ডের ইউনিটপ্রতি আয় প্রকাশ করে। তবে বিভিন্ন ফান্ডের লভ্যাংশের হারের মধ্যে তুলনায় ব্যবহার করা হয় ইল্ড বা প্রকৃত মুনাফা। এক্ষেত্রে লভ্যাংশকে ইউনিটমূল্য দিয়ে ভাগ করে প্রকৃত মুনাফা নির্ণয় করা হয়। ইউনিটমূল্য বেশি হলে আর লভ্যাংশ কম দেওয়া হলে ইল্ড নিম্নমুখী হয়। ইউনিটমূল্য কম হলে ও লভ্যাংশ বেশি দেওয়া হলে ইল্ডের হার বেড়ে যায়।

যদিও ডিএসইতে তালিকাভুক্ত মিউচুয়াল ফান্ড ইউনিটের দর  নেতিবাচক ধারায় রয়েছে। তালিকাভুক্ত ৩৪টির মধ্যে ২৭টির দাম ফেসভ্যালুর নিয়ে রয়েছে। এজন্য ফান্ডের সম্পদ ব্যবস্থাপকদেরই দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, দেশের বেশিরভাগ সম্পদ ব্যবস্থাপকই অদক্ষ। পাশাপাশি ফান্ড ব্যবস্থাপকরা বিনিয়োগে অনভিজ্ঞ। এসব ব্যবস্থাপকের বেশিরভাগই সাধারণ বিনিয়োগকারীর মতো হুজুগে বিনিয়োগ করার প্রবণতা রয়েছে। ধসের সময় বিনিয়োগ করে ঝুঁকিতে পড়েন তারা, যার ধকল কাটিয়ে উঠতে বেগ পেতে হচ্ছে অনেক ফান্ড ব্যবস্থাপকের।

জানতে চাইলে এইমস বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইয়াওয়ার সায়ীদ শেয়ার বিজকে বলেন, বাজারে যেসব কোম্পানি শেয়ার ইস্যু করে অর্থ উত্তোলন করে, সারা বছর তাদের কিছু কিছু সম্ভাবনার খবর থাকে। এর মধ্যে রয়েছে ওই কোম্পানির উৎপাদন বাড়ানো-কমানো, রাইট ইস্যু সংক্রান্ত খবর, রফতানি বাড়া বা কমার খবর ইত্যাদি। এসব খবরের কারণে ওইসব কোম্পানির শেয়ারদর বেশ ওঠানামা করে। অপরদিকে মিউচুয়াল ফান্ডের সারা বছর তেমন কোনো সম্ভাবনার খবর থাকে না। ফান্ড ব্যবস্থাপকরা শেয়ারে বিনিয়োগ করেন। এ কারণে  কোম্পানির মতো এ খাতের দর ওঠানামা করে না। এ কারণে বিনিয়োগকারীদের এ খাতে আগ্রহ কম।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে বাজারে ফান্ডগুলোর পোর্টফোলিও রি-ব্যালেন্সিং করে নিতে পারলে অতীতের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া যাবে। তবে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ফান্ড ব্যবস্থাপকদের সচেতন থাকা উচিত।

জানা গেছে, ধস-পরবর্তীতে মন্দাবাজারে কোনো কোনো মিউচুয়াল ফান্ড ব্যবস্থাপকের বিরুদ্ধে গরু বা মুরগির খামারসহ অন্যান্য খাতে বিনিয়োগের অভিযোগ ওঠে। এর মধ্যে এলআর গ্লোবাল বাংলাদেশ অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট অন্য খাতে বিনিয়োগ করে আইন ভঙ্গের দায়ে জরিমানার কবলে পড়ে। প্রতিষ্ঠানটিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ২০১৫ সালের ৫৩৯তম কমিশন সভায় ৫০ লাখ টাকা জরিমানা এবং এক বছরের জন্য নতুন ফান্ড গঠনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে।

এদিকে উচ্চ ইল্ডের পরও বেশকিছু ফান্ড এখনও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ফলে এগুলো অবসায়নে গেলে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারবেন না। এজন্যও এ খাতের প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা।

মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা অনুযায়ী, এ ফান্ডের অর্থ কেবল স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজ, প্রাথমিক সিকিউরিটিজ এবং অর্থবাজারে হস্তান্তরযোগ্য সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করা যাবে। এর মধ্যে তহবিলের ৭৫ শতাংশ অর্থ অবশ্যই পুঁজিবাজারের সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করতে হবে। আবার এই ৭৫ শতাংশের অর্ধেকই বিনিয়োগ করতে হবে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজে। এতে  বেশি দামে শেয়ার কিনে আটকে রয়েছে ফান্ডগুলো।

বিধিমালা অনুযায়ী, ফান্ডগুলো লভ্যাংশ হিসেবে বোনাস দিতে পারবে। সমাপ্ত বছরে নগদ বা বোনাস লভ্যাংশ মুনাফার সর্বনি¤œ ৫০ থেকে ৭০ শতাংশের কম হবে না। একই সঙ্গে ফান্ডের ইউনিটদর কম হওয়ায় লভ্যাংশের প্রকৃত হার তালিকাভুক্ত কোম্পানির চেয়েও বেশি।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক শাকিল রিজভী বলেন, মিউচুয়াল ফান্ডগুলো অতীতে যে বিনিয়োগ করেছিল, তাতে তাদের লোকসানের পরিমাণ বেশি। আর সেই লোকসান এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি বেশিরভাগ মিউচুয়াল ফান্ড। এসব ফান্ডে বিনিয়োগকারীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ফলে ফান্ডগুলোর প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কম।

তিনি আরও বলেন, ফান্ড ব্যবস্থাপকদের দক্ষতার অভাবে মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর অবস্থা খারাপ। পারফরমেন্স ভালো দেখিয়ে তাদের প্রমাণ করতে হবে এসব ফান্ডের ইউনিটে বিনিয়োগযোগ্য। তাহলে এগুলোর প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়বে।