সুশিক্ষা

উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চান বাকৃবির শিক্ষার্থীরা

ছাত্রজীবনের সবচেয়ে সুখকর আর মনে রাখার মতো মুহূর্তগুলোর বেশিরভাগই তৈরি হয় বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে। এ সময়ের হাসি, খেলা, ঠাট্টা ও আনন্দ সবই মনের মণিকোঠায় ঠাঁই পায়। পরবর্তী জীবনে আর কিছু না হোক বিশ্ববিদ্যালয়ে কাটানো মুহূর্তগুলোয় ফিরে যাওয়ার জন্য প্রতিনিয়ত মন হাহাকার করে।

প্রতিটি শিক্ষার্থীরই ইচ্ছা থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করার। শত স্বপ্ন আর আকাক্সক্ষা গড়ে ওঠে এ উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ঘিরে। তাই ক্যাম্পাসটা হয়ে ওঠে তার দ্বিতীয় বাড়ির মতো। এ যেন বাবা-মাকে ছাড়া অন্য এক পরিবার, যেখানে ভাইবোন আর বন্ধুদের একটি দৃঢ় বন্ধন গড়ে ওঠে। সবুজ ও শান্ত পরিবেশে লেখাপড়া করতে সবাই চায়। এ বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) কয়েকজন শিক্ষার্থীর মতামত জানাচ্ছেন আতিকুর রহমান

পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্স প্রথম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী সিহাব সাকিব ঈশান বলেন, আমি বাকৃবিকে দেখতে চাই দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও গবেষণার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বা রোল মডেল হিসেবে। একদিকে যেমন শিক্ষার্থীরা তথাকথিত জীর্ণ-শীর্ণ শিক্ষাব্যবস্থার বাধা ডিঙিয়ে আধুনিক উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত দেশ ও দশকে পৃথিবীর কাছে চেনাবে, অন্যদিকে এ বিশ্ববিদ্যালয়েরই একদল ছাত্র মহাকাশের প্রাণহীন নক্ষত্রগুলোকেও সবুজে ঢেকে দেওয়ার নকশা তৈরির পরিকল্পনা বুনবে। এক হাজার ২৬০ একরের প্রতিটি ইঞ্চিতে থাকবে মানুষ আর মনুষ্যত্বের আলোয় উদ্ভাসিত হওয়ার তাগিদ। এ প্রাঙ্গণে গান, কবিতা, আড্ডা, বিতর্ক, নাটক ও সেমিনার সবই হবে। ছাত্র, শিক্ষক, কর্মচারীÑসবাই মিলে হবে একটি বৃক্ষ, যার গল্প ছড়িয়ে পড়বে মানুষের মুখে-মুখে, ঘরে-ঘরে, পৃথিবীময়।

কথা হয় কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান অনুষদের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী বৃষ্টি বণিকের সঙ্গে। তিনি মনে করেন, কৃষি ও কৃষি গবেষণাকে প্রাধান্য দিয়ে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

ফসল উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্স প্রথম সেমিস্টারের ছাত্র নাবিল তাহমিদ রুশদ বলেন, জ্ঞান সৃষ্টির স্থান হলো বিশ্ববিদ্যালয়। তার মতে, এ সৃষ্টি অনেকটাই ব্যর্থ হওয়ার প্রধান কারণ প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা, আধুনিক ল্যাব ও শ্রেণিকক্ষের স্বল্পতা। একই কোর্সের পুনরাবৃত্তি আর পাঠ্যক্রমে সৃজনশীলতার অভাব তো রয়েছেই। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে এসে সেই পুরোনো পদ্ধতি আর পরিকল্পনা নিয়ে পড়ালেখা করতে নারাজ শিক্ষার্থীরা। এতে শিক্ষার্থীদের সময় ও সৃজনশীলতা নষ্ট হচ্ছে। একজন শিক্ষার্থী হিসেবে তিনি মনে করেন, বাকৃবি শিক্ষা গবেষণায় এগিয়ে থাকলেও থামলে চলবে না। শিক্ষার্থীবান্ধব ক্যাম্পাস, সময়োপযোগী কোর্স কারিকুলাম, আধুনিক ল্যাব, নিয়মিত প্রেজেন্টেশেনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। মাদক, সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও অপরাজনীতিমুক্ত বাকৃবির স্বপ্ন দেখেন তিনি।

মৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী তোরসা সরকার বলেন, আমার কাছে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের মতো। আমি চাই এ পরিবারের সবাই মিলেমিশে নিজ নিজ জায়গা থেকে তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করবেন। এ ক্যম্পাসটি একটি সুন্দর, সজীব, পরিচ্ছন্ন ও মাদকমুক্ত ক্যাম্পাস হিসেবে গড়ে উঠবে, এটাই তার ইচ্ছা। তিনি বলেন, মাদক মেধা ও মেধাবীকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়, যা একটি জাতির জন্য হুমকিস্বরূপ। এর পরিবর্তে হিম উৎসব, বর্ষবরণ, পিঠা উৎসব, শারদব্যঞ্জনাসহ বিভিন্ন উৎসবে আমাদের সংস্কৃতিকে ধরে রাখতে চাই।

কৃষি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ওয়াহিদা তানজিম মনে করেন, আমার প্রাণের ক্যাম্পাস বাকৃবি এমন হবে যেখানে সবাই নিজেকে নিয়ে স্বপ্ন দেখবে, স্বপ্ন দেখবে বাকৃবিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার। প্র্যাকটিকাল খাতায় ডুবে না থেকে প্র্যাক্টিকাল প্লট তৈরি করবে বাকৃবির বুকে। গবেষণা ও পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন সংগঠন ও সেবা সচেতনতামূলক কাজে শিক্ষার্থীরা অংশ নেবে। চাকরির পেছনে না ঘুরে চাকরির ক্ষেত্র তৈরির পরিকল্পনা করবে। এখানে আন্তর্জাতিক সেমিনার, জব ফেয়ার, বিভিন্ন কর্র্মশালা আর নির্দিষ্ট সময়ে কনভোকেশনের আয়োজন হবে, যেমনটা হওয়া উচিত একটি আদর্শ বিশ্ববিদ্যালয়ে।

কৃষি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র শাহরিয়ার আহমেদ বলেন, কিছু অপ্রাপ্তি পুষে বেড়াচ্ছি বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে। ইচ্ছা ছিল ক্যাম্পাসে বছরব্যাপী শিল্পসাহিত্যের আড্ডা, সৃজনশীল ও রুচিশীল নাট্য মঞ্চায়ন, চায়ে চুমুকের ফাঁকে ফাঁকে কবিতার আসর আর দেশি-বিদেশি সাহিত্যের চর্চা হবে, কিন্তু বাস্তবতা একটু অন্যরকম। সবাই মুখস্থ পড়াশোনা আর অদ্ভুত রকমভাবে বিসিএস প্রতিযোগিতার ঘোরে থাকে। অথচ কৃষিতে রয়েছে অপার সম্ভাবনা। একই অনুষদের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র নিবিড় কান্তি রায় বলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় হবে একটি মুক্তমনাদের জায়গা, যেখানে সবাই স্বাধীন থাকবে। এখানে শিক্ষার্থীদের সব বিষয়েই জ্ঞান থাকবে, একটি বিষয় নিয়ে কেউ পড়ে থাকবে না। শিট বা হ্যান্ডনোটের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি পদক্ষেপ থেকে তারা শিক্ষা নেবে। সৃজনশীল ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা থাকবে সব আড্ডায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন হবে স্বায়ত্তশাসিত, যেখানে কোনো ক্ষমতাসীন দলের হস্তক্ষেপ থাকবে না।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..