বাণিজ্য সংবাদ

উত্তরা ইপিজেড থেকে ৯৯ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি

তৈয়ব আলী সরকার, নীলফামারী: নীলফামারীসহ আশেপাশের জেলার বেকারত্ব ঘুচিয়ে উত্তরা ইপিজেড এখন উন্নয়নের শীর্ষে। এ ইপিজেডকে কেন্দ্র করে চাঙা হয়ে উঠছে জেলার অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড। এছাড়াও এ ইপিজেডের আশেপাশে স্থানীয়ভাবে গড়ে উঠেছে ছোটখাট অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান।
এ ইপিজেডে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ১৭৭ দশমিক ৪৮ মিলিয়ন ডলার। চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত উত্তরা ইপিজেডের কারখানাগুলো থেকে রফতানি হয়েছে ৯৯৫ দশমিক ৬৫ মিলিয়ন (৯৯ কোটি ৫৬ লাখ) ডলারের সমমূল্যের বৈচিত্র্যময় বিভিন্ন পণ্য। এখানে কর্মসংস্থান হয়েছে ৩৪ হাজারের বেশি দেশি-বিদেশি নাগরিকের। এর মধ্যে দেশি ৩৩ হাজার ৬১৬ এবং বিদেশি ৩৮৭ জন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, উত্তরা ইপিজেডে বহুমুখী পণ্য উৎপাদনে অন্যান্য ইপিজেডের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে রয়েছে। এখানে চশমা ও চশমার ফ্রেম, পুতুল (মডেল), উইগ, খেলনা, বাঁশের তৈরি কফিন, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, ব্যাগ, বেল্ট, পরচুলাসহ প্রভৃতি পণ্য তৈরি হয়। এখানে ১৮টি কারখানা চালু রয়েছে। এর মধ্যে দেশি ৯টি ও বিদেশি ৯টি। এছাড়াও আটটি কারখানা বাস্তবায়নাধীন।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে উত্তরা ইপিজেড স্থাপন করে। এরপর ২০০১ সালের ১ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তরা ইপিজেডের উদ্বোধন করেছিলেন।
শুরুতেই এ ইপিজেডে হংকংভিত্তিক একটি চীনা প্রতিষ্ঠান অর্থ বিনিয়োগ করে। উত্তরা সোয়েটার ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে চীনাদের তত্ত্বাবধানে এবং বাংলাদেশের শ্রমিকরা উন্নত মানের সোয়েটার উৎপাদন করে দেশে-বিদেশে সুনাম কুড়িয়েছেন।
এ ইপিজেডে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, ইপিজেড থেকে ৩৮ কিলোমিটার অদূরে ভারতের হলদিবাড়ির সঙ্গে চিলাহাটি স্থলবন্দর চালু এবং সরাসরি রেল যোগাযোগ স্থাপন ও নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানের করা হলে উত্তরা ইপিজেডে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা আরও বাড়বে বলে মনে করছেন শিল্পোদ্যোক্তারা।
বর্তমানে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে হংকংভিত্তিক এভারগ্রিন প্রডাক্ট ১০টি প্লট বরাদ্দ নিয়ে উৎপাদন করছে পরচুলা। সনিক বাংলাদেশ লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান মডেল (পুতুল) তৈরি করে জাপান, হংকং, ম্যাকাও, চীন, ফ্রান্স, ইউরোপ, কোরিয়াসহ বিদেশের বাজারে সুনাম কুড়িয়েছে। এ কোম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম বলেন, এখানে পাঁচ হাজারেরও অধিক শ্রমিক কাজ করেন। তবে আগামীতে এখানে আট হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে।
এছাড়াও উত্তরা ইপিজেডে তৈরি হচ্ছে উন্নত মানের বাঁশ-বেতের তৈরি কফিন, যা রফতানি করা হচ্ছে ইউরোপের বাজারে। ওয়েসিস ট্রান্সফরমেশন লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান এ কফিন তৈরি করছে। ২০০৯ সালে ডেভিড হাউ এ কারখানা চালু করেন। এরা স্থানীয়ভাবে বাঁশ, বেত, কলার ছোবড়া, দলকচু (কচুরিপানা), পাটকাঠিসহ (ইউলো) আরও সহজলভ্য উপাদান দিয়ে কফিন তৈরি করে তা ইউরোপের বাজারে বিক্রি করে। কফিন তৈরির কারণে এ অঞ্চলে বিশেষ ধরনের বাঁশ ও বেতের চাহিদাও দিন দিন বেড়ে চলেছে। ফলে স্থানীয়ভাবে বাঁশবাগানের মালিকরাও লাভবান হচ্ছেন।
পাশাপাশি বাঁশ ও কলার ছোবড়া, কচুরিপানা ও পাটকাঠি সংগ্রহের কাজে রয়েছেন প্রত্যন্ত গ্রামের অনেক নারী শ্রমিক ও পুরুষ। তারা দৈনিক হাজিরা ভিত্তিতে সেখানে কাজ করে পরিবার-পরিজন নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন।
বাংলাদেশ ইপিজেড কর্তৃপক্ষ (বেপজা) জানায়, উত্তরা ইপিজেডে বিনিয়োগকারীদের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। এখানে উদ্যোক্তাদের জন্য শিল্প প্লট ও কারখানা ভবনের ভাড়া ৫০ ভাগ হ্রাস করা হয়েছে।
উত্তরা ইপিজেডের ব্যবস্থাপক এসএম আখতার আলম মোস্তাফি বলেন, এখানে বিনিয়োগকারীদের শতভাগ নিরাপত্তাসহ সব সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়। দেশে আটটি ইপিজেড রয়েছে। এর মধ্যে উত্তরা উপিজেড এখন উত্তরবঙ্গে উন্নয়নের আলো ছড়িয়েছে। এখানকার জীবনমানের উন্নয়ন হয়েছে। তিনি বলেন, এ ইপিজেডে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, ভারতের হলদিবাড়ির সঙ্গে চিলাহাটি স্থলবন্দর চালু এবং সরাসরি রেল যোগাযোগ স্থাপন ও সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানের করা হলে উত্তরা ইপিজেডে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা আরও বাড়বে।
বেপজার মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) নাজমা বিনতে আলমগীর জানান, এটি একটি সম্ভাবনাময় রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল, অর্থাৎ এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন।
নীলফামারী সদরের সোনারায়ে ২১২ একর জায়গায় স্থাপিত উত্তরা ইপিজেডে শিল্প প্লটের সংখ্যা ১৮৭টি। এর সব প্লট উপযুক্ত হয়ে আছে এবং এরই মধ্যে ১১৮টি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

 

সর্বশেষ..