প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

উদ্বৃত্ত আলু নিয়ে কী করব?

জাহিরুল ইসলাম: আলু নিয়ে কৃষক এবার যেমন দুশ্চিন্তায় পড়েছে, এমন চিত্র গত কয়েক বছরে দেখা যায়নি। অথচ ন্যায্য দাম পাওয়ার জন্য রাস্তা কিংবা নদীতে আলু ফেলে প্রতিবাদের খবর একসময় সংবাদমাধ্যমে আসতো অহরহ। এ সমস্যার সমাধান হয় বিশ্ববাজারে আলু রফতানির সুযোগ ব্যাপকভাবে সৃষ্টি হওয়ার পর। অনেকের মনে থাকার কথা, ২০১১ সালে সরকার ২০ শতাংশ নগদ অর্থসহায়তা ঘোষণার পর ওই বছরই খাদ্যপণ্যটির রফতানি শুরু হয় ব্যাপকভাবে। পরিসংখ্যান বলছে, সর্বোচ্চ পরিমাণ আলু রফতানি হয়েছিল সে বছরই। ওই বছর আলু রফতানি আগের তুলনায় বেড়ে গিয়েছিল পাঁচগুণ; এর আর্থিক মূল্য দাঁড়ায় এক কোটি ৬৭ লাখ ৩০ হাজার ৭৯৪ ডলার। এরপর আলু রফতানি অব্যাহত থাকলেও খুব সম্ভবত তা আগের রেকর্ড ছুঁতে পারেনি।

এবার আলু নিয়ে কৃষকের দুশ্চিন্তার কারণ হলো, এটি তারা বিক্রি করতে পারছে না ন্যায্য দামে। কারণ আগ্রহ কমে গেছে রফতানিকারকদের। এর কারণ হিসেবে রফতানিকারকদের সংগঠনের নেতাদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২০ সেপ্টেম্বর এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ২০ শতাংশের পরিবর্তে নগদ সহায়তার হার ১০ শতাংশ নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার। প্রতিকূল রফতানি বাজারে এ সামান্য সহায়তা নিয়ে প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে তাদের টিকে থাকা সম্ভব নয়। তাই রফতানি কার্যক্রম আপাতত বন্ধ রেখেছেন তারা। এমন পরিস্থিতিতে আগে পাওয়া রফতানি চুক্তিও বাতিল করেছেন কেউ কেউ।

আলু রফতানিতে বাংলাদেশের প্রতিযোগী হলো পাকিস্তান, ভারত ও চীন। ওইসব দেশের সরকারও আলু রফতানিকারকদের নগদ সহায়তা দিয়ে থাকে। তথ্যমতে, পাকিস্তানে এ সহায়তার হার ৩৫ শতাংশ, ভারত ও চীনে ২০ শতাংশ। এটি ছাড়াও ওইসব দেশের রফতানিকারকরা পরিবহন ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ সুবিধা পায়, যে কারণে রফতানি বাজারে মূল্য-প্রতিযোগিতায় তারা থাকে এগিয়ে। বাংলাদেশের আলু রফতানিকারকদের এ ধরনের কোনো সুবিধা দেওয়া হয় না; উপরন্তু যে নগদ সহায়তা দেওয়া হতো, সেটাও কমিয়ে আনা হয়েছে প্রজ্ঞাপন জারি করে। বিশ্ববাজারে রফতানিতে মূল্য-প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারলে আমাদের রফতানিকারকরা নিরুৎসাহিত হবেন, তা বলাই বাহুল্য। এও ঠিক, এমন পরিস্থিতিতে আমদানিকারকরাও বাংলাদেশবিমুখ হবেন।

একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশে বর্তমানে আলু উৎপাদন হয় ৯৭ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ চাহিদা প্রায় ৬০ লাখ টন। যদি রফতানি না হয়, তাহলে উদ্বৃত্ত থাকে আরও প্রায় ৩৭ লাখ টন। এ বিপুল পরিমাণ আলু সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত হিমাগার নেই দেশে। বিভিন্ন কোম্পানি প্রক্রিয়াকরণের জন্য যে পরিমাণ সংগ্রহ করে, তাও অভ্যন্তরীণ চাহিদার মধ্যে পরিগণিত। স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, উদ্বৃত্ত আলু নিয়ে আমরা কী করব? বাস্তবতা হলো, সংরক্ষণের পর্যাপ্ত সুযোগ না পেলে কৃষককে সেটা বিক্রি করতে হবে অপেক্ষাকৃত কম দামে। তাতে ন্যায্য দাম পাওয়া কঠিন হবে তাদের জন্য। অন্যদিকে আলু যদি রফতানি করা না যায়, তাহলে দেশ বঞ্চিত হবে উল্লেখযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রা থেকে। শুধু তা-ই নয়, লাভজনক হওয়ায় কৃষিঋণের উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যাংকগুলো প্রদান করতো এটি উৎপাদনে। বাজারে আলুর চাহিদা যদি না থাকে, কৃষক যদি ন্যায্য দাম না পায়, তাহলে সংশ্লিষ্টরা যে যথাসময়ে ব্যাংকঋণ পরিশোধ করতে সমস্যায় পড়বে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অর্থাৎ রফতানিপ্রবাহ স্থবির হওয়ার প্রভাব কিছুটা হলেও পড়বে দেশের ব্যাংক খাতে।

আলু রফতানিকারকদের নগদ সহায়তা হ্রাসের সিদ্ধান্ত নীতিনির্ধারকরা ঠিক কোন যুক্তিতে গ্রহণ করেছেন, জানা নেই। বিশ্ববাজারে এক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা ও প্রতিযোগী দেশগুলোর নানা পদক্ষেপ বোধকরি তাদের অজানা নয়। তাহলে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো কেন? উল্লেখ্য, গত কয়েক বছরে দেশে আলু উৎপাদন বেড়েছে অব্যাহতভাবে। কৃষি মন্ত্রণালয়েরই একটি তথ্যে বলা হয়েছে, পাঁচ বছর আগের তুলনায় ২০১৫-২০১৬ সালে এর পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ১৫ দশমিক ৩০ শতাংশ। মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পর দেশে এখন আলু উদ্বৃত্ত থাকে প্রায় ৫৪ লাখ টন। এ থেকে বোঝা যায়, ইস্যুটির ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার আগে ঠিকমতো ভাবা হয়নি। অথবা এ দায়িত্ব যাদের দেওয়া হয়েছিলÑদেশের আলু উৎপাদন, অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও এটি থেকে রফতানি আয়ের ব্যাপারে হালনাগাদ তথ্য তাদের কাছে ছিল না। থাকলে এত অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত তারা হয়তো নিতেন না।

এটা ঠিক, গত কয়েক বছরে দেশে কিছু আলু প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা স্থাপিত হয়েছে। এগুলোর প্রসেসিং করা পণ্য রফতানিও হচ্ছে পাশের দেশে। রফতানি স্বাভাবিক থাকলে এসব কোম্পানিকে বাজার থেকে আলু সংগ্রহ করতে হয় অপেক্ষাকৃত বেশি দামে। রফতানি স্থগিতের কারণে দাম কমে আসায় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এটি পরিণত হয়েছে কম দামে আলু কেনার সুযোগে। স্থানীয় শিল্পকে উদ্বুদ্ধ ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে সুরক্ষার জন্য এমন সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এক্ষেত্রে প্রশ্ন থেকে যায়Ñপ্রক্রিয়াকৃত আলুপণ্য রফতানি করে যে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হবে, তা কি অপ্রক্রিয়াকৃত আলু রফতানি আয়ের তুলনায় বেশি? সাম্প্রতিক সময়ে প্রক্রিয়াকৃত আলুপণ্য রফতানি এতটা বেড়ে উঠেছে বলে মনে হয় না। মূলত এর মাধ্যমে মুনাফা চলে যাবে কিছু প্রতিষ্ঠানের মালিকের পকেটে; বঞ্চিত হবে সাধারণ কৃষক।

শুরুর দিকে আলু ১৮টি দেশে রফতানি হলেও সংখ্যাটি ক্রমে উন্নীত হয়েছিল ২৭-এ। নগদ সহায়তা কমানোয় নতুন বাজার অন্বেষণের প্রচেষ্টাও দেখা যাবে না সংশ্লিষ্টদের মধ্যে। এক্ষেত্রে আরেকটি বাস্তবতা হলো, নতুন বাজার অন্বেষণের মতোই ভালো ও বিশ্বস্ত ক্রেতা খুঁজে পেতে কষ্ট করতে হয় সংশ্লিষ্টদের। কোনো বাজারে রফতানি যখন বন্ধ হয়ে যায়, আমদানিকারকরা অন্য বাজারমুখী হনÑপরিস্থিতির পরিবর্তন হলে সম্পর্ক স্বাভাবিকের জন্যও একই রকম প্রচেষ্টা নিতে হয় ব্যবসায়ীদের। এ পরিস্থিতির কারণে প্রতিষ্ঠিত বাজারের কিছু ক্রেতা যে আমাদের হাতছাড়া হবে, তাতে সন্দেহ নেই।

প্রশ্ন হলো, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও রফতানি বাজারে আগের অবস্থানে থাকা কি সহজ হবে বাংলাদেশের জন্য?

রফতানি আয় প্রবৃদ্ধি যখন নেতিবাচক হচ্ছে ক্রমে, তখন এমন সিদ্ধান্ত সুবিবেচনাপ্রসূত কি না, সে প্রশ্নও উঠবে। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, জনশক্তি রফতানি থেকেও কমেছে বৈদেশিক মুদ্রা আয়। যদিও আমাদের মোট রফতানি আয়ে আলুর অবদান নগণ্য, তবু একে অবহেলার দৃষ্টিতে দেখা উচিত হবে না। কারণ বিশ্ববাজারে মোট রফতানিতে বাংলাদেশের অবদান প্রায় ৩ শতাংশ। এটি আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। এ বাজারে নিজেদের অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে তাতে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ও বাড়বে। এ অবস্থায় সরকারের উচিত হবে আলু রফতানিতে নগদ সহায়তার হার না কমিয়ে সেটাকে বরং প্রতিযোগী দেশগুলোর সমপর্যায়ে নিয়ে যাওয়া এবং রফতানিকারকদের দেশের মতো লজিস্টিক সাপোর্ট জোগানো। তাহলে বিশ্ববাজারে নিজেদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর পাশাপাশি ন্যায্যমূল্য জোগানো সম্ভব হবে স্থানীয় কৃষকদের।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এ প্রশ্নের উত্তর জরুরি যে, উদ্বৃত্ত যেসব আলু বাজারে বা কৃষকের হাতে রয়েছে, সেগুলো নিয়ে আমরা কী করব? আমরা কি চাই খোলা অবস্থায় থেকে সেগুলো পচে যাক? অথবা ক্ষুব্ধ কৃষক সেগুলো ফেলে দিক নদী বা পুকুরে? কারণ প্রাকৃতিক সংরক্ষণ পদ্ধতি অবলম্বন করে আলুকে খুব বেশিদিন ভালো রাখা সম্ভব নয়। এ অবস্থায় একটিই উপায়Ñরফতানিতে উৎসাহ জোগানো। বিশ্ববাজারে এ পণ্য রফতানিতে প্রতিযোগিতার যে পরিস্থিতি, তাতে স্পষ্টতই ধারণা করা যায়, সরকার প্রণোদনা না জোগালে রফতানিকারকরা তেমন উৎসাহ দেখাবেন না। এতে তাদের খুব একটা ক্ষতি নেই। কারণ যেটুকু সংরক্ষণের ব্যবস্থা হাতে আছে, সিংহভাগ রফতানিকারক সেটুকুই কিনেছেন। অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত ক্ষতির হুমকি থাকছে কৃষকের সামনে। এখন কৃষককে দুশ্চিন্তা থেকে যত তাড়াতাড়ি মুক্তি দেওয়া যায়, ততই মঙ্গল। নইলে আগামী বছর তারা এটি উৎপাদনে উৎসাহ পাবে না। এতে উৎপাদন কমে গেলে স্থানীয় বাজারে দাম যেমন বাড়বে, তেমনি উদ্বৃত্তের পরিমাণ কমে গেলে হ্রাস পাবে রফতানি আয়। সেটাও দেশের জন্য ইতিবাচক হবে না।

একসময় সেøাগান দেওয়া হতোÑবেশি করে আলু খান, ভাতের ওপর চাপ কমান। এটা ছিল মূলত দুটি কারণে। তখন চালের উৎপাদন ছিল কম এবং যে আলু উৎপাদন হতো, বাজারে পর্যাপ্ত চাহিদা না থাকায় কৃষক ন্যায্য দাম পেতো না। দেশে এখন তরকারি বা ভাতের বিকল্প হিসেবে আলু পরিভোগের পরিমাণ বেড়েছে কি না, জানি না। তবে প্রক্রিয়াকৃত আলুপণ্যের পরিভোগ যে কিছুটা হলেও বেড়েছে, তা বলা যায়। সরকার যদি এ ধরনের শিল্পকে সহায়তা জোগাতে চায়, সেটা অন্যভাবেও সম্ভব। কিন্তু রফতানিকারকদের নগদ অর্থসহায়তা কমিয়ে এটা করার চেষ্টা হলে তাতে কৃষকরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে রফতানি আয় যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তা অন্যভাবে পুষিয়ে নেওয়া বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের পক্ষে কঠিন। আলু রফতানিতে এ স্থবিরতা দীর্ঘদিন জিইয়ে রাখলে যে ক্ষতি হবেÑপরবর্তী সময়ে প্রণোদনা জোগানো হলেও দ্রুত তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে না, এটাও মনে রাখতে হবে নীতিনির্ধারকদের।

 

ব্যাংক কর্মকর্তা

ahirul.duÑgmail.com