প্রচ্ছদ সাক্ষাৎকার

উদ্যোক্তা শ্রেণির পরিধি বাড়লে কমে আসবে খেলাপি ঋণ

ড. মো. আখতারুজ্জামান বর্তমানে বিআইবিএমের মহাপরিচালক হিসেবে কর্মরত। এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ও নির্বাহী পরিচালক (গবেষণা) ছিলেন তিনি। দায়িত্ব পালন করেছেন মুদ্রানীতি, সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়নসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতে। সম্প্রতি শেয়ার বিজের সঙ্গে কথা বলেছেন দেশের ব্যাংক খাত ও অর্থনীতির নানা প্রসঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শেয়ার বিজের নিজস্ব প্রতিবেদক শেখ আবু তালেব

শেয়ার বিজ: অর্থনীতির সবচেয়ে আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে সরকারের ঋণগ্রহণ প্রবণতা। বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?

আখতারুজ্জামান: এটি সত্য যে, সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের ব্যাংকঋণ গ্রহণ অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে গত বছরের তুলনায়। দেখুন, সরকার জনগণের জন্য কাজ করে। উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত বিভিন্ন সেবা দেওয়া রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, যেমন- ঢাকা ওয়াসা, পেট্রোবাংলা, যোগাযোগ, কৃষি বিভাগ, বিদ্যুৎ বোর্ড প্রভৃতির অবকাঠামোগত সম্প্রসারণে বিশেষ মনোনিবেশ করেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন নিরবচ্ছিন্ন রাখতে এ খাতে বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ করে যাচ্ছে সরকার। এসবই উৎপাদন খাতের জন্য বিনিয়োগ। এগুলো বাণিজ্যিক আকারে চালানো সম্ভব নয়।

এখানে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। বেসরকারি খাতের পক্ষে এই বিনিয়োগ সম্ভব নয়। যদিও এর সুবিধা বেসরকারি খাত পায়; এর ফলেই উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। বেসরকারি খাত এটি ছাড়া উৎপাদনে যেতে পারবে না। এভাবে সরকারি বিনিয়োগ এক পর্যায়ে বেসরকারি খাত সম্প্রসারণে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এজন্য সরকারকে প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থের সংকুলান করতে ঋণ নিতে হচ্ছে বেশি। মনে রাখতে হবে, আমরা উন্নয়নশীল থেকে উন্নত রাষ্ট্রের দিকে যাচ্ছি। তাই বড় প্রকল্প নিতে হবেই। এজন্য ভবিষ্যতে অন্তত আরও চার-পাঁচ বছর ব্যাপক বিনিয়োগ প্রকল্প বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত খরচ বাড়বে।

শেয়ার বিজ: ঋণ গ্রহণের হার যথার্থ কি না?আখতারুজ্জামান: বড় অবকাঠামো নির্মাণের কারণে সরকারের ঋণ প্রবৃদ্ধি বেশি। গত বছর এটি ছিল ২৮ শতাংশ। এ বছর তা বৃদ্ধি পেয়েছ। গত জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত এটি ৫১ শতাংশের বেশি হয়েছে। এটি হতেই হবে যা অস্বাভাবিক কিছু নয়। বড় প্রকল্প ও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নও উৎপাদনশীল খাতের জন্য। সরকার তো এ ঋণ অনুৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করছে না। অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় করলে অর্থনীতির জন্য সমস্যা। পদ্মা সেতু নির্মাণ শেষ হলে এর সুবিধা বেসরকারি খাতই বেশি পাবে। তখন এ সমস্যা থাকবে না। সার্বিকভাবে ঋণ গ্রহণ অস্বাভাবিক নয়।

শেয়ার বিজ: একদিকে ব্যাংক খাতে আমানত প্রবৃদ্ধি কমে যাচ্ছে, আবার সরকার ঋণ বাড়াচ্ছে। এতে কি বেসরকারি খাতে ঋণ কমে যাচ্ছে?

আখতারুজ্জামান: আমি মোটেই তা মনে করি না। অর্থনীতির সূচক একটির সঙ্গে আরেকটির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বর্তমানে রপ্তানিতে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি চলছে। আমাদের শিল্প চলে মূলত রপ্তানিনির্ভর প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের ওপর ভর করে। সেখানে ঋণের চাহিদা কম রয়েছে। ব্যবসায়ীরা মূলত ঋণ নেন মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি ও চলতি মূলধনের জন্য। এখন তাদের চাহিদা কম। এটি নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ নেই। অর্থবছর শেষে রপ্তানি কিছুটা বৃদ্ধি পাবে। আমাদের পোশাক রপ্তানিকারকরা মূলত গ্রীষ্মকালীন পোশাক বেশি সরবরাহ করেন। তাই রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ শতাংশ পর্যন্ত ধনাত্মক হতে পারে।

আমদানিও এখন কম। আমাদের কম রপ্তানির জন্য উৎপাদনও কম হচ্ছে; ফলে আমদানিও কম লাগছে। সেখানে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ তো কমবেই। চাহিদা না থাকলে ঋণ যাবে কোথায়। যেমন, ক্ষুধা লাগলেই তো মানুষ খাবে। চাহিদার চেয়ে তো বেশি ঋণ বিতরণ সম্ভব নয়।

দেখতে হবে আমাদের ব্রড মানির সার্কুলেশন কেমন। আমাদের ব্রডমানি গ্রোথ বেশ ভালো। বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি দেখে শুধু তা বোঝা যাবে না। বর্তমানে এটি ১২ শতাংশের কাছাকাছি রয়েছে। আমাদের রিজার্ভ মানিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। সার্বিক বিবেচনায় আমাদের ঋণ প্রবৃদ্ধি ভালো আছে। এ মুহূর্তে সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধির সূত্রে অবকাঠামোগত  উন্নয়নের সুফল খুব একটা না পেলেও এর দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন প্রভাব খুবই ভালো হবে। এজন্য সেসব ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় বড় ধরনের উদ্বেগের কিছুই নেই। ঋণ প্রবৃদ্ধি সঙ্গে এখনও আমানতের প্রবৃদ্ধির কিছুটা হলেও সামঞ্জস্য আছে।

শেয়ার বিজ: বর্তমান চিত্রে ব্যাংক খাতে ৬ ও ৯ শতাংশ সুদহার বাস্তবায়ন সম্ভব কী?

আখতারুজ্জামান: ৬-৯ সুদহার নিয়ে খুব বেশি কথা বলার নেই। এটি গড় সুদহার। মোট আমানতের ২০ শতাংশই হচ্ছে চলতি হিসাবের। এর বিপরীতে কোনো সুদ দেয় না ব্যাংক। এটি বাদ দিলে সঞ্চয়ী আমানতকারীদের গড় সুদ তো সাতের কাছাকাছি হতে পারে। এটি হলেও সমস্যা নেই। তারপরও ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়া সম্ভব।

শেয়ার বিজ: এজন্য ঠিক কোন ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন?

আখতারুজ্জামান: প্রথমেই ব্যাংকের স্প্রেড (ঋণ ও আমাতের সুদহারের ব্যবধান) বর্তমানের চেয়ে কমিয়ে আনতে হবে। এছাড়া ব্যাংকের জৌলুসপূর্ণ সাজসজ্জার ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসা প্রয়োজন। আরেকটি দিক হচ্ছে, উচ্চ মুনাফা করার প্রবণতা কমাতে হবে ব্যাংক উদ্যোক্তাদের।

শেয়ার বিজ: একটু খোলাসা করে যদি বলেন…

আখতারুজ্জামান: বর্তমানে ব্যাংক খাতে স্প্রেড হচ্ছে চার শতাংশের কাছাকাছি। আমরা স্প্রেড যদি তিন শতাংশের মতো রাখতে পারি, তাহলে আমানতের সুদহার সাড়ে ছয় শতাংশে উঠলেও সমস্যা নেই। বিশ্বের যে কোনো দেশের বিবেচনায় দুই থেকে আড়াই শতাংশ স্প্রেডই যথেষ্ট। এটি এখন আর চার শতাংশ ধরে রাখার প্রয়োজন নেই। স্প্রেড আমাদের কমাতেই হবে। এটি ব্যাংকারদের চিন্তাভাবনা করতে হবে।

প্রচলিত নিয়মে ব্যাংকের কিছু খরচের খাত ও পরিমাণ বেঁধে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। আমার মতে, এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আরও রক্ষণশীল হতে হবে। বেসরকারি ব্যাংকগুলোয় জৌলুস একটু বেশি। তারা অবকাঠামোসহ বেশ কিছু খাতে প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত বিলাসী খরচ করছে। এটি কমানোর পাশাপাশি লাক্সারি দ্রব্যের ব্যবহার কমাতে হবে। জনসাধারণকে সস্তায় সেবা দিতে হলে বিলাসী খরচ কমাতেই হবে।

৬-৯ হারে সেবা দিতে হলে খরচ কমাতে হবে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী সুদহার কমাতে বলেছেন, তিনি এটি খুব মহৎ চিন্তা থেকেই বলেছেন। সুচিন্তিত বিশ্বাস দিয়েই বলেছেন তিনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের এ বিষয়ে যে গাইডলাইন আছে, তাতে না কুলালে তা যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। নতুন গাইডলাইনের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোয় অবকাঠামো খরচসহ অন্যান্য খরচ আরও বেশি যৌক্তিক করতে হবে। এটি করতে পারলে ৯ শতাংশে ঋণ বিতরণ সম্ভব।

খেলাপি ঋণের উচ্চহারের পরও ব্যাংকগুলো কিন্তু অনেক বেশি মুনাফা করছে প্রতি বছর। তারা বোনাস ও ক্যাশ ডিভিডেন্ড দিচ্ছে। উচ্চ মুনাফা করার প্রবণতা থেকেও বেরিয়ে আসতে হবে ব্যাংক উদ্যোক্তাদের।

শেয়ার বিজ: ব্যাংকাররা বলছেন, খেলাপি ঋণের উচ্চহারের কারণে এটি বাস্তবায়ন এখনই সম্ভব নয়। বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?

আখতারুজ্জামান: গত ১০ বছর ধরেই আমরা ১০ শতাংশ খেলাপি ঋণ নিয়ে চলছি এবং এ পরিবেশেই আট শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। অনেকেই বলবেন, খেলাপি ঋণের উচ্চহারের কারণে স্প্রেড চার শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা সম্ভব নয়। কিন্তু ঋণতথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, খেলাপি ঋণের কারণে তহবিল খরচ হচ্ছে মাত্র দশমিক পাঁচ শতাংশ। অর্থাৎ, আধা শতাংশ। অনেকেই বলবে এটি এক শতাংশ; কিন্তু আসলে এক শতাংশ নয়।

এ হিসাবে আমানতের সুদহার ছয় শতাংশ ও খেলাপি ঋণের কারণে আরও আধা বা এক শতাংশ যোগ হলেও আমরা ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দিতে পারব। আড়াই থেকে পৌনে তিন শতাংশ স্প্রেড থাকলেই তা সম্ভব।

স্প্রেড কমাতে গেলে আমাদের ব্যাংক খাতের উৎপাদনশীলতা ও অন্যান্য সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। এজন্য বিআইবিএমও সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। আমাদের কাজই হলো ব্যাংক ও ব্যাংকারদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংক বসে রয়েছে ব্যাংক খাতকে অটোমেশন (স্বয়ংক্রিয়) ব্যবস্থায় নিয়ে যেতে। অটোমেশন যত হবে, ব্যাংকের অপারেটিং খরচ ততই কমবে।

শেয়ার বিজ: বর্তমানে সরকারি হিসাবে মূল্যস্ফীতিই সাড়ে পাঁচ শতাংশ। সেখানে আমানতের সুদহার ছয় শতাংশে নামিয়ে আনলে মানুষ ব্যাংকবিমুখ হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায় কি না?

আখতারুজ্জামান: সুদহার ৬-৯ হলে এখানে একটি সীমাবদ্ধতা আছে। মূল্যস্ফীতির বিবেচনায় আমানতের সুদহারের বিপরীতে প্রকৃত আয় কমে যাবে, যদি আমরা মূল্যস্ফীতি পাঁচ শতাংশের নিচে নামাতে না পারি। এটি এখন আমরা পারব। এটি করতে পারলে এর প্রভাব খুব ভালো হবে। প্রকৃত সুদহার যেটি ভারত, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনামে দুই থেকে দেড় শতাংশে রাখতে পেরেছে শুধু তাদের মূল্যস্ফীতি অতি নি¤œমাত্রায় সীমিত রাখার প্রেক্ষাপটে। আমাদের দেশে মূল্যস্ফীতি যদি ওই মাত্রায় কমানো যায়, তাহলে ৬-৯ শতাংশ বাস্তবায়ন সহজ হবে।

শেয়ার বিজ: এটি সম্ভব কি না?

আখতারুজ্জামান: আমাদের মূল্যস্ফীতিতে প্রায় ৫৫ শতাংশই গুরুত্ব অনুপাত দেওয়া হচ্ছে খাদ্যপণ্যে। কিন্তু খাদ্য মূল্যস্ফীতি নির্ভর করে দেশজ উৎপাদনের ওপর।  নন-ফুড বা খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি প্রায় পুরোটাই আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এজন্য এটির মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক যদিও মুদ্রানীতির মাধ্যমে  মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করে। ভোগ্যপণ্য, বিশেষ করে খাদ্যের দর সরকার ও জনগণ মিলে পর্যাপ্ত সরবরাহ ব্যবস্থার মাধ্যমে কমাতে বা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে।

মূল্যস্ফীতিতে চালের অবদান হচ্ছে প্রায় ২০ শতাংশের মতো, সবজি ও অন্যান্য মিলে পাঁচ শতাংশ, মাছ ও মাংস সাত শতাংশ। আমাদের উৎপাদন খুব একটা নষ্ট হয়নি। সরবরাহ ব্যবস্থা যদি ঠিক থাকতে পারে, তাহলে মূল্যস্ফীতি ঠিক থাকবে। চালের দর ঠিক রাখতে পারলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে পারবে। পেঁয়াজের দর বেড়েছে। তেলের দামও কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু এ দুটির মূল্যস্ফীতিতে অবদান পাঁচ শতাংশের বেশি না।

সরকার যদি অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে পণ্য পরিবহন সহজ করতে পারে। তাহলে তো খরচ কমে যাওয়ার কথা। ব্যবসায়ীদেরও সহযোগিতা লাগবে। তাদেরও মুনাফা কম করতে হবে। এটি করতে পারলে মূল্যস্ফীতি অনেক নিচে নামিয়ে আনা সম্ভব।

শেয়ার বিজ: সুদহার এক অঙ্কে নামলে অর্থনীতিতে কেমন পরিবর্তন আসবে?

আখতারুজ্জামান: সুদহার কম হলে বিনিয়োগ বাড়বে। নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে। স্বল্প মূলধনের ব্যবসায়ীদের সুবিধা হবে, সহজ হবে তাদের ঋণপ্রাপ্তি। অর্থনীতির আকার দ্রুত বড় হবে।

শেয়ার বিজ: ঋণ বড়দের দখলে চলে যাচ্ছে। এ কারণে খেলাপি ঋণ পুঞ্জীভূত হচ্ছে বড় গ্রহীতাদের কাছে। এ থেকে বের হওয়ার উপায় কী?

আখতারুজ্জামান: আমাদের উদ্যোক্তা শ্রেণি খুব বেশি দিনের নয়। মাত্র দুই দশকের। আজকে যারা বড় গ্রুপ, তাদের ইতিহাস দুই থেকে চার দশকের। তাদের সক্ষমতা বেশি। তাদের অভিজ্ঞতাও বেশি। এজন্য ঋণও নিচ্ছে বেশি। এটিকে তো ছোট করা যাবে না। তারা অনেক দক্ষ। অপ্রিয় হলেও সত্য, এ কারণে বড়দের কাছে খেলাপির সঙ্গে ঋণও পুঞ্জীভূত হচ্ছে। এটি ভারত, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডেও আছে। এটি নিয়েই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। এখন সময় হয়েছে এখান থেকে বের হওয়ার।

এসএমইতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। এসএমইকে আমরা যদি বড় করতে পারি, তাদের দক্ষতা বাড়াতে পারি, তখন ব্যবসা বাড়বে। এজন্য তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে রাষ্ট্রকেও সহযোগিতা করতে হবে। একপর্যায়ে দেখা যাবে, তাদের ঋণ চাহিদা বৃদ্ধি পাবে। বাজারের নিয়ন্ত্রণে প্রভাব ফেলবে। ভালো উদ্যোক্তাদের পরিধি বৃদ্ধি পেলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ তখন এমনিতেই কমে আসবে। তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে পারলে বড়রা থাকলেও সমস্যা নেই।

মোদ্দা কথা হচ্ছে, তাদের যদি আমরা অপ্রাতিষ্ঠানিক থেকে প্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়ে আসতে পারি, তাহলে তাদের ব্যবসাও বৃদ্ধি পাবে। ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধি পাবে। সরকারের রাজস্ব আদায়ও বাড়বে। রপ্তানিও বাড়বে। যারা উদীয়মান তাদের এবং সম্ভাবনা আছে তাদের বড় করতে হবে। এজন্য মানবসম্পদ উন্নয়ন করতে হবে।

শেয়ার বিজ: ব্যাংক খাতে সুশাসনের বড় ঘাটতি দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। এজন্য ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?

আখতারুজ্জামান: সুশাসনের উন্নতির জন্য আমাদের প্রথমেই সুশিক্ষায় অগ্রাধিকার দিতে হবে প্রথমে। এর মধ্যে সাধারণ শিক্ষা, কারিগরি ও আর্থিক বিষয়ে শিক্ষা দিতে হবে। এটি করলে উদ্যোক্তা শ্রেণি বাড়বে, তাহলে  শিক্ষিত উদ্যোক্তা শ্রেণির বিকাশের মাধ্যমে প্রতিযোগিতা তৈরি হবে। প্রতিযোগিতা তৈরি হলে বড়দের দাপট কমে যাবে। পণ্য উৎপাদন খরচ উঠিয়ে তুলনামূলক কম মুনাফায় পণ্য ছেড়ে দেবেন উদ্যোক্তারা। উদ্যোক্তা শ্রেণির কারণে উন্নত প্রতিযোগিতার পরিবেশ বড়দের দাপট কমে যাবে। তখন ভালো গ্রাহকদের ব্যাংক ঋণ দেবে। এতে খেলাপির হার কমে আসবে। পাশাপাশি আর্থিক খাতের জন্য বিশেষ আদালত স্থাপন করতে পারলে এ খাতে সুশাসন বৃদ্ধি পাবে।

শেয়ার বিজ: ঋণখেলাপি কমিয়ে আনতে নতুন কী করা যায়?

আখতারুজ্জামান: খেলাপি হওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে মোরাল হ্যাজার্ড। একটি খারাপ প্রজেক্টকে ভালো প্রজেক্ট হিসেবে দেখানো হয়। আবার ভালো ঋণ আবেদনকে খারাপ হিসেবে দেখানো হয়। ঋণের বিপরীতে জামানত সম্পত্তি নিয়ে বাংলাদেশ একটি নতুন কাজ করছে। এতে মুভাবেল ও ইমমুভাবেল সম্পত্তিকে রেজিস্ট্রির আওতায় নিয়ে আসছে। এগুলোকে মূল্যায়ন করে বুঝা যাবে, কোন গ্রাহককে কত ঋণ দেওয়া যায়। এজন্য প্রথমেই ই-কেওয়াইসি বাস্তবায়ন করা দরকার দ্রুত। এটি হলে ব্যাংকের অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। এটি আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যে হলে ভালো হয়।

শেয়ার বিজ: সরকার শুধু খেলাপিদের বিভিন্ন ছাড় ও সুবিধা দিচ্ছে। এতে ভালো গ্রাহক নিরুৎসাহিত হবে না তো?

আখতারুজ্জামান: বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয় এটি নিয়ে কাজ করছে। যারা ভালো গ্রহীতা তাদেরও কিছু সুবিধা দেওয়া উচিত। যাতে তারাও খেলাপি না হয়ে যান। এটি ঠিক খেলাপিদের ছাড় দেওয়া নিয়ে সমালোচনাও আছে বিভিন্ন মহলে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকার যা করছে, তা কিন্তু অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র দেখেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এজন্য ব্যবসায়ীদের কিছু সুবিধা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। উদ্যোক্তা শ্রেণি বড় হলে বড়দের সুবিধা দেওয়ার পরিমাণ কমে যাবে।

শেয়ার বিজ: বর্তমানে ব্যাংকের পরিচালকরা পর্ষদের অনৈতিক চাপে থাকেন বলে দাবি করেন। এক্ষেত্রে ডায়নামিক ব্যাংকার তৈরি হচ্ছে না কেন?

আখতারুজ্জামান:ব্যাংক উদ্যোক্তারা তো সুবিধা নিতে ও বেশি মুনাফা অর্জনের জন্য চাপ  দেবেই। এই চাপ স্বীকার করেই তো একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক হন। তাকেও পরিচালনা পর্ষদকে বুঝানোর সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। তাকে সহায়তা করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন নীতিমালা রয়েছে। এটি নির্ভর করে ব্যক্তির ওপর। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদেরও পর্ষদের সদস্যের সঙ্গে ভালো বুঝাপড়া থাকতে হয়।

এছাড়া ব্যাংকারদের সফট স্কিল উন্নত করা প্রয়োজন। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অধস্তনদের নিয়ন্ত্রণ, মোটিভেশন, দক্ষতা উন্নয়নে মানবিক হতে হবে। নেতৃত্বের গুণাবলি থাকতে হবে। এটিকে বর্তমানে সফট স্কিল বলে। এটি এখন ভাবা হচ্ছে। এটি লাগবে ব্যাংকারদের। সফট স্কিল উন্নয়ন নিয়ে বিআইবিএম কাজ করছে।

শেয়ার বিজ: ব্যাংক খাতে যেভাবে ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে এই পেশার আভিজাত্য ঠিক থাকা বা নতুন প্রজন্ম আগ্রহী হয়ে উঠবে না সেভাবে, এটি মনে করেন কি না?

আখতারুজ্জামান: ঝুঁকি নেই কোন পেশায়, সব পেশায় ঝুঁকি আছে। চ্যালেঞ্জ তো থাকবেই। এখানে যোগ্যতা প্রমাণ করার সুযোগ আছে। রয়েছে সম্মান ও অর্থের নিরাপত্তা। আমি যদি উৎপাদনশীল ও সম্ভাবনাময় খাতে কাজ করতে চাই, তাহলে ঝুঁকি নিতে হবে। যারা ঝুঁকি নিতে রাজি হবে, তারা আসবে।

শেয়ার বিজ: ব্যাংক খাত প্রযুক্তি সন্নিবেশের কারণে একটি বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি কোন দিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত?

আখতারুজ্জামান: গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন, এটি এখন বড় সত্য যে, ব্যাংক খাত পরিবর্তনশীল যুগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইন্টারনেট বেজড ব্যাংকিং আরও সম্প্রসারণ করাই লাগবে। আমাদের অটোমোশনে যেতে হচ্ছে…সাইড বাই সাইড। এজন্য আমাদের সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। আমরা চাই ব্যাংকের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনবল তৈরি করতে। এজন্য বিআইবিএম আইটিতে মাস্টার্স কোর্স চালু করার বিষয়ে আলোচনা করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আমরা যৌথভাবে এই কোর্সটি করার পরিকল্পনা করছি। এতে ব্যাংকারদের মধ্যে একটি দল দক্ষ হতে পারবে। প্রয়োজনীয় জনবল তৈরিতে আমরাও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারব।

শেয়ার বিজ: বলা হয় ব্যাংকগুলো গবেষণা খাতে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখায় না। এর পেছনের কারণ কী বলে মনে করেন?

আখতারুজ্জামান: ব্যাংকগুলোর ট্রেনিং প্রতিষ্ঠানগুলোয় সেভাবে রিসার্চ হয় না। যেমন গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী নতুন পণ্য নিয়ে আসা। শুধু ব্যাংক পরিচালনায় বেসিক ট্রেনিং দেয় তারা। ব্যাংকিং সেক্টরে কী করা যায়, সে ব্যাপারে ওই সব ট্রেনিং ইনস্টিটিউটগুলো  বিআইবিএমের সঙ্গে যৌথভাবে তা নিয়ে গবেষণা করতে পারে।

বিআইবিএম এটি করছে। কীভাবে কম খরচে উন্নত মানের সেবা দেওয়া যায়, গ্রাহককে আকৃষ্ট করে এমন পণ্য উদ্ভাবন…পরিচিতি করতে বিআইবিএম এটি করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। অনেকেই গবেষণার প্রয়োজনীয়তা বুঝতে চায় না।

তারা ওভার কনফিডেন্ট বা অতি বিশ্বাসী। জ্যেষ্ঠ ব্যাংকার ও পর্ষদ সদস্য মনে করেন, আমরা ব্যাংকিং করছি, আমাদের অভিজ্ঞতা বেশি। ব্যাংকিং হলো হাতে-কলতে কাজ করার জায়গা, এখানে গবেষণার কী আছে। কিন্তু এর মানে এই নয়, গবেষণার প্রয়োজন নেই। এখানে গবেষণা বেশি প্রয়োজন। কারণ, কোনো ব্যাংক নতুন পণ্য না আনলে পিছিয়ে পড়বে, অন্যরা এগিয়ে যাবে।

শেয়ার বিজ: মূল্যবান সময় দেওয়ার জন্য শেয়ার বিজ পত্রিকার পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ।

আখতারুজ্জামান: আপনাকেও ধন্যবাদ, শেয়ার বিজের উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি কামনা করছি।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..