প্রচ্ছদ শেষ পাতা

উদ্যোগ অনেক, সমন্বয় কম

 

পুরান ঢাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আবর্তিত হচ্ছে কয়েকটি খাতকে ঘিরে। এসব খাত একদিকে যেমন অর্থনীতিতে অবদান রাখছে, অন্যদিকে কর্মসংস্থানেও রাখছে ভূমিকা। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডভিত্তিক খাতগুলো নিয়ে ধারাবাহিক আয়োজনের শেষ পর্ব

নাজমুল হুসাইন ও জাকারিয়া পলাশ: ব্রিটিশ আমল থেকেই পুরান ঢাকার অলিগলিতে গড়ে উঠেছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। সামান্য জায়গায় এত ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র উদ্যোগ বলতে গেলে বিশ্বে নজিরবিহীন। আর দেশের অন্য কোথাও এতটা শ্রমঘন এলাকা তেমন চোখে পড়ে না। বছরের পর বছর ধরে চলমান এসব প্রতিষ্ঠান দেশের অর্থনীতিতে অবদান রেখে চলেছে। বিপুল সম্ভাবনাময় এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে নানা ধরনের শিল্প পণ্যের খুচরা ও পাইকারি কেনাবেচা ও প্রস্তুত করা হয়। তবে নানা উদ্যোগ থাকলেও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র এসব উদ্যোগের মধ্যে সমন্বয়হীনতার অভাব রয়েছে। ফলে দেশের প্রচলিত অর্থনীতির মূল ধারার বাইরে থেকে যাচ্ছে বিপুল এ কর্মযজ্ঞ।

চামড়া, অটোমোবাইল, ইস্পাত, ইলেকট্রনিকস, মেশিনারি, হার্ডওয়ার, ট্রান্সপোর্ট, হাল্কা প্রকৌশল থেকে শুরু করে পণ্য বাজারের শত শত পণ্য, প্লাস্টিক, কাপড়, ধাতব যন্ত্রাংশ, কৃষি যন্ত্রপাতির মতো শিল্পগুলোর খুচরা পাইকারি ও স্থানীয় প্রস্তুকারক হিসেবে পুরান ঢাকার বিভিন্ন ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। এসব খাতের ব্যবসায়িক উদ্যোগের বেশিভাগের শুরু এখানেই। আর আজও পুরান ঢাকায় এসব ব্যবসার ব্যবসায়ী, বিক্রেতা, আমতানিকারক, প্রস্তুতকারক সহ রফতানীকারকদের নানা ব্যবসায়ীক সংগঠন কাজ করে যাচ্ছে।

কিন্তু অনেকেই মনে করেন, নানা কারণে পুরান ঢাকায় জৌলুশ দেখা যায় না বিপুল এ আর্থিক খাতগুলোয়। বিভিন্ন খাতভিত্তিক এসব ব্যবসায় উদ্যোক্তাদের নানা রকম সংগঠন থাকলেও অধিকাংশই নিষ্ক্রিয়। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র এসব সংঘের প্রায় সবগুলোই বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ব্যবসায়ীদের মূল প্রতিষ্ঠান- এফবিসিসিআইর সদস্য হলেও কার্যকারিতা কম।

সূত্রমতে, ব্যবসায়ীদের সংগঠনগুলোর মধ্যে বিপুলসংখ্যক রয়েছে পুরান ঢাকায়। হাজারীবাগে চামড়া খাতের কয়েকটি সংগঠন, বংশালে বাইসাইকেল আমদানি, উৎপাদক ও বিক্রেতাদের ব্যবসায়ী সমিতি, মোটরসাইকেল ডিলার ও বিক্রেতাদের সংগঠন, ইস্পাত ও স্টিল মিলমালিক ও বিক্রেতাদের কয়েকটি সংগঠন, ইলেকট্রিক মেশিনারি ও হার্ডওয়ার বিক্রেতা ও প্রস্তুতকারকদের সংগঠন, অভ্যন্তরীণ পোশাক প্রস্তুতকারদের কয়েকটি সমিতি, বাংলাদেশ কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবসায়ী, প্লাস্টিক পণ্য প্রস্তুতকারকদের ও বিক্রেতাদের সমিতি, রাসায়নিক বিক্রেতা, এসিড বিক্রেতা, নির্মাণ যন্ত্রপাতি উৎপাদক ও ব্যবসায়ী সমিতি প্রভৃতির সিংহভাব ব্যবসায়ী পুরান ঢাকায়ই তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন।

পুরান ঢাকায় কতগুলো ব্যবসায়িক সংগঠন গড়ে উঠেছে তার সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সম্প্রতি ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর ২০১৭-২০১৯ মেয়াদকালের নির্বাচনের ভোটারদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশের বেশি ছিল পুরান ঢাকার। সর্বমোট ভোট প্রদানকারী ৩৮০টি অ্যাসোসিয়েশন থেকে এবারের ভোটার ছিল এক হাজার ৮৮৭ জন। যার মধ্যে প্রায় পুরান ঢাকায় সাড়ে ৬০০ ব্যবসায়ী ছিল বলে জানায় কয়েকটি সূত্র।

এসব সমিতি নানাভাবে ব্যবসায়ী মহলে প্রতিনিধিত্ব করলেও কার্যত পুরান ঢাকার ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়নে প্রতিষ্ঠানিক  কোনো উদ্যোগ নিতে পারছেন না। প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ে তাদের আগ্রহেরও অভাব রয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। দেখা যাচ্ছে, এসব ব্যবসায়ী সমিতি বিভিন্ন সময়ে তাদের নানা দাবি নিয়ে সোচ্চার। কিন্তু, পুরান ঢাকার পাশাপাশি সার্বিকভাবে দেশের কোনো বিশেষ খাতের সার্বিক ব্যবসা- সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ ও সরবরাহ করতে তারা আগ্রহী নন। ফলে দেখা যায়, এসব খাত নিয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য খুঁজে পাওয়া যায় না। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, যে কোনো স্থানের অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে পরিমাপ করা না গেলে তা পর্যালোচনা ও তদারকিও করা সম্ভব হয় না। পুরান ঢাকার ক্ষেত্রেও একই অবস্থা চলছে।

এদিকে পুরান ঢাকায় শতাধিক ব্যবসায়ী সমিতি ও প্রতিষ্ঠান থাকলেও কেন্দ্রীয়ভাবে এফবিসিসিআইর নেতৃত্বে তার খুব একটা প্রতিফলন হয় না বলেই অভিযোগ পুরান ঢাকার ব্যবসায়ীদের। পুরান ঢাকার ব্যবসা-বাণিজ্যে সমন্বয় ও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের জন্য সরকার ও এফবিসিসিআইর উদ্যোগ নেওয়া উচিত বলে মনে করেন পুরান ঢাকার ব্যবসায়ীরা।

পুরান ঢাকার ব্যবসায়ীরা বলেন, সব ধরনের ব্যবসায় বিচরণ করতে গিয়ে একদিকে যেমন পুরান ঢাকা সমৃদ্ধ হয়েছে, অপরদিকে ঝুঁকির মধ্যেও পড়ছে অনেক ক্ষেত্রে। রাসায়নিকের মতো ব্যবসা পরিবেশের সঙ্গে বিনিয়োগকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। ব্যবসা প্রসারের সঙ্গে বেড়েছে যানজটের মাত্রা। এতে বর্তমানে অনেক রাস্তাঘাট, ব্যবসাকেন্দ্র সহ ও মার্কেটে চলাচলের উপযোগিতা হারাচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে অবকাঠামো। আবার প্রকৃত ব্যবসায়ীদের মধ্যে অসাধু ব্যবসায়ীরা এখানকার ব্যবসা ও পণ্যের মানকে করছে প্রশ্নবিদ্ধ।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভলপমেন্ট স্টাডিজ (বিআইডিএস)-এর রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদের মতে, পুরান ঢাকার বাণিজ্যিক ব্যবস্থা খুবই ঐতিহ্যবাহী। এখানে প্রজšে§র পর প্রজš§ ব্যবসা করে আসছে। একটা বৈচিত্র্যময় ব্যবসায়িক অঞ্চল হিসেবে এ প্রতিষ্ঠানগুলোকে জাতীয় অর্থনীতির ক্ষেত্রে আরও বেশি অবদানের সুযোগ সৃষ্টি করা দরকার। মৌলিকভাবেই সেখানকার ব্যবসার ধরণ হচ্ছে অনানুষ্ঠানিক। ফলে সেখানে কমপ্লায়েন্স ও নিরাপত্তার বিষয়ে সচেতনতার অভাব রয়েছে। পেশাদারিত্বেরও ঘাটতি আছে। আছে দীর্ঘমেয়াদি বা টেকসই চিন্তার প্রসার ঘটছে না। উৎপাদনশীলতাও কম রয়ে যাচ্ছে। সেখানকার বিভিন্ন খাতের মধ্যে সমন্বয়ের পাশাপাশি ধীরে ধীরে এসব ব্যবসা উদ্যোগকে আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থায় আনা জরুরি।

তিনি বলেন, ‘আনুষ্ঠানিক ও পেশাদার ব্যবসা উদ্যোগে রূপান্তর করা গেলে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে উৎপাদনশীলতা ও আধুনিকায়ন হবে। ফলে উন্নত হবে কর্মপরিবেশ ও সার্বিক অর্থনৈতিক মান। এখন এ উদ্যোগ নিতে হলে ওইসব উদ্যোক্তাকে পেইড ও ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের সহযোগিতা দিতে হবে। অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে এসব উদ্যোক্তার সুযোগ দিতে হবে। তাদের গতানুগতিক যেসব স্থানীয় দক্ষতার সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক কৌশলের সমন্বয়ের জন্য সার্বিক মাত্রার একটা পরিকল্পনা নিতে হবে।’

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..