উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে জাতিসংঘের অনুমোদনে প্রাপ্তি ও চ্যালেঞ্জ

মো. শাহিন আলম: ১৯৭১ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ যাত্রা করে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অভাবনীয় সাফল্যের গল্প রচনা করতে থাকে। স্বাধীনতার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বৈষম্যহীন, ক্ষুধা এবং দারিদ্রমুক্ত ‘সোনার বাংলা’ গড়তে সক্রিয় ও দূরদর্শী নীতি গ্রহণ করেন। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (একোসোক) স্বল্পন্নোত দেশের (এলডিজি) তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। সময়ের পরিক্রমায় বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল ও দূরদর্শী নেতৃত্বে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের জন্য বাংলাদেশ ২০১৮ সালে প্রথমবারের মতো জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপ) তিনটি সূচকÑমাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ, জলবায়ু ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতার মানদণ্ড পূরণ করে; যে মানদণ্ডে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়। ফলে চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি সিডিপি বাংলাদেশকে ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হয়ে যাওয়ার সুপারিশ করেছে। সম্প্রতি এ সুপারিশ জাতিসংঘের অনুমোদনও পেয়েছে। যার ফলে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে শামিল হওয়ার পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল বাংলাদেশ।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং বঙ্গবন্ধুর জš§শতবার্ষিকী উদযাপনের এ সময়ে গোটা জাতির জন্যই এটা অন্ত্যত আনন্দের এবং গর্বের। কেননা, যুদ্ধবিধ্বস্ত ও নেহাত অপ্রতুল প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে যখন ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ আবির্ভূত হয়, তখন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের মতো অনেকেই বাংলাদেশকে ‘ভিক্ষার ঝুড়ি’ বলে নাক সিটকায়। এমনকি দুজন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ বাংলাদেশকে উন্নয়নের অগ্নিপরীক্ষা নামে আখ্যা দিয়ে হতাশার দৃষ্টিতে বলেছিলেন, বাংলাদেশের মতো দুর্দুশাগ্রস্ত দেশে যদি অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব হয়, তবে পৃথিবীর যেকোনো দেশেরই উন্নয়ন সম্ভব। অর্থনীতিবিদদের হতাশাব্যঞ্জক ভবিষ্যদ্বাণীকে আজ মিথ্যা প্রমাণ করেছে বাংলাদেশ।

তবে এ অর্জন একদিনে ঘটেনি। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি দূরদৃষ্টিসম্পন্ন পরিকল্পনার ফসল। এর জন্য নিরবচ্ছিন্ন ও টেকসই আর্থ-সামাজিক অগ্রগতির বিশাল প্রয়োজন ছিল। জনগণকে দারিদ্র্য থেকে তুলে আনতে এবং উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় শামিল করতে প্রচুর বিনিয়োগ করেছে সরকার। আজকের এলডিসি থেকে উত্তরণ বাংলাদেশের সামনে বেশ কিছু নতুন সম্ভাবনা নিয়ে এসেছে।

প্রথমত, এ উত্তরণ বাংলাদেশের নতুন ভাবমূর্তি ও ব্র্যান্ডিং গড়ে তুলবে। বিদেশি বিনিয়োগনারীরা বাংলাদেশে ব্যবসার উন্নত পরিবেশ সম্পর্কে ইতিবাচক সংকেত পাবে, আস্থা অর্জন করবে। ফলে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদেশি বিনিয়োগ আমাদের খুব দরকার। একইসঙ্গে প্রচুর কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের ক্রেডিট রেটিং বাড়বে। কেননা, এ উত্তরণের কারণে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে প্রতিযোগিতামূলক  আগের চেয়ে কম সুদের হারে বাণিজ্যিক ঋণ পাওয়ার সুযোগ বেড়ে যাবে। একইসঙ্গে বাংলাদেশের চাহিদা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ বা অনুদান প্রাপ্তিতে আগের চেয়ে অনেক বেশি সুবিধা তৈরি করবে।

তৃতীয়ত, এ উত্তরণের ফলে সার্বভৌম বন্ডের মাধ্যমে বৈশ্বিক বাজার থেকে সম্পদ স্থানান্তর করে দেশে নিয়ে আসার সুযোগ তৈরি করবে। একইসঙ্গে এটি বেসরকারি খাতে ঋণ গ্রহণের সক্ষমতাও বাড়িয়ে তুলবে। ফলে বেসরকারি খাতের মূলধন সংগ্রহে সৃষ্ট বিভিন্ন সমস্যাগুলো অনেকাংশ কমে যাবে।

চতুর্থত, উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের বিভিন্ন আঞ্চলিক এবং উপ-আঞ্চলিক ব্লকে যোগাদানের সুযোগ তৈরি হবে। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তিসহ নানা ধরনের বাণিজ্যিক অংশীদারি হিসেবে সক্ষমতা অর্জন করবে।

একইসঙ্গে উত্তরণের এ সময়টাতে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে আমাদের। এগুলো হচ্ছে ডব্লিউটিওর সুযোগ-সুবিধা থাকবে না, জিএসপি সুবিধা থাকবে না, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।

স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের সুপারিশ জাতিসংঘে অনুমোদন পাওয়ার পর উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে সাধারণভাবে প্রস্তুতির জন্য তিন বছর সময় দেয়া হলেও করোনার কারণে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এবার পাঁচ বছর সময় দেয়া হবে। এই সময়ে সরকার ও বেসরকারি খাত উভয়কেই প্রস্তুতি নিতে হবে আগামীর বাংলাদেশ তারা কেমন দেখতে চায়। বাংলাদেশ কতটা অর্থনৈতিক স্থিতিশীল অর্জন করতে সক্ষম হবে, সেটি নির্ভর করবে সরকারের দূরদর্শী পরিকল্পনা, নীতি গ্রহণ এবং স্বল্প সময়ে তার কার্যকর বাস্তবায়নে। সেক্ষেত্রে এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কার্যক্রমকে দৃষ্টান্ত হিসেবে অনুসরণ করতে হবে। ঝুঁকি মোকাবিলায় রপ্তানির কাঠামোকে শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা, রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি, আইসিটি খাতের উন্নয়ন সম্ভাবনার কার্যকর ব্যবহার, দারিদ্র্য নিরসন, বৈষম্য দূর ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং পিপিপি ধারণাকে বিস্তৃত করতে হবে। একইসঙ্গে এ পরিস্থিতিতে জনসংখ্যাকে মানবসম্পদে রূপাস্তরিত করার কর্মসূচিতে জোর দেয়াই হবে কার্যকর উপায়। বিশেষ করে বোনাস পিরিয়ডের আওতায় থাকা তরুণ প্রজš§কে সঠিকভাবে দক্ষ করে তুলতে পারলে তার সুফল পাওয়া যাবে। শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি ও দক্ষতার দিক থেকে তারা জনসংখ্যার অন্যান্য অংশের চেয়ে এগিয়ে। যদিও ইতোমধ্যে সরকার এ তরুণ প্রজন্মের দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে মানবসম্পদে রূপ দেয়ার কার্যক্রম শুরু করেছে। এদের কাজে লাগানোর পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে নারীদের অধিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারলে এলডিসির উত্তরণ প্রক্রিয়া খুব একটা কঠিন হবে না। তা ছাড়া দেশের উদ্যোক্তারা যদি উৎপাদিত পণ্যের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও পণ্যের বহুমুখীকরণ ও গুণগতমান বজায় রাখতে পারে, তাহলে ডব্লিউটিওর শুল্কমুক্ত সুবিধা হারানোর বিষয়টি খুব একটা প্রভাবিত করবে না।

পাশাপাশি এ মুহূর্তে আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের অগ্রগতি ধরে রাখা। উন্নয়নের আজকের এ প্রগতি অব্যাহত থাকলে এবং এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী গৃহীত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষমতা অর্জনে সফল হলে শিগগির বাংলাদেশ একটি উন্নত, সমৃদ্ধ এবং মর্যাদাপূর্ণ বঙ্গবন্ধুর ‘সোনার বাংলা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন   ❑ পড়েছেন  ৯৪৬  জন  

সর্বশেষ..