দিনের খবর প্রচ্ছদ শেষ পাতা

উন্নয়ন প্রকল্পে করোনার ধাক্কা লাগার শঙ্কা

মাসুম বিল্লাহ: বিশ্বব্যাপী বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় করোনাভাইরাস। গতকাল পর্যন্ত বিশ্বের ৫৮টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে প্রাণঘাতী ভাইরাসটি এবং আরও অনেক দেশে ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা রয়েছে। এরই মধ্যে ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন তিন হাজারের বেশি মানুষ, যাদের বেশিরভাগই চীনা নাগরিক। তবে আশার কথা হলো বাংলাদেশে এখনও কেউ এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়নি বলে জানা গেছে। কিন্তু ভাইরাসটির অবস্থান দীর্ঘায়িত হলে তার প্রভাব পড়বে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বিশেষ করে যেসব প্রকল্পে চীনা নাগরিকরা কাজ করেন এবং যেগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র চীন থেকে আমদানি করতে হয়, সেগুলোর বাস্তবায়ন বিঘ্নিত হতে পারে।

জানা যায়, সরকারের বেশকিছু উন্নয়ন প্রকল্পে চীনা নাগরিকরা কাজ করেন। এমনকি পদ্মা সেতু প্রকল্পেও দেশটির অনেক নাগরিক কাজ করেন। এছাড়া কর্ণফুলী টানেল ও পদ্মা সেতুর রেলসংযোগ প্রকল্পেও চীনারা কাজ করেন। গত মাসে ছিল চীনের অন্যতম প্রধান উৎসব চান্দ্র নববর্ষ। এ উপলক্ষে সারা বিশ্ব থেকে চীনারা নিজ দেশে ফিরেছিলেন। তবে করোনার কারণে অন্য বছরের তুলনায় এবার কমসংখ্যক চীনা নাগরিক নিজভূমে ফিরেছিলেন। বাংলাদেশে কর্মরত চীনাদের অনেকে সেখানে গেছেন। করোনার প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় তাদের অনেকেই বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারেননি। ফলে তারা যেসব উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ করেন, সেগুলোতে এর প্রভাব পড়া স্বাভাবিক। তবে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হচ্ছে, নববর্ষ উদ্যাপনে নিজ দেশে যাওয়া চীনাদের সংখ্যা বেশি নয়, ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে তেমন প্রভাব পড়বে না।

এদিকে কর্ণফুলী টানেল ও পদ্মা রেলসংযোগ প্রকল্পটি চীনের ঋণে বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রকল্প দুটির জন্য প্রয়োজনীয় অনেক যন্ত্রাংশও আনা হচ্ছে চীন থেকে। কিন্তু করোনাভাইররাস ছড়িয়ে পড়ার পর চীন থেকে পণ্য আনার কার্যক্রম অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়ে। পণ্য জাহাজীকরণ একপ্রকার বন্ধ হয়ে যায়। এ পরিস্থিতি যদি দীর্ঘদিন অব্যাহত থাকে, তাহলে তা দেশের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) অধীনে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পগুলো মূল্যায়ন করে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। উন্নয়ন প্রকল্পে করোনার সম্ভাব্য প্রভাব বিষয়ে জানতে চাইলে আইএমইডির সচিব আবুল মনসুর মো. ফয়েজুল্লাহ শেয়ার বিজকে বলেন, এখনও আতঙ্কিত হওয়ার মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি। তবে এ ভাইরাসের অবস্থান দীর্ঘায়িত হলে চীননির্ভর প্রকল্প বাস্তবায়নে নেতিবাচক প্রভাবের শঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্য থেকে শুরু করে যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ এবং নিত্যব্যবহার্য নানা পণ্যের বড় উৎস চীন। এমনকি ওষুধের কাঁচামালের একটি বড় অংশ চীন থেকে আসে। আবার বাংলাদেশের চামড়া, পাট, কাঁকড়াসহ কিছু পণ্যের বড় রপ্তানি বাজার চীন।

সব মিলিয়ে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে চীন থেকে বাংলাদেশ এক হাজার ৩৮৫ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে, যা মোট আমদানির প্রায় ২৫ শতাংশ। আর রপ্তানি করেছে ৮৩ কোটি ডলারের পণ্য, যা মোট রপ্তানির দুই শতাংশ। কাজেই দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য যে চীনের ওপর অনেকখানি নির্ভরশীল, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

চট্টগ্রাম শহরের পতেঙ্গা নেভাল একাডেমিসংলগ্ন এলাকায় কর্ণফুলী নদীর মোহনার পাশঘেঁষে কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে টানেল নির্মাণকাজ চলছে। নদীর তলদেশ দিয়ে চার লেনবিশিষ্ট দুটি টিউব-সংবলিত তিন দশমিক চার কিলোমিটার টানেল নির্মিত হচ্ছে। টানেলটি চট্টগ্রাম শহরের সঙ্গে আনোয়ারা উপজেলাকে সংযুক্ত করবে।

চীনের ‘ওয়ান সিটি এবং টু টাউন’ মডেলের উন্নয়ন পরিকল্পনাকে সামনে রেখে টানেলটি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৯ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা। এ ব্যয়ের মধ্যে ৪৭৩ কোটি টাকা বাংলাদেশ সরকার বহন করবে। টানেল নির্মাণের মূল ব্যয় ঋণ হিসেবে দেবে চীন সরকার।

অন্যদিকে পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৯ হাজার ২৫৮ কোটি ১৩ লাখ টাকা, যার মধ্যে চীনের ঋণ মিলবে ২১ হাজার ৩৬ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। বাকি ১৮ হাজার ২২১ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ব্যয় করবে বাংলাদেশ সরকার। প্রকল্প দুটির বাস্তবায়ন অনেকটাই চীননির্ভর, কারণ এগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় অনেক সরঞ্জাম আসবে চীন থেকে এবং ঠিকাদারও চীনের। এর বাইরে আরও কয়েকটি বড় প্রকল্পে চীন যুক্ত হতে চলেছে। পাশাপাশি অন্য উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রেও চীন থেকে অনেক পণ্য আমদানি করতে হয়। কাজেই করোনার কারণে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে চীনের ওপর অতিনির্ভরতার কারণে দেশের তৈরি পোশাক খাতসহ বিভিন্ন খাতে বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে বলে মনে করছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, ‘অনেক দিন ধরেই চীনের পাশাপাশি আরেকটি উৎস দেশের কথা ভাবা হচ্ছিল। একে বলা হতো ‘চায়না প্লাস ওয়ান’ নীতি। শুধু চীনের ওপর নির্ভরশীলতা যে ভালো নয়, এবার তা প্রমাণিত হলো।’ এ ভাইরাস যেহেতু বিশ্বের ৬০টির মতো দেশে ছড়িয়ে পড়েছে, তাই বাংলাদেশের এখন বিশ্ব পরিস্থিতি তীক্ষèভাবে পর্যবেক্ষণ করা উচিৎ বলে মনে করেন তিনি।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..