উন্নয়ন বরাদ্দ ছয়গুণ হলেও সেবার মানে অগ্রগতি নেই

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের এক দশক

ইসমাইল আলী: ২০১১ সালের ৪ ডিসেম্বর যাত্রা শুরু করে পৃথক রেলপথ মন্ত্রণালয়। এরপর এক দশকে রেলের উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে সরকার। উন্নয়ন বরাদ্দ বাড়িয়ে প্রায় ছয়গুণ করা হয়েছে। তবে রেলের সেবার মানে উন্নতির ছোঁয়া লাগেনি। নি¤œমানের ইঞ্জিন ও ডেমু কেনা, জনবল সংকট, টিকিট বিক্রিতে অনিয়ম প্রভৃতি কারণে খুঁড়িয়ে চলছে রেল। উল্টো সংস্থাটির লোকসানের বোঝা বেড়েছে এ সময়।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত কয়েক বছরে নতুন কয়েকটি রেলপথ নির্মাণ ও কিছু নতুন ট্রেন চালু করা হলেও বাড়েনি ট্রেন চলাচলের গতি। উন্নয়ন বরাদ্দ বৃদ্ধি করলেও কাক্সিক্ষত গতিতে প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়নি। এতে প্রতি বছর বরাদ্দ কাটছাঁট করতে হয়েছে। আবার বছরের পর বছর ঝুলে থাকায় প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে কয়েকগুণ। ফলে বরাদ্দ বাড়লেও কাক্সিক্ষত সুফল মিলছে না।

রেলপথ মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার বছর (২০১১-১২ অর্থবছর) রেলের উন্নয়ন বাজেট ছিল দুই হাজার ২৮৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা। আর চলতি (২০২১-২২) অর্থবছর সংস্থাটিকে উন্নয়ন বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ১৩ হাজার ৩৭১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক দশকে রেলের উন্নয়ন বরাদ্দ বেড়ে প্রায় পাঁচ দশমিক ৮৪ গুণ হয়েছে, কিন্তু সেবার মান দ্বিগুণও হয়নি।

এদিকে ২০১১-১২ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত ১০ বছরে রেলওয়েকে উন্নয়ন বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৮৯ হাজার ৪২৪ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। তবে রেলওয়ে ব্যয় করতে পেরেছে ৫২ হাজার ৪৫২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ বরাদ্দের মাত্র ৫৯ শতাংশ ব্যয় করতে পেরেছে সংস্থাটি। বাকি ৪১ শতাংশ বরাদ্দ ফেরত গেছে।

সূত্রমতে, উন্নয়ন বরাদ্দের পূর্ণ ব্যবহার করতে না পারলেও নানা অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প নিয়ে বছরের পর বছর অর্থ অপচয় করে যাচ্ছে রেলওয়ে। এমনই একটি প্রকল্প ছিল রেলের ২০ সেট ডেমু (ডিজেল ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট) কেনা। চীন থেকে কেনা নি¤œমানের ও ত্রুটিপূর্ণ এসব ডেমুর আয়ুষ্কাল ২০ বছর ধরা হয়েছিল। তবে পাঁচ বছরের মধ্যেই প্রায় সবগুলো অচল হয়ে পড়ে আছে ওয়ার্কশপে।

সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়া থেকে কেনা হয়েছে নি¤œমানের ৩০টি মিটারগেজ ইঞ্জিন। চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে এসব ইঞ্জিন কেনা হয়। এতে প্রায়ই পথিমধ্যে বিকল হয়ে পড়ছে ইঞ্জিনগুলো। আবার চাহিদা না থাকার পরও ৭০টি মিটারগেজ ইঞ্জিন কঠিন শর্তের ঋণে কেনার জন্য পাঁয়তারা করা হচ্ছে। এছাড়া আট-নয় বছর আগে কেনা বেশকিছু মিটারগেজ ইঞ্জিনও বিকল হয়ে পড়ে আছে, যদিও এগুলোর আয়ুষ্কাল ২০ বছর।

নি¤œমানের ইঞ্জিন কেনার পাশাপাশি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নেও রয়েছে নানা অনিময়। এতে বছরের পর বছর ঝুলে থাকছে প্রকল্প, বাড়ছে ব্যয়। এমনই একটি প্রকল্প হলো দোহাজারি-কক্সবাজার-গুনদুম রেলপথ নির্মাণ। ২০১০ সালে এ প্রকল্পের আওতায় ১২৮ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় এক হাজার ৮৫২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। তবে নানা কারণে ২০১৬ সালে প্রকল্পটি সংশোধন করা হয়। এতে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ হাজার ৩৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যায় ১৬ হাজার ১৮২ কোটি ১৩ লাখ টাকা, বা ৮৭৩ দশমিক ৬০ শতাংশ।

একইভাবে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প, যমুনা নদীতে বঙ্গবন্ধু রেল সেতু নির্মাণ, খুলনা-মংলা রেলপথ নির্মাণসহ রেলের চলমান প্রতিটি প্রকল্পের ব্যয় বেড়েই চলেছে।

এদিকে সেবার মান নিয়ে ট্রেনে ভ্রমণরত যাত্রীদের অভিযোগের শেষ নেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে টিকিট না পাওয়ার অভিযোগ আসে। অথচ টিকিট বিক্রিতে অনিয়মের কারণে বেশিরভাগ ট্রেনই আসন ফাঁকা নিয়ে চলাচল করে। পাশাপাশি বাড়ছে রেলের লোকসানের বোঝাও। গত এক দশকে সংস্থাটির লোকসান দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৩৪ কোটি সাত লাখ টাকা। এ সময় রেলের আয় হয় ১০ হাজার ৫৪০ কোটি ২০ লাখ টাকা এবং পরিচালন ব্যয় ছিল ২৩ হাজার ৫৭৪ কোটি ২৭ লাখ টাকা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেলের লোকসানের পাশাপাশি এর জমি ইজারাতেও রয়েছে নানা অনিময়। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপে বিভিন্ন সময় সরকারি, বেসরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনকে রেলের অব্যবহƒত জমি ইজারা দেয়া হয়। প্রতি বছর ইজারামূল্য অগ্রিম পরিশোধের শর্তে জমি দেয়া হলেও বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই তা পালন করেনি। এতে ইজারামূল্য আটকে আছে বছরের পর বছর। মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার পর ২০১০ সালের বকেয়া প্রায় ৪১ কোটি টাকা এখনও আদায় করতে পারেনি রেলওয়ে।

এদিকে দীর্ঘদিন ধরেই জনবল সংকটে ভুগতে হচ্ছে রেলওয়েকে। এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে ১৩১টি স্টেশন। একসময় ৭৮ হাজার জনবল থাকলে রেলওয়েতে বর্তমানে আছে মাত্র ২৫ হাজার। এ কারণে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেককেই বাড়তি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি অন্য দায়িত্বও পালন করতে হচ্ছে। এতে সেবার মানও ব্যাহত হচ্ছে। অথচ এক দশকেও শূন্য পদে জনবল নিয়োগ সম্পন্ন করতে পারেনি রেলওয়ে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন   ❑ পড়েছেন  ৯২২২  জন  

সর্বশেষ..