প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

উন্নয়ন আনুক স্বাচ্ছন্দ্য ভোগান্তি নয়

বয়ে চলা মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে সৃষ্ট ভারী বর্ষণে জলাবদ্ধতায় সম্প্রতি ভোগান্তিতে পড়ে দেশের কমবেশি সব অঞ্চল। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামের বিড়ম্বনাই যেন বেশি। অবস্থাদৃষ্টে কেউ কেউ এমন সিদ্ধান্তেও উপনীত হতে পারেন, উন্নয়নের সঙ্গে বোধকরি জলাবদ্ধতার একটা প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। কেননা দেশের অন্যান্য এলাকার চেয়ে উল্লিখিত দুই মহানগরীতে উন্নয়ন ঘটেছে বেশি; জলাবদ্ধতায় তাদের হয়রানিও ততোধিক। গতকাল সহযোগী এক দৈনিকে জলাবদ্ধতায় রাজধানীবাসীর ভোগান্তির যে কারণ বিশ্লেষণ করা হয়, সেখানেও উঠে আসে এ ইস্যু। সেখানে বলা হয়, প্রধানত তিন কারণে জলাবদ্ধতায় দিশাহারা নগরবাসী এক. উন্নয়নকাজের জন্য রাস্তা কেটে রাখা, দুই. সংস্কারের অভাবে সড়কে খানাখন্দ ও তিন. সুপরিকল্পিত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাব। এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করা কঠিন।

দেশের কোন কোন অঞ্চল বা জেলায় কতটি মেগা প্রজেক্ট নেওয়া হলো, সে বিবেচনায় সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে ঢাকা। ঢাকা জেলার আয়তন বিশাল নয়। তদুপরি এখানে বাস করে কয়েক কোটি মানুষ। আর তাদের চলাচলের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা-অসুবিধার কথা আমলে নিয়ে হাতে নেওয়া হয় মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মতো মেগা প্রজেক্ট। এখানে যত্রতত্র ফুট ওভারব্রিজ কিংবা কয়েকটি ফ্লাইওভারের কথা না হয় বাদই থাকল। তারপরও এসব মেগা প্রজেক্ট সত্যিই ভবিষ্যতের ঢাকার পরিবহন চাহিদা ঠিকমতো মেটাতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে অনেক বিশেষজ্ঞের। তাদের কেউ কেউ বলছেন, রাজধানীর উন্নয়নের লক্ষ্যে গৃহীত অনেক প্রকল্প সুপরিকল্পিত নয়। সেজন্যই ব্যাপক ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীকে। উপযুক্ত পরিকল্পনা ও সুব্যবস্থাপনার আওতায় মেগা প্রজেক্টের কাজ চালানো হলে ভারী বর্ষণেও নাগরিকরা এখনকার মতো দুর্ভোগে পড়তেন না বলে তাদের মত। প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, তবে কি ওই জলাবদ্ধতা সার্বিক নগর উন্নয়নের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া? বাংলাদেশ বলার মতো উন্নতি করছে, এটা অনস্বীকার্য। উন্নয়ন আরও হোক, সেও আকাক্সক্ষা। উন্নয়নে সাময়িক কিছু দুর্দশা সৃষ্টি হয়, তাও মানতে হবে। তবে ঢাকা বা চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতাজনিত দুর্দশাকে উন্নয়নের স্বাভাবিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে মেনে নেওয়া কঠিন। সেগুলো বরং দুর্বল পরিকল্পনা তথা উন্নয়নের দুর্লক্ষণ বলেই প্রতীয়মান।

দুর্বল পরিকল্পনার জন্য দায়ী কারা? এক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকরা কোনোক্রমেই তাদের প্রাথমিক দায়িত্ব এড়াতে পারেন না। অনেক প্রকল্প রয়েছে, যেগুলো গ্রহণই করা হয় শুধু রাজনৈতিক বিবেচনায়। রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রকল্প নেওয়া হোক, তাতে আপত্তি নেই। কিন্তু ওইসব প্রকল্প তো প্রস্তাবের আগেই যাচাই করে নেওয়া দরকার ছিল, তা সার্বিক পরিস্থিতির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ অর্থাৎ একটি বাস্তবায়ন করা হলে অন্যটি কোনো ক্ষতির সম্মুখীন হবে কি না। এমন বিবেচনা প্রকল্প গ্রহণকালে যে প্রায়ই থাকে না, সেটির প্রমাণ রয়েছে কেবল দেশব্যাপী সড়ক পরিবহনেই অন্যান্য পথ না হয় বাদই থাক। এসব প্রকল্প অধিকতর উন্নয়নে সহায়ক না হয়ে ক্রমে দাঁড়ায় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে। প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নে দুর্বল পরিকল্পনার দায় খানিকটা বর্তায় প্রশাসনের ওপর। মাঝেমধ্যে দেখা যায়, যে প্রকল্প যখন গ্রহণ করলে অধিক সুফল মিলত সেটি গৃহীত হচ্ছে দেরিতে। দেরি হওয়ায় কিছু প্রকল্প স্বভাবতই জটিলতা সৃষ্টি করে অন্য প্রকল্পের সুষ্ঠু বাস্তবায়নে। এদিকে দুর্বল পরিকল্পনার প্রসঙ্গ উঠলে কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ বলেন, তারা এ বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের আগেই সজাগ করেছিলেন, যদিও আমলে নেওয়া হয়নি সতর্কবার্তা। সুপরিকল্পিত উন্নয়নের স্বার্থে তারা যেন এ বিষয়গুলো যথাসময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশ করেন, সেজন্য তাগাদা থাকবে। সর্বোপরি উন্নয়ন যেন বাংলাদেশের জনজীবনে স্বাচ্ছন্দ্যই আনে প্রতিবন্ধকতা নয়, সে লক্ষ্যে নীতিনির্ধারক ও প্রশাসনের আরও সচেতন হওয়া দরকার।