প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

উপকূলীয় জনজীবন ও কপ২৭

উম্মে কুলসুম কাইফা: আমাদের দেশের মোট আয়তনের সংখ্যাতাত্ত্বিক দিক থেকে এক-তৃতীয়াংশ হলো উপকূলীয় অঞ্চল। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় এ উপকূলীয় অঞ্চলের গুরুত্ব কম নয়, কেননা জলবায়ুর পরিবর্তনের দুর্ভোগ ও দুর্যোগ সবার আগে মোকাবিলা করতে হয় উপকূলীয় অঞ্চলের জনজীবনে। আর এ দুর্যোগ ও দুর্ভোগ হয়ে থাকে জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত কারণে।

সাধারণত কোনো জায়গায় ৩০ বছরের আবহাওয়ার যে গড়পরতার ধরন, তাকেই বলা হয় জলবায়ু। আবহাওয়ার চেনাজানা ধরন বদলে যাওয়াকে বলা হয় জলবায়ুর পরিবর্তন। লক্ষ করা যাচ্ছে, এ পরিবর্তনের ফলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে, জমাটবাঁধা বরফ বিশেষ করে উত্তর মেরুর বরফ ও হিমবাহগুলো দ্রুত গলে যাচ্ছে এবং কোনো কোনো অঞ্চল অতিরিক্ত উত্তপ্ত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব কমবেশি প্রায় সব দেশেই দেখা যায়। জলবায়ুর পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত তেমনই একটি দেশ বাংলাদেশ।

জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ যে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে, তা জাতীয় গবেষণা ছাড়াও আন্তর্জাতিক অনেক গবেষণায় উঠে এসেছে। এ ক্ষেত্রে ১০টি প্রধান ঝুঁকির অন্যতম হলো নোনা পানির আগ্রাসন। মানুষের স্বাস্থ্যে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। অতিরিক্ত লবণাক্ত পানি পান করার ফলে নানা ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।

উপকূলীয় অঞ্চলের লোকদের জীবনে ঝড়-জলোচ্ছ্বাস যেন স্বাভাবিক ঘটনা। এ যেন তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। জীবন বাঁচানোর জন্য তাদের প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয়। দুর্যোগের হাত থেকে রক্ষা পেলেও বাঁচার জন্য নতুন করে শুরু করতে হয় সংগ্রাম। বসতভিটাসহ গবাদি পশু ও আবাদি জমি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পথে বসতে হয় বহু পরিবারকে। প্রতিবছর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বন্যার হার, তীব্রতা এবং স্থায়িত্ব বাংলাদেশে বেড়েই চলছে। এতে মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে বিভিন্ন অবকাঠামোর ক্ষতি হচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সেই সময় তাদের সাহায্য করলেও দুর্যোগ-পরবর্তী সময় সবকিছু হারিয়ে তারা নিঃস্ব হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করে।

জলবায়ুর পরিবর্তন সৃষ্টির আদিকাল থেকে হয়ে আসছে। তবে শিল্পবিপ্লব শুরুর আগে বিশ্বের যে তাপমাত্রা ছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। শিল্পায়িত দেশগুলো থেকে মূলত উচ্চ কার্বন নিঃসরণ হয়ে থাকে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে অন্যান্য সব দেশে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, শিল্পবিপ্লবের আগের যে তাপমাত্রা ছিল, তা থেকে বৃদ্ধির মাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখা গেলে বড় ধরনের বিপদ এড়ানো যাবে।

এখন আসা যাক জলবায়ুর পরিবর্তন যে কারণ হচ্ছে, কলকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং যানবাহন চালাতে তেল-গ্যাস-কয়লা পোড়ানোর ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়েই চলেছে। এই বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য দায়ী বায়ুমণ্ডলের অন্যতম গ্রিনহাউস গ্যাস

কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ ঊনবিংশ শতকের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেড়ে গেছে। বনাঞ্চল ধ্বংসের কারণে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন বেড়েছে। মূলত কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের ফলে জলবায়ুর পরিবর্তন হচ্ছে।

জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব কম-বেশি সব দেশই পড়েছে। জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিয়ে কয়েক বছর আগেই জাতিসংঘ ‘রেড অ্যালার্ট’ ঘোষণা করে। জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত কারণে আমাদের পৃথিবী যে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে, সেজন্য আমরা এবং আমাদের কর্মকাণ্ড দায়ী। অনিচ্ছাকৃতভাবে হলেও বৈশ্বিক উষ্ণতার জন্যে দায়ী বায়ুমণ্ডলের অন্যতম গ্রিনহাউস গ্যাস কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ করছে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্যে যে পরিমাণ জ্বালানির জন্য যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, অধিকাংশ দেশই সেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণে তৎপর নয়, যার ফলে পৃথিবীর অধিকাংশ দেশই ক্ষতিগ্রস্ত।

সম্প্রতি মিসরে শার্ম আল-শেখের জলবায়ু সম্মেলন তথা কপ২৭ বৈঠক শেষ হয়েছে। এ বৈঠকে ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ চুক্তির মাধ্যমে উচ্চ কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলো জলবায়ুর অভিঘাতে বিপর্যস্ত দেশগুলোকে ক্ষতিপূরণ দিতে সম্মত হয়েছে। কিন্তু এখন কথা হচ্ছে, উচ্চ কার্বন নিঃসরণকারী দেশ কি শুধু ক্ষতিপূরণ দিয়েই যাবে, এর বিপরীতে কি কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করবে না? আমরা জানি উন্নয়ন দরকার, তবে পৃথিবীকে ধ্বংসের মুখে ফেলে নয়।

জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে প্রকৃতি, পরিবেশ ও অর্থনীতির মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হলেও সহজ ভাষায় জলবায়ুর পরিবর্তন ঠেকাতে যে শূন্য কার্বন নিঃসরণ প্রয়োজন, তা নিয়ে কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না। ১৯৯৫ সালের জার্মানির বার্লিনে কপ১ থেকে শুরু করে কপ২৭ শেষ হলো, অথচ কার্বন নিঃসরণ বেড়েই চলেছে।

সমুদ্রের তীরবর্তী ভৌগোলিক অবস্থান, অতিরিক্ত জনসংখ্যা, অপর্যাপ্ত বনায়ন প্রভৃতি কারণে আমাদের দেশের বিপন্নতা ভয়াবহ। উন্নত দেশগুলো যেভাবে উন্নয়নের নামে কার্বন নিঃসরণ করছে, সেভাবে চলতে থাকলে আমাদের সুন্দর পৃথিবী বসবাসের অযোগ্য হয়ে যাবে। তাই উপকূলীয় জনজীবন এবং পৃথিবীকে রক্ষায় দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। এজন্য প্রতিটা দেশেরই পর্যাপ্ত পরিমাণে বনভূমি, নির্দিষ্ট পরিমাণে কার্বন নিঃসরণ, নিচু অঞ্চলের জন্যে টেকসই বাঁধনির্মাণ এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহার করতে হবে। ভবিষ্যতে যেন পৃথিবী যেন জীবের অনুকূলে থাকে, সেই চেষ্টা করতে হবে। একইসঙ্গে জলবায়ুর পরিবর্তনে বিশ্বে যতটুকু নেতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে, সেই পরিমাণ কমিয়ে আনার জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে, তা না হলে বিপন্ন হয়ে পড়বে প্রকৃতি, পরিবেশ ও মানুষের জীবন।

শিক্ষার্থী

নৃবিজ্ঞান বিভাগ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়